গণতন্ত্রের নতুন উদাহরণ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বোধোদয় হবে তো?

সংসদ অধিবেশনে বিরোধী দল নেই। নেই তাদের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর কিংবা ওয়াক আউট। তার পরও পাওয়া গেল এক প্রাণবন্ত সংসদ। কেবল সরকারি দলের সদস্যদের অংশগ্রহণে এমন সংসদ অধিবেশন অনেক দিন দেখা যায়নি। সংসদকক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে চার মন্ত্রীকে তুলাধুনা করেছেন সরকারি দলের সংসদ সদস্যরাই। এমন দৃশ্য


বাংলাদেশে অন্তত বিরল। এখানে সাধারণত সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের দেখা যায় একে অন্যের 'পিঠ চুলকাতে' অথবা বিরোধী দলের প্রতি বিষোদ্গার করতে। কিন্তু এভাবে সরকারের মন্ত্রীরা সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের তোপের মুখে পড়ছেন_এমন দৃশ্য জাতীয় সংসদের অধিবেশনে অনেকেই দেখেননি। টেলিভিশনের পর্দায় যাঁরা সংসদের এই অধিবেশনের চিত্র দেখেছেন, তাঁরা গত বৃহস্পতিবারের অধিবেশন দেখে আশাবাদী হতে পারেন। যাঁরা ভাবছিলেন, বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে দেশের সংসদীয় গণতন্ত্র একমুখী পথে চলতে শুরু করেছে, তাঁরা গত বৃহস্পতিবারের অধিবেশন দেখে এখন নতুন করে ভাবার সুযোগ পাবেন।
গত বৃৃহস্পতিবারের অধিবেশন থেকে বিরোধী দলেরও অনেক কিছু শিক্ষা নেওয়ার আছে। যত ছোটই হোক, গণতান্ত্রিক ধারায় বিরোধী দল সব সময়ই সরকারের সমান্তরাল। কিন্তু আমাদের দেশের বিরোধী দল দীর্ঘদিন সংসদ অধিবেশন বর্জন করেই চলেছে। সরকারের সমালোচনা ও সরকারকে সঠিক পথে রাখার দায়িত্ব বিরোধী দলের। সেই দায়িত্ব এবার যেন কাঁধে তুলে নিয়েছেন সরকারি দলের সংসদ সদস্যরাই। বৃহস্পতিবারের সংসদ অধিবেশন থেকে এটা আবার প্রমাণ হলো, কোনো কিছুই প্রশ্নের ঊধর্ে্ব নয়।
গত ১৩ আগস্ট ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে যে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, সে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশ। সব দুর্ঘটনায়ই দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া মানেই দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। কিন্তু ১৩ আগস্টের সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে দেশের মহামূল্য সম্পদ। এই ক্ষতি সহজে পূরণ হবে না। তারেক মাসুদের মতো একজন চলচ্চিত্রকার বা মিশুক মুনীরের মতো একজন সিনেমাটোগ্রাফার আবার কবে এই দেশ জন্ম দেবে, সেটা নিশ্চিত করে বলা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। অনেকেই সড়ক দুর্ঘটনাকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একদিকে দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো হয়ে উঠেছে মৃত্যুফাঁদ। ঢাকা-আরিচা, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-মুন্সীগঞ্জ, ঢাকা-উত্তরবঙ্গসহ এমন কোনো সড়ক বা মহাসড়ক নেই, যেটা ভালো আছে বা চলাচলের উপযোগী আছে। যোগাযোগমন্ত্রী স্বয়ং গিয়েছিলেন ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের করুণ দশা দেখতে। তিনি ওই সড়কে রাস্তা থেকে নামতে পারেননি। এ অবস্থায় বেহাল সড়ক-মহাসড়কে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে যাত্রীদের। নৌপথেও যাত্রীদের চলাচল করতে হয় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। অন্যদিকে সড়ক ও নৌপথ_উভয় পথেই আছে অদক্ষ চালক। বেহাল সড়ক-মহাসড়কের পাশাপাশি চালকদের অদক্ষতাও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। কিন্তু সেদিকে দৃষ্টি দেওয়ার যেন কেউ নেই। সাম্প্রতিক সময়ের সড়ক দুর্ঘটনার পাশাপাশি আরো কিছু বিষয় জনদুর্ভোগের কারণ হয়েছে। দেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুৎ সংকট, পানি সংকট অসহনীয় হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় সংসদের অধিবেশনে তোপের মুখে পড়েন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে যে বিষয় নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা হয়েছে, বিষয়গুলো সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত বিষয়। সারা দেশের মানুষ এ বিষয়গুলো নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে। সময়োচিত পদক্ষেপ না নেওয়ায় সরকারের ভাবমূর্তি ক্রমেই নিম্নগামী হচ্ছে। এ অবস্থায় বৃহস্পতিবারের সংসদ অধিবেশন যেমন সরকারের কাছে, তেমনি সাধারণ মানুষের কাছেও নতুন বার্তা পেঁৗছাবে। দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নতুন যে উদাহরণ সৃষ্টি হলো গত বৃহস্পতিবার, তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে। সংসদে সবার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই মানুষ সংসদের প্রতি তাদের আস্থা ফিরে পাবে। সরকারি দলের সদস্যরা যে কেবলই কলের পুতুল নন, তা বুঝতে পারবে। বিরোধী দলকেও এ থেকে শিক্ষা নিতে হবে। নিজেদের দায়িত্ব পালনে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে তাদের।

No comments

Powered by Blogger.