অন্নদাশঙ্কর ॥ আশা ছিল মুজিবমিনারের by দাউদ হায়দার

আজ পনেরই মার্চ। অন্নদাশঙ্কর রায়ের জন্মদিন। বেঁচে থাকলে জানতে চাইতেন নিশ্চয় মুজিবমিনারের কী হলো? আদৌ হবে কী? আশা করেছিলেন, ওঁর জীবিতকালেই মুজিবমিনার হবে। হয়নি। ভবিষ্যতেও আশা ক্ষীণ।
শেখ হাসিনা প্রথমবার ক্ষমতাসীন হওয়ার দু'দিন পরেই অন্নদাশঙ্কর রায় একটি প্রবন্ধ লেখেন কলকাতার প্রতিদিন-এ, সম্পাদকীয় পৃষ্ঠায়। লেখার কাটিং আমাকে পাঠিয়ে দেন। ফটো কপি। যা লেখেননি ওই প্রবন্ধে, তাড়াহুড়োয় ভুলে গিয়েছেন লিখতে হয়ত, ফটো কপির শাদা পৃষ্ঠায় (অপর পৃষ্ঠায়) হাতে লিখেছেন আমাকে : "আরও কিছু কথা জুড়ে দিলুম। লেখা বড়ো হলো। আমার মনের কথাই লিখেছি। বোধহয় আমার সঙ্গে একমত হবে। লিখেছেন : জাতির জনক ঘরে বা মিউজিয়ামে আবদ্ধ থাকতে পারেন না। বন্দী করলে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন। ইতিহাস একতরফা বিচার করে। বঙ্গবন্ধু মুজিব ছিলেন আপামর জনতার। প্রত্যেকে দেখতে চায়। স্বাদেশিকতায় অনুপ্রেরণা পেতে চায়। কেবল ঢাকায় নয়, বাংলাদেশের প্রত্যেক শহরে মুজিবমিনার করা হোক। মূর্তি নয়। মূর্তির চেহারা সব সময়ই বিকৃত হয়। অদৰ শিল্পীর হাতে। যেমন কলকাতায় হয়েছে। হচ্ছে। বাংলাদেশে মূর্তি নির্মাণ ...। মূর্তির বদলে আমার উপদেশ মিনার। মূর্তির চেয়ে মিনার কম প্রেরণাদায়ক নয়, ক্ষেত্রবিশেষে বেশি। যেমন ঢাকার শহীদ মিনার শক্তি যোগায় বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষকে। মিনার হয় সেকুলার। মিনার সর্বসাধারণের। মুজির সব মানুষের।" _তাঁর প্রকাশিত লেখার শিরোনাম "মুজিবমিনার" মূল লেখা (ফটো কপি এবং হাতে-লেখা বাকি অংশ) ফটো কপি করে পাঠিয়েছিলুম। পেয়েছিলেন কি-না, অজানা।
সাত চল্লিশের আগে-পরে যে সব কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী পূর্ববঙ্গত্যাগী, বাংলাদেশ নিয়ে তাঁদের প্রেম-ভালবাসা উথলে ওঠে না। নস্টালজিয়ায় কাবু নয়। তাঁদের দুই-চারটে লেখায় গদ্গদ ভাবুলতা থাকলেও সামগ্রিক বাংলাদেশ নেই।
রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতো ঐতিহাসিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গর্ব করে যাঁকে নিয়ে, মৃত্যুর বছর দুই আগে একটি লেখায় মুসলিম এবং "পূর্ববঙ্গের" মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়িয়েছেন। ভাষাচার্য সুনীতি চ্যাটুজ্যের মুখে শুনি একদিন : ''রমেশবাবু কখনওই সেকুলার ছিলেন না। বাংলাদেশের ইতিহাস, তৃতীয় খ- (আধুনিক যুগ) পড়লেই আঁচ করতে পারবে। বিচারে পক্ষপাতিত্ব আছে।" একই কথা অন্নদাশঙ্কর রায়েরও। বাংলার হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক নিয়ে রায় ও মজুমদারের প্রকাশ্যে বিবাদ হয়, একটি সভায় (মার্চ ১৯৬৬, কলকাতার সিনেট হলে।) এই বিবাদে দু'জনের মুখ দেখাদেখি বন্ধ। বন্ধুতায় রীতিমতন ফাটল। জোড়া লাগেনি কখনওই আর। কথাও নয় জোড়া লাগার। অন্নদাশঙ্কর যে-বৈশ্বিক মানবিক প্রেমে উদ্বেলিত, রমেশচন্দ্র মজুমদার ছিলেন না, টেরও পেয়েছি বারকয়েক। তাঁর বয়ানে। জীবনানন্দ, অচিনত্ম্য (কুমার সেনগুপ্ত), নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় মনোজ বসু, বুদ্ধদেব থেকে শুরম্ন করে সাগরময় ঘোষ, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী প্রমুখের বাড়ি পূর্ববঙ্গে (বাংলাদেশে)। লেখাপড়াও (প্রাথমিক। স্কুলেও)। ওঁদের লেখায়, স্মৃতিচারণে কোন মুসলিমের নাম নেই (জীবনানন্দের কবিতায় 'ইয়াসিন' নামটি কবিতার প্রয়োজনেই লেখা।) কোন বন্ধু ছিল না, পড়াকালেও? শৈশবে, কৈশোরে, যৌবনে?
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাংলাদেশ প্রেম হালের। এই প্রেম দেখাতেই হবে। কারণ, ওঁর পাঠক পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে বাংলাদেশে বেশি এবং এও উল্লেখ্য, বিদেশে কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের অনাবাসী যাঁরা, তাঁরা নয়, বাংলাদেশীরাই অধিক পাত্তা দেয় ওকে। স্বীকারও করেন অকপটে। তো বাজার রাখতে হবে। সুনীলের 'অর্ধেক জীবন' আত্মচরিতে প্রতিবেশী মুসলমানের সহপাঠী মুসলমানের সন্ধান কতটা পান?
কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গে সবচেয়ে মান্য বুদ্ধিজীবী এখন শঙ্খ ঘোষ। সবচেয়ে সুপাঠ্য কবি। সবচেয়ে সুপাঠ্য গদ্যকার। প্রাবন্ধিক। সবচেয়ে মান্য রবীন্দ্রবিচারক। সবচেয়ে মান্য কবিতার বিশ্লেষক। শঙ্খ আমার অধ্যাপক। পড়িয়েছেন আমাকে। ওঁর কাসে শেষ বেঞ্চের ছাত্র যদিও।_সামনের বেঞ্চে বসার হিম্মতে কুলোয়নি। শঙ্খ ধারাবাহিক কোন আকরগ্রন্থ আত্মজীবনী লেখেননি। টুকরো-টুকরো স্মৃতিকথায় বরিশাল পাকশির টানাপোড়েন মথিতদিনের চিত্রদৃশ্যে বর্ণনা দিলেও, পাচ্ছিনে কোথাও কোন মুসলিম বন্ধুর পরাণকথা। না পেয়ে ভাবনা হয়, ওঁর/ওঁদের জগৎটা কত এককেন্দ্রিক ছিল।
অন্নদাশঙ্কর রায় বাংলাদেশের নন। জন্ম (১৫ মার্চ ১৯০৪, মৃতু্য ২৮ অক্টোবর ২০০২) ঢেঙ্কানালে, উড়িষ্যায়। কিন্তু ব্রিটিশ রাজের চাকরির সুবাদে পূর্ববঙ্গেই বেশি সময় কাটিয়েছেন, নানা জেলায়, বিভাগে। বন্ধুতা হয়েছে মাহবুব-উল- আলম, আবুল ফজল, মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন প্রমুখের সঙ্গে। লিখেওছেন এঁদের কথা। কেবল এঁরাই উল্লেখিত নন লেখায়, রাজনীতিবিদ, কৃষক, সাধারণ মুসলিম বাদ যায়নি। বন্ধুতা করেছেন নির্বিশেষে। দেখেছি, নওগাঁ, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম থেকে বহু মানুষ এসেছেন কলকাতায় ওঁর সঙ্গে দেখা করতে, থেকেওছেন কেউ কেউ দিন কয়েক। এঁরা কেউ বিখ্যাত নন। অতীব সাধারণ।
