ক্যাম্পাস অনুস ন্ধান- ধবিদেশী শিক্ষার্থীবিহীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় by শহীদুল ইসলাম

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি শিক্ষাবর্ষে বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য ৩৫টি আসন বরাদ্দ থাকলেও স্বাধীনতাপরবর্তী ৩৬ বছরে মাত্র তিনজন বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন।
আর ভর্তি হওয়ার জন্য আবেদন করেছেন মাত্র সাত জন। এই সময়ের মধ্যে ১২৬০ জন বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার কথা ছিল।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৭৩-এ (ভলিউম-২, পৃষ্ঠা ২৫০-২৫১) বলা হয়েছে, প্রতি শিক্ষাবর্ষে বিজ্ঞান অনুষদে ১০ জন, কলা অনুষদে ১০ জন, আইন অনুষদে পাঁচ জন, বাণিজ্য অনুষদে পাঁচ জন এবং ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ-এ পাঁচ জন করে বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারবে। কিন্তু ১৯৯৭-৯৮ শিাবর্ষে ফার্মাসি বিভাগে ভর্তি হন নেপালের শিক্ষার্থী বিনোদ কুমার দাস। ১৯৯৯-২০০০ শিাবর্ষে ফোকলোর বিভাগে ভর্তি হন আমেরিকার ম্যাথিউ এরিংটন এবং মেলিসা এম এরিংটন। এদের মধ্যে বিনোদ কুমার দাস অনার্স এবং ম্যাথিউ এরিংটন অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রী সম্পন্ন করেন। মেলিসা এম এরিংটন ভর্তি হওয়ার কয়েক মাস পরেই ব্যক্তিগত কারণে ভর্তি বাতিল করে দেশে ফিরে যান। এর পরে আর কোন বিদেশী শিক্ষার্থী রাবিতে ভর্তি হননি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক শাখা এবং বিভিন্ন বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০২-০৩ শিক্ষাবর্ষে নেপালের নাগরিক মি. লাভা শ্রেষ্ঠ ও মি. রাম কুমার ম-ল ফার্মাসি বিভাগে এবং মি. অশোক কুমার শাহ কম্পিউটার সায়েন্স এ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগে ভর্তির জন্য আবেদন করেন। বিভাগীয় একাডেমিক কমিটি তাদেরকে ভর্তির অনুমতি দিয়ে সে সংক্রানত্ম চিঠি শিা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর কোন জবাব পাওয়া যায়নি। ২০০৩-০৪ শিক্ষাবর্ষে নেপালের মি. সনজিত কুমার চৌরসীয়া এবং মি. ইব্রাহিম রাইন ফার্মাসি বিভাগে ভর্তির আবেদন করেও ভর্তি হননি। নেপালের মি. সাবির হুসেইন ফার্মাসি বিভাগে ভর্তির আবেদন করেও ভর্তি হতে পারেননি। উচ্চ মাধ্যমিকে তাঁর গণিত না থাকায় বিভাগীয় একাডেমিক কমিটি তাঁকে ভর্তি করাতে অপারগতা প্রকাশ করে। চলতি শিাবর্ষে ফার্মাসি বিভাগে ভর্তির জন্য নেপালের মি. বিপিন কুমার নায়েকের আবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এসেছে। ভর্তির যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য তা বিভাগে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন ভর্তি হচ্ছেন না তার নেপথ্যের কারণ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ।

প্রচারের অভাব

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যাপারে বিদেশী শিক্ষার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণে কোন প্রকার প্রচারের ব্যবস্থা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইটে এ ব্যাপারে নেই কোন দিক-নির্দেশনা। এছাড়া রাবিতে আন্তর্জাতিক মানের যেসব সেমিনার অনুষ্ঠিত হয় সেখানেও এ ব্যাপারে কোন আলোচনা বা তথ্য উপস্থাপন করা হয় না।

অস্থিতিশীল ক্যাম্পাস

স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে রাবিতে ছাত্র সংঘর্ষে নিহত হয়েছে ২৬ জন শিক্ষার্থী। এছাড়া প্রায়ই বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিবদমান ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত লেগেই আছে। ছাত্র ধর্মঘটে বছরে ২০/২৫ দিন ক্যাম্পাস বন্ধ থাকে। এছাড়া শিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলন, বিভিন্ন সমিতির ধর্মঘট, ছাত্র আন্দোলনসহ মতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের ক্যাম্পাসে ছিনতাই-চাঁদাবাজির ঘটনায় মাঝেমধ্যেই ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। গণমাধ্যম ও ইন্টারনেটের কল্যাণে এসব খবর মুহূর্তের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। আর তা বিদেশী শিক্ষার্থীদের রাবিতে ভর্তির ক্ষেত্রে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে বলে অনেক শিক মনে করছেন।

রাজনৈতিক পরিবেশ

অস্থিতিশীল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধাক্কা এসে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে। হরতাল কিংবা ধর্মঘটের রেশ পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে।

সেশনজট

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিকরা সেশনজটকে দায়ী করেছেন। রাবিতে পাঁচ বছরের অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স শেষ করতে অনেক সময় সাত থেকে আট বছর লেগে যায়। ভর্তির আবেদন করে অনুমতি পেয়েও এসব বিষয় অবহিত হওয়ার পর বিগত সময়ে পাঁচ জন বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তি হননি বলে ওই সব বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।

বিষয়ভিত্তিক সমন্বয়হীনতা

যেসব বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য আবেদন করেন তাঁদের উচ্চ মাধ্যমিকে পঠিত বিষয়ের সাথে বাংলাদেশের এইচএসসি সিলেবাসের মিল না থাকায় অনেকেই ভর্তি হতে পারেননি।

শিকদের গুণগত মান

বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়ার পেছনে আরেকটি কারণ হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিকদের গুণগত মান। বিগত ১৫ বছরে রাবিতে নিয়োগপ্রাপ্ত অধিকাংশ শিকই দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ পেয়েছেন বলে ক্যাম্পাসসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি। বঞ্চিত করা হয়েছে অনেক প্রকৃত মেধাবী শিক্ষার্থীকে। ফলে বিভিন্ন বিভাগের শিকরাই চান না তাঁদের বিভাগে বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তি হোক। কারণ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক সিনিয়র শিক মনে করেন সাম্প্রতিক সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত শিকরা ইংরেজীতে পাঠদানে পুরোপুরি সম নন। এসব শিক বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তি করানোর বিপক্ষে মতামত দিয়ে থাকেন বলে জানা গেছে।

বিভাগীয় শর্ত

কিছু কিছু বিভাগে বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ মেনে চলা হলেও অনেক বিভাগ আলাদা করে শর্ত দেয়। তারা দাবি করে, দেশী-বিদেশী সকল শিক্ষার্থীকে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে। উচ্চ মাধ্যমিকে কত নম্বর/গ্রেড থাকলে বিদেশী শিক্ষার্থীদের ভর্তি করানো যাবে সে সংক্রানত্ম সুস্পষ্ট কোন নির্দেশনা না থাকায় অনেক বিভাগ ভাল ফলের অধিকারী ছাড়া অন্যদের ভর্তি করতে অপারগতা জানায়।

ভাষা বিভাগে নেই বাংলা ভাষা শেখার কোর্স

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ অনুযায়ী রাবিতে ভর্তি হওয়া বিদেশী শিাথর্ীদের ছয় মাসের বাংলা ভাষা কোর্স আবশ্যিক করা হয়েছে। কিন্তু রাবির ভাষা বিভাগে বাংলা ভাষার ওপর কোন কোর্স করা যায় না। ফোকলোর বিভাগ থেকে পাস করে যাওয়া আমেরিকার ম্যাথিউ এরিংটন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষার ওপর কোর্স করেন। শুধু রাবির ভাষা বিভাগে নয়, রাজশাহীর কোথাও বাংলা ভাষা শেখার কোর্স করার সুযোগ নেই। এসব জটিলতার ফলে অনেকেই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ভর্তি হচ্ছেন না।

ভাষাগত সমস্যা

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়ার আরেকটি কারণ হলো অধিকাংশ বিভাগেই শিকরা বাংলায় পড়ান। ইংরেজীতে কাস লেকচার এবং পরীক্ষা দেয়ার বাধ্যবাধকতা না থাকায় শিক্ষাক শিক্ষার্থীরা বাংলার ওপরই নির্ভরশীল। ফলে বিদেশী শিক্ষার্থীরা পড়তে এসে এই ভাষাগত সমস্যার সম্মুখীন হন। এছাড়া একাডেমিক কাজের বাইরে বিভিন্ন ক্ষেত্রেও বিদেশী শিক্ষার্থীরা ভোগানত্মির শিকার হন বলে ফোকলোর ও ফার্মাসি বিভাগের শিকদের সূত্রে জানা গেছে।

নেই আবাসিক হল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক হল এবং অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা থাকলেও রাবিতে বিদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য কোন আবাসিক হল নেই। যে দুই জন শিক্ষার্থী রাবি থেকে পাস করে গেছেন তাঁরা ক্যাম্পাসের বাইরে বাসা ভাড়া করে পড়াশোনা করেছেন।

নিরাপত্তার অভাব

আবাসিক হল না থাকায় বাইরে অবস্থানের কারণে বিদেশী শিক্ষার্থীরা সব সময় নিরাপত্তাহীনতায় থাকতেন। ফোকলোর বিভাগের অধ্যাপক আবুল হাসান চৌধুরী বলেন, আমেরিকার শিক্ষার্থী ম্যাথিউ এরিংটনকে অনেকেই গুপ্তচর বলে মনে করত। এ নিয়ে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরম্ন করে অনেকেই তাদের সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখত এবং মাঝেমধ্যে বিরক্ত করত বলে ম্যাথিউ এরিংটন তাঁদের জানিয়েছিলেন।

অতিরিক্ত ব্যয়

বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ অনুযায়ী একজন বিদেশী শিক্ষার্থীকে অনার্স ডিগ্রীর জন্য প্রতিবছর ১২০ পাউন্ড, মাস্টার্স ও এলএলবি ১৫০ পাউন্ড, এমফিল/পিএইচডি ২০০ পাউন্ড এবং সেশন ফি হিসেবে ১০০ পাউন্ড দিতে হয়। ভারত, নেপালসহ পার্শবর্তী উন্নয়নশীল দেশ থেকে আসা অনেক শিক্ষার্থী আবেদন করেও অতিরিক্ত কোন সুযোগ-সুবিধা না থাকায় পড়াশোনার খরচ বেশি হওয়ায় ভর্তি হন না বলে সংশিস্ন সূত্রে জানা গেছে।

শিকরা যা বললেন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশী শিাথর্ী ভর্তি না হওয়া প্রসঙ্গে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিকদের মানকে উন্নীত করতে হবে। দল-মত নির্বিশেষে প্রকৃত মেধাবীদের শিক হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাইরের কোন শিক কাস না নেয়ায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাইরের শিকরা এলে শিক্ষার্থীরা নতুন নতুন বিষয় সম্পর্কে জানতে পারত। শেয়ার করতে পারত নানা অভিজ্ঞতা। ফার্মাসি বিভাগের সভাপতি ড. মারম্নফ আহমেদ বলেন, বিদেশী শিক্ষার্থীদের ভর্তির জন্য আকর্ষণ করতে বিভিন্ন প্রচারমূলক ব্যবস্থা নেয়া দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট কমানোর পাশাপশি শিকদের আরও আপটুডেট হতে হবে বলে তিনি মতামত দেন। ফোকলোর বিভাগের শিক আবুল হাসান চৌধুরী বলেন, বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়ায় রাবিরশিক্ষার্থীরা বিদেশী শিক্ষার্থীদের সাথে মিথস্ক্রিয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সবকিছু ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে উলেস্নখ করে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে এ ব্যাপারে যথাযথ পদপে নেয়ার দাবি জানান।

No comments

Powered by Blogger.