সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ : কালের কণ্ঠস্বর by নূর কামরুন নাহার

Bharat has lost its voice. A voice that answered to the name of Syed Mustafa Siraj fell silent as the veteran Bengali writer passed away after a brief illness in Kolkata (THE HINDU, September, 2012
বাংলা সাহিত্যের বরেণ্য সাহিত্যিক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের মৃত্যুকে এভাবেই তুলে ধরা হয়েছে দ্য হিন্দু পত্রিকায়।


গত ৪ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে কলকাতায় মারা যান এ প্রখ্যাত লেখক। কয়েকদিন ধরেই অন্ত্রের সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। ৩০ আগস্ট ভর্তি হয়েছিলেন কলকাতার একটি বেসরকারী হাসপাতালে। কিন্তু হাসপাতাল থেকে আর বাড়ি ফেরতে পারেননি তিনি। ৮২ বছর বয়সে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

জন্ম, শৈশব, কৈশোর
জন্ম ১৯৩০ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার খোশবাসপুরে। জঙ্গলঘেরা এক অজ পাড়াগাঁ। সভ্যতার আলো তখনও সেখানে ভাল করে এসে পৌঁছেনি। জন্মস্থান সম্পর্কে তাঁর নিজের বর্ণনা-
জন্মেছিলাম মুর্শিদাবাদ জেলার রাঢ় অঞ্চলের পাড়াগাঁয়ে। বাইরে চারপাশে এলাকায় জুড়ে যে জনগোষ্ঠী, তাদের মধ্যে অনেক দুর্ধর্ষ হিংস্র মানুষ ছিল, যাদের দু’চোখে ছিল হত্যার নেশা। ছেলেবেলা থেকে অনেক হত্যাকাণ্ড ও রক্ত দেখেছি। কথায় কথায় রক্তপাত হতে দেখেছি।
জন্ম মাত্রই জানতেন তিনি সৈয়দ বংশীয়। তাঁর শরীরে পবিত্র পুরুষ হযরত মুহম্মদের রক্তধারা। মৌলানা দাদু ছিলেন পীর, ওহাবী আন্দোলনের কড়া সমর্থক শিষ্য বাড়ি ঘুরেই তার দিন কাটত। অন্যদিকে বাবা ঝাঁপিয়ে পড়েন গান্ধীজীর নন-কোঅপারেশনে। এই দুই বিপরীতমুখী স্রোত। বিপরীত রাজনৈতিক বিশ্বাস, আদিম সমাজ, আদি-অকৃত্রিম মানুষ, অবাধ স্বাধীনতা, উদ্দাম প্রকৃতির মধ্যে তাঁর বেড়ে ওঠা-
এই দুর্ধর্ষ আদিম জীবনকে আমি ভালবাসতাম, তা পেতে চাইতাম। এবং তা পেতে গিয়েই প্রকৃতির কাছাকাছি গিয়ে পড়ি। বড় আদিম সেই জগত। প্রাণী ও উদ্ভিদ, পোকামাকড় ও মাটির ফাটল, উইডিবি, শ্যাওলা ছত্রাক, পাখির গু, সাপের খোলসে ভরা সেই আদিম স্যাঁতসেতে মাটির সঙ্গে মোটামুটি চেনাজানা হয়ে যায়।
জীবন ও প্রকৃতির পাঠশালা থেকেই তাঁর প্রথম পাঠ গ্রহণ। কিন্তু সেই পাঠগ্রহণ-ই সবটুকু নয়। অন্য পাঠশালা তাঁকে আকর্ষণ করে। পাঠশালা হাজার বছরের মানব সভ্যতার ইতিহাসের। এখানেও চলে তুমুল পাঠ- দেখেন সভ্যতা আলোকোজ্জ্বল ভূমি গ্রহণ করেন ব্যাপক জ্ঞান, জীবন বোধ ও বীক্ষা। এ ভূমিও তৈরি বৈপরীত্য, বহুবিচিত্র বর্ণিল এবং বহুমাত্রিকতা দিয়ে। জন্মমাত্রই যেমন দেখেন দুই বোধ ও বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব, তেমনি দেখেন রাশি রাশি আরবী, ফার্সী, উর্দু প্রকাণ্ড সব কেতাব। বাবা আবার আরবী ফার্সী শেখার পারিবারিক প্রথা ভেঙ্গে ইংরেজী স্কুলে ঢোকেন। রাজনৈতিক প্রভাব ও মতাদর্শে পরিণত হোন আমূল ভারতীয়তে। ফলে রামায়ণ, মহাভারত, বেদ-উপনিষদ আর সুফিজমের মিলিত জ্ঞান সরোবরে অবগাহন করেন। এই জ্ঞানের সঙ্গে আবার যুক্ত হচ্ছিল সাম্প্রতিক বোধ-বিবেচনা, সাহিত্য ও শিল্প আন্দোলন। বাবার অসাধারণ সংগ্রহে ছিল দু®প্রাপ্য বই ও পত্রিকা। গড়ে উঠেছিল বাংলা বইয়ের বড় লাইব্রেরি। বাড়িতে আসত তখনকার প্রকাশিত সব পত্রিকা- পাড়াগাঁয়ে কলকাতার নগর সংস্কৃতি গিয়ে আশ্চর্য এক উপনিবেশ গড়ে তুলেছিল। সেখানেই আমার জন্ম ও মানসিক বিকাশ ।
তাই আদিম জীবন, প্রকৃতি, হাজার বছরের সভ্যতার আলো ও আগুন, জটিল বিশ্বাস-সংস্কৃতি-মনোস্তত্ত্ব তার মননকে করে তুলেছিল বিস্ময়করভাবে ঋদ্ধ।

লেখক জীবনের শুরু
আমার মধ্যে খুনী হবার সম্ভাবনা ছিল! অন্তত স্বপ্নে কত যে খুন করেছি, সংখ্যা নেই। সম্পূর্ণ জাগ্রত অবস্থায় অবশ্য একবার নিজেকে খুন করতে গিয়ে চরম-মুহূর্তে হঠাৎ মনে পড়ে গিয়েছিল, আমার যে লেখক হবার কথা ছিল।
তার চারপাশে ছিল দুর্ধর্ষ, হিংস্র মানুষ, খুনী সন্ত্রাসী, যারা তাকে নদীর ধারে নির্জনে বসে বলত-
অক্তের নেশা কেমন করে যাবে মাস্টার? অক্ত না দেখলে যে আমার দিন কাটে না কি সমিস্যে গো
এইসব মানুষের দুর্দান্ত প্রভাব, চারপাশের আদিম জীবন, বন্যতায় রক্তে ঝমঝম করে বেজে উঠত রক্ত আর খুনের নেশা।
বাইরের পরিবেশ আমাকে ফুসলানি দিত: খুনী হও। কিন্তু পারিবারিক পরিবেশ আমাকে ধমক দিয়ে বলত : কবি হও, লেখক হও, সাহিত্যই তোমার বিষয়।
লেখক হওয়ার পুরোটাই ছিল তখন তার পরিবারে। বাবার সেই বিশাল রাইব্রেরি, দু®প্রাপ্য বই, পত্রিকার সংগ্রহ, সেইসঙ্গে বাবা সৈয়দ আবদুর রহমান ফেরদৌসী গল্প কবিতা লিখতেন, মা আনোয়ারা বেগম লিখতেন কবিতা ও গল্প। পাশের গ্রামের শ্রদ্ধানন্দ পাঠশালা থেকে বই নিয়ে আসত এক বালক, মা মেঝেতে আঁচল বিছিয়ে শুয়ে শুয়ে পড়ে শোনাতেন শরৎচন্দ্রের শেষ প্রশ্ন। ভারতচন্দের বিদ্যাসুন্দর। তাঁর ন’বছর বয়সে মায়ের মৃত্যু হলো। বিধবা মাসি একলিমা হলেন বিমাতা। তিনিও সাহিত্যানুরাগী। শ্রদ্ধানন্দ পাঠশালা থেকে বই আনা বন্ধ হলো না বালকের। তিনি পড়ে শোনাতেন বনফুলের দ্বৈরথ, পরশুরামের গড্ডলিকা। সেভাবেই তার পড়া শুরু-
আমার সজ্ঞানে প্রথম পড়া উপন্যাস : ‘অনন্তপুরের গুপ্তকথা’। তখন বয়স নয় কিংবা দশ। পড়েই লিখে ফেললাম ‘খোশবাসপুরের গুপ্তকথা’।

বালক বয়সেই তাঁর মধ্যে উঁকি দেয় লেখক সত্তা। উনিশ কুড়ি বছরে পিতৃবন্ধু জগদন্ধু দাশের সাহায্যে বের করেন হাতে লেখা পত্রিকা অঙ্কুর। অঙ্কুর পুরস্কার পায় নিখিল ভারত পাণ্ডুলিপি প্রতিযোগিতায়। চেয়েছিলেন কবি হতে- কিন্তু বুঝেছিলেন কবিতা তাঁর নয়। ১৯৫০ সালে দেশ পত্রিকায় বেরোয় তাঁর কবিতা শেষ অভিসার-
সেই আমার শেষ কবিতা। এই কবিতাটি লেখার সময় টের পেয়েছিলাম কবিতা আমার ভাষা নয়।
শুরু করেন গদ্য রচনা।
এ সময় আবার নাড়ির টান অনুভব করেন স্বাধীন জীবনের প্রতি, শোনেন প্রকৃতির মোহন বাঁশির ডাক, হাতে তুলে নেন বাঁশি-
এই বাঁশিই আমাকে লোকনাট্য দল ‘আলকাপে’ নিয়ে যায়। ছ-সাত বছর সে এক আশ্চর্য জীবন। সৌন্দর্য ও পাপ, অমৃত ও বিষ নির্দ্বিধায় পান করতে থাকলাম নীলকণ্ঠ শিবের দুঃসাহসে।
সময়টা ১৯৫৪। উত্তর রাঢ়ের লোকনাট্য আলকাপের সিরাজ মাস্টার তিনি। প্রবল জনপ্রিয় ও সুখ্যাত। গান গাওয়া ও বাঁশি বাজানোতে আশ্চর্য পারদর্শী।
১৯৫০ থেকে ১৯৫৬ এই ছয় বছর আলকাপে কাটে তাঁর। তারপর আবার শোনেন সভ্যতার ডাক, কলকাতার কুহকী হাতছানি। কিন্তু ততদিনে প্রকৃতি, জীবন, মানুষের বহুমাত্রিক সম্পর্ক, জীবন পিপাসা, যাপিত জীবনের বহু বিচিত্রতা, এইসব গতরজীবী নিম্নশ্রেণীর মানুষের ভালবাসার রং আদিমতা নিয়ে ভরে উঠেছে তাঁর ঝুলি। জমে উঠেছে লক্ষ-কোটি কথা। এই সব বিচিত্র মানুষের উপ্যাখ্যান, মৃত্যু, সংগ্রাম, প্রকৃতি, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের লড়াই ও বন্ধুত্ব নিয়ে শুরু হয় তাঁর প্রকৃত সাহিত্যজীবন। ১৯৬৬ সালে বের হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস নীলঘরের নটী। সাহিত্যের পথে যাত্রা শুরু হয় তাঁর।

কর্ম, সাহিত্য ও সৃষ্টির ভুবন

লেখ্য বিষয়ের বৃত্তে যে কেন্দ্র থাকে- তার নাম মানুষ।
জীবনকে তিনি দেখেন নানা ছন্দে, নানা বিভঙ্গে। আলকাপ তাঁকে দেয় বিচিত্র, বিরল ও বিদগ্ধ অভিজ্ঞতা। আড়াই হাজার রাতÑ ষাট হাজার ঘণ্টা তিনি হেঁটে বেড়ান গঞ্জে, হাঁটে, বাজারে, মেলায়। ঘুরে বেড়ান মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, মালদা, সাঁওতাল পরগনা দুমকায় অসংখ্য গ্রাম- দেখেন অজস্র মানুষ, তাদের বেঁচে থাকার বিচিত্রতা, সংগ্রাম, গোপন কান্না, সৌন্দর্য ও ভাঙ্গন- গ্রাম, প্রকৃতি, নৈঃশব্দ, নির্জনতা ও জন কোলাহল। বইয়ের বিশাল জগৎ তাঁকে নিয়ে যায় হাজার বছরের সভ্যতা, সৌন্দর্য আর নন্দন তত্ত্বের গোপন গভীর রহস্য আঁধারে। জ্ঞান-প্রজ্ঞার মণিমানিক্য, চিত-প্রকর্ষের শ্রেষ্ঠ ফসলে ভরা জটিল সংস্কৃতি আর সৃষ্টির আলোময় ভুবন, সত্য আর সুন্দরের জগত উন্মোচনের অসহ্য আনন্দ আর রোমাঞ্চে শিহরিত হন। দর্শন তাঁকে আকর্ষণ করেছে। প্রখ্যাত তাত্ত্বিক আবু সয়ীদ আইয়ুবের সান্নিধ্য তাঁকে দেয় আধুনিক বিজ্ঞান, দর্শন আর যুক্তির নতুন দৃষ্টি। তিনি বিঠোফেনের সিম্ফনি, পশ্চিমের ধ্রুপদী সঙ্গীত শোনান, আলোচনা করেন বিশুদ্ধ সঙ্গীতের অবজেকটিভিটি নিয়ে- আর্শ্চয এক আনন্দানুভূতি।
আলকাপের কোমর দোলানি ভাঙ্গা গলার গান, বংলার অতি সাধারণ লোকগীত, বিঠোফেন, মোৎসার্ট, মারকিন জাজ সমানভাবে উপভোগ্য হয় তাঁর কাছে। সবকিছু থেকে শুঁষে নেন প্রাণ আর আনন্দ।

আমি সেই সুপ্রাচীন মূল্যবোধে বিশ্বাসী, যা বলে : মানবিক যা কিছু, তাই নির্বিচারে সুন্দর। মানুষের পাপ সুন্দর, পুণ্য সুন্দর। তার রক্ত, অশ্রু, দুঃখ, সবই সুন্দর।
মানুষÑ মানুষই তার কর্ম আর সৃষ্টির মূল কেন্দ্রবিন্দু। তার আঁকা জীবন আদিম অকৃত্রিম, রক্তপিয়াসু প্রতিহিংসা, প্রতিশোধ, রিরংসায় পূর্ণ। আবার তিনি তুলে এনেছেন ঝড় বৃষ্টি ব্রজ বন্যা বাঘ শুকর, সাপের সঙ্গে লড়াই করা ক্ষুধার্ত মানুষ। প্রেম, কামনা, স্বপ্ন ভালবাসা, প্রত্যাশায় কাতর মানুষ-তাদের মানবিকতা সাহসিকতার জয়গাথা। ভাঙ্গন, জরা, মৃত্যু, ক্ষয়, হিংসা আর অবিনাশী মানুষ, এসেছে তার লেখায় অবিশ্বাস্য। তার সৃষ্টির জগত ভয়াল, দামাল ভয়ঙ্কর, নৃশংস, বেপোরোয়া। তার প্রকৃতি বিভূতিভূষণ বা তারাশঙ্করের প্রকৃতি নয়, তার পল্লী শরৎচন্দ্রের পল্লী নয়। শিরায় শিরায় তিনি ধারণ করেছেন প্রকৃতি তার বন্যতা আদিমতা আর স্বাধীনতা, মানুষ আর প্রকৃতির শরিক হয়ে টিকে থাকার লড়াই। বাঁশবনের ফাঁকে শেষরাতের ভাঙ্গা চাঁদ, জ্যোস্নায় পরীর নাচন, কলমির বেগুনি ছোপ লাগা সাদা ফুল, সবুজ পানারি পাতা, কাশফুল, ব্যানার জঙ্গল, বাবলা, হিজলা, ভাট, বুনো জাম, শেয়াকুল বিল, দ্বারকা নদীর অনুপুঙ্খ বর্ণনার সঙ্গে তাঁর প্রকৃতি ছমছম করে ওঠে-

বুড়াতলায় ঢুকলেই হুলস্থূল বেড়ে যায়। খড়কুটো ন্যাকড়াকানি, হলদেপাতার পোশাক পরে অশরীরীর নাচন। ফনিমনসার কাঁটায় সাপের খোলস পতপত করে ওড়ে। আসলে গ্রামের বহু জন্ম-মৃত্যু, রক্ত ও গোপন কান্নাকাটি, অতৃপ্ত বাসনা-কামনা এবং আত্মার অমরতা নিয়ে এই একটা ভূগোল। দক্ষিণের জানালা ও কাটা মুণ্ডুর গল্প।

বিভূতিভূষণের প্রকৃতির মতো তার প্রকৃতি সিগ্ধতায় পবিত্রতায় পূর্ণ করে এক অসীম বেদনা বোধ জাগায় না। তার প্রকৃতি আদিম, আবিল, বুনো, উদ্দাম, বন্যগন্ধা, বিধ্বংসী আর শক্তিময়। ভূমিপুত্রের দৃষ্টি নিয়ে তিনি দেখেছেন মানুষ আর প্রকৃতিকে। আর প্রকৃতি অনেক বেশি সশব্দ, ধ্বনিময়, নির্জলা। তার তৃণভূমি রক্তপিয়াসু ও রক্তপাতের। সেখানে শীতের পাতার মতো ঝরে জীবন। তার প্রকৃতি রক্তে ঝমঝমাঝম শব্দ তুলে, দামামা বাজায়, বন্য উন্মাদনায় পাঠককে কাঁপিয়ে তোলে। নিষিদ্ধ নেশার মতো তার দিকে আকৃষ্ট করে, আবিষ্ট করে। তাই তাঁর মতে-

অপুর মতো অক্ষত ও নিষ্কলুষ হয়ে প্রকৃতি থেকে ফেরা অসম্ভব ।
প্রকৃতির কাছ থেকে নিষ্কলুষ হয়ে না ফেরা তার চরিত্রগুলো স্বাধীন, মুক্ত, পাপ-পুণ্য পরোয়াহীন, অপরিশোধিত, অপরিশীলিত, কিন্তু বিশ্বাস সেখানে ডিগবাজি খায় না। এই বুনো প্রকৃতি, উদ্দাম স্বাধীন মানুষ, রক্ত ক্ষয়, হিংসা, হনন, প্রেম, অবিশ্বাস ও বিস্ময়, মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে এমন এক জগত তিনি তৈরি করেন বাংলা সাহিত্যের পাঠককে, যা স্তম্ভিত করে দেয়।
সে এক পৃথিবী আছে, দুর্গম রহস্যময়- যেখানে রক্ত ও অশ্রুর কোন পৃথক মূল্য নেই। সেখানেই আছে খাঁটি স্বাধীনতা।

তার নারীরাও আদিম অকপট, স্বাধীন, বুনো-
লালী বড় হলো। তবু তার বন্যতা গেল না। সভ্যতাতে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে সে ঘুরে বেড়াত বিষাক্ত লালপোকা নীলপোকা পাখি প্রজাপতি কুঁচফলের পৃথিবীতে (লালীর জন্য)
-আর যে স্বাধীনতায় মাটি ফুঁড়ে উদ্ভিদ আসে, ফুল ফোটে, প্রাণীরা জন্ম নেয়, লালী সেই খাঁটি স্বাধীনতাকে জেনেছিল (লালীর জন্য)
‘নিশিলতা’, ‘জিলকন্যা’ ও ‘বন্যা’ উপন্যাস তিনটিতে এঁকেছেন তিন ধরনের নারী চরিত্র। ‘নিশিলতা’র নায়িকা ভালবাসে অন্ধকার, যা নিঃসঙ্গতা আর কান্নার প্রতীক। ‘হিজলকন্যা’ উপন্যাসে বলেছেন ‘এক নয়া আবাদের কিস্সা’, মাটির যৌবনের কাহিনী, মানুষর সুখ-দুঃখ, জরা- ক্লান্তি , স্মৃতি-স্বপ্ন আর বেঁচে থাকা। আবার, সেই একইসঙ্গে দেখেছেন কীভাবে ‘ইতিহাসের উদ্ধত রথের চাকায় বার বার ব্যক্তিমানুষকে নির্মম বলি হতে হয়। এই বলির মধ্যেই আছে ‘মানুষের যত মহিমা- যত অমৃত।
তার আশ্চর্য সৃষ্টি অলীক মানুষ উপন্যাস। প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালে।
এগারোটি প্রধান ভারতীয় ভাষায় এটি অনূদিত হয়েছে। সাহিত্য অকাদেমি থেকে ইংরেজীতে গুঃযরপধষ গধহ নামে অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে। উপন্যাসটির জন্য পেয়েছেন সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার, ভুয়ালকা পুরস্কার ও বঙ্কিম পুরস্কার ও সুরমা চৌধুরী মেমোরিয়াল আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কার।
উনিশ-বিশ শতকের মুসলমান ধর্মগুরু ও তাঁর পরিবার নিয়ে এ উপন্যাস। ধর্মগুরু বদিউজ্জামান কেরামতি ছড়াতে ছড়াতে হয়ে ওঠেন এক অলীক মানুষ। তাঁর ছেলে শফিউজ্জামান ধর্মদ্রোহী, নৈরাজ্যবাদী, আত্মদ্বন্দ্বে ক্ষত-বিক্ষত- এরপর নিষ্ঠুর ঘাতক এবং একসময় হয়ে ওঠেন আরেক অলীক মানুষ। উনিশ শতকের শেষ আর বিশ শতকের শুরুর সন্ধিক্ষণে ফরাজী-ওহাবী, বাহ্ম, সন্ত্রাসবাদী, হিন্দুত্ব পুনরুদ্বার আন্দোলন, বিশ্বাস- অবিশ্বাস, সংশয়-সংঘাতের এক দ্বন্দ্বমুখর সময়ের এ উপন্যাস বাংলাসাহিত্যে এক অসামান্য আর ব্যতিক্রমী সংযোজন।
উপন্যাস নিয়ে তাঁর নিজের কথা- আসলে অলীক মানুষ বলতে আমি বুঝিয়েছি মিথিক্যাল ম্যান। রক্তমাংসের মানুষকে কেন্দ্র করে যে মিথ গড়ে ওঠে, সেই মিথই একসময় মানুষের প্রকৃত বাস্তব সত্তাকে নিজের কাছে অস্পষ্ট করে তোলে। বাক্তিজীবনের এই ট্রাজিক অলীক মানুষের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। উপন্যাসটিতে ইচ্ছা করেই কোন কালের ধারাবাহিকতা রাখিনি। অতীত বর্তমান এবং ভবিষ্যত মিলে এক হয়ে গেছে। এই আখ্যানে প্রকৃত অর্থে মাত্র দুটি-ই ধর্মগুরু বদিউজ্জামান এবং তার নাস্তিক পুত্র শফিউজ্জামান। এই দুটি মানুষ নিয়ে আমি এক ধরনের খেলা খেলতে চেয়েছি। একজন মনে করে মানুষের নিয়ন্তা ঈশ্বর, অন্যজন ধারণা পোষণ করেন যে মানুষ নিজেই সত্তার নিয়ন্তা। ( সে.মু.সি.: অলীক মানুষ, এ আমি স্বেচ্ছাচারিতার আনন্দ পেয়েছি, কোরক, শারদীয় ১৪০০ বঙ্গাব্দ)

আদিম জীবন আর আধুনিকতার উন্মীলন তার সৃষ্টিকে করে তুলেছে অভিনব অতুল ও অতলস্পর্শী। জীবন-প্রকৃতির এই খোলামেলা, অকাট, নিপাট এবং নিরাভরণ, উলঙ্গ প্রকাশ পাঠককে বিস্ময়ে বিমূঢ় করে।

বিশাল বিবিধ আর বহুমাত্রিক তাঁর সৃষ্টি আর কর্ম।
লিখেছেন তিন শ’র বেশি গল্প, ১৫০টি উপন্যাস। গোয়েন্দা কাহিনী, কিশোর উপন্যাস সব মিলিয়ে ২৫০টি বই। তাঁর গোয়েন্দা কাহিনী সিরিজ ডিটেকটিভ কর্নেল ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। তার গল্প রানী ঘাটের বৃত্তান্ত ফালতু নামে সিনেমা হয়েছে।

এক স্বাধীনসত্তা
তার সৃষ্ট প্রকৃতি আর মানব যেমন স্বাধীন, উদ্দাম, নিজেই এক ঈশ্বর। তিনি নিজেও অন্তরে গভীরভাবে ধারণ করেছিলেন স্বাধীনতাকে, ছিলেন মুক্ত এক মানব। সিরাজও তাই স্বাধীনতাÑ
এলাকার মানুষের মধ্যে আদিম স্বাধীনতাবোধের যে আবেগ ছিল, তা ইচ্ছে করেই মন পেতে ভরে নিয়েছিলাম। প্রকৃতিসঞ্জাত এই স্বাধীনতার স্বাদ মানুষকে প্রেমিক করে, দার্শনিক করে, আবার যোদ্ধাবেশধারী হত্যাকারীও করে। মানুষ তখন রাষ্ট্র ও অন্যের প্রভুত্ব অস্বীকার করে। সে তখন নিজেকে এমন এক বিশ্বের বাসিন্দা করে, যেখানে রাষ্ট্র নেই, আইন নেই, শাসন নেই, সমাজ নেই, তথাকথিত ধর্ম নেই। তার ঈশ্বর সে নিজে।
আনন্দবাজার পত্রিকায় তিনি কাজ করেছেন দীর্ঘ ২৫ বছর। কিন্তু আনন্দবাজারের মতাদর্শের সঙ্গে তাঁর একাত্মতা ছিল না। সাহিত্যের মত, গোষ্ঠী লবিং কোনটাটেই তিনি ছিলেন না। সাহিত্যের উচ্চকিত কণ্ঠস্বরের বাইরে তিনি রাখতেন তাঁর স্বাধীন মতামত। ধর্ম নিয়েও তাঁর কোন মাথাব্যথা ছিল না।
ধর্ম নিয়ে মাথা ঘামাইনে।... হিন্দু মানুষ মুসলমান মানুষ কিছু বুঝি না। মানুষ বুঝি। এই দেশের মানুষ... মানুষ আমার কাছে শুধু প্রকৃতির সন্তান। প্রকৃতিই শাশ্বত এবং ঈশ্বর। প্রকৃতিই অনন্ত জ্ঞান ও চেতনা। প্রকৃতিই একাধারে কার্য এবং কারণ।
তাঁর লেখক সত্তা আর লেখক হয়ে ওঠার বিষয়টি তাঁর জানা। তিনি চেয়েছেন আর এজন্য তাঁর প্রস্তুতি ছিল-
কোনো এক সুসময় বা দুঃসময়ে বা ঘটনাচক্রে হঠাৎ লেখক হয়ে উঠিনি। ... গোড়া থেকেই জানতাম আমি কি ভূমিকা নিতে চলেছি। সচেতনভাবে তৈরি হয়েছি সে দায়িত্ব পালনে।
আমি নিজেকে বক্তব্যজীবী লেখক মনে করি। আত্মপ্রকাশের ছলে কিছু কথা বলাই আমার লক্ষ্