আমরা তখন যোধপুর পার্কের বাড়িতে। রাত দশটার পরে কলিংবেল বেজে উঠল। এত রাতে কে বাজায় বেল? দাদু (অন্নদাশঙ্কর) দুই হাতে ব্যাগ নয়, যেন বস্তা। পরিচয় দিয়ে বলেন, নওগাঁ থেকে এসেছেন, অন্নদাশঙ্কর রায়ের সঙ্গে দেখা করবেন। বিব্রত বোধ করি। রাত আটটার পরে কারোর সঙ্গে দেখা করেন না। বলি, অপেক্ষা করুন। দাদুকে জানাই নওগাঁ থেকে একজন এসেছেন দেখা করতে। দাদুরও প্রশ্ন : এত রাতে? কয়েক সেকেন্ড ভাবেন। "আসতে বলো।"
ঘরে ঢুকে দুই ব্যাগ রেখেই দাদুর পায়ে হাত রেখে বলেন, আমার নাম হাসেমউদ্দিন। দাদু ঠিক চিনতে পারেন না। হাসেমউদ্দিন পরিচয় বিস্তারিত করেন। কৃষক তিনি। জমি ও চাষাবাদ নিয়ে একজনের সঙ্গে মারপিট হয়। রক্তারক্তি কাণ্ড। মারাও যায় বিরোধী পক্ষের কেউ। দোষ হাসেমউদ্দিনের নয়, কিন্তু দোষ বর্তায় হাসেমউদ্দিনের ওপরেই। অন্নদাশঙ্কর তখন মহকুমা শাসক। হাসেমউদ্দিন নিজেই ধরাশায়ী হন মারপিটে। লুটিয়ে পড়েন মাটিতে। অজ্ঞান হয়ে যান। সাক্ষীসাবুদ আছে।_ইত্যাদি। অতএব তিনি হত্যা করতে পারেন না। হাসেমউদ্দিন বলেন, "কর্তাবাবু আপনিই আমাকে বাঁচিয়েছিলেন।"
_পঞ্চাশ বছর পরে, সেই কৃতজ্ঞতা জানাতে এতো রাতে এসে হাজির?_ দাদু প্রশ্ন তোলেন না। হাসেমউদ্দিন জানান, নওগাঁর এক "ইশকুল মাস্টরের" কাছে ঠিকানা পেয়েছেন এবং বিনা পাসপোর্টে এসেছেন। শুধুমাত্র অন্নদাশঙ্করকে দেখেতেই এসেছেন। সকালেই ফিরে যাবেন। তাঁর দুই ব্যাগে মণ্ডা মিঠাই নাড়ু নানাজাতের আমও বেরুলো।_মাসটা মধ্যজুন। ১৯৭৭।
হাসেমউদ্দিন ওই রাতে আমার ঘরেই ছিলেন। ওঁরই আনা চিড়েমুড়ি খেয়ে ঘুমান। ভাত না খাওয়ার যুক্তি; "রাতে শরিলটা পাতলা রাখি।"
অন্নদাশঙ্কর রায়ের একটি বইয়ের নাম "আমার ভালবাসার দেশ।" এই দেশ বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বাংলাদেশেকে নিয়ে, বাংলাদেশের মানুষকে নিয়ে ওঁর ভালবাসায় একটুকু খামতি নেই। বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশকে নিয়ে যত লেখা লিখেছেন, পশ্চিমবঙ্গের অন্য কোন লেখক এতটা লেখেননি, ভাবেননি। ভারত-বাংলাদেশের কলহে ব্যথিত ছিলেন। "দুই বোন" ছড়ায় লিখেছেন :
পদ্মা গঙ্গা দুটি বোন
তোরা আমার কথা শোন
আপসে মিটিয়ে ফেল ঝগড়া।

কেন এত রাগারাগি
জল হোক ভাগাভাগি
পেয়ে যাক যে যার বখরা
(১৯৯২)
১৩/০৩/২০১০, বার্লিন, জার্মানি

No comments

Powered by Blogger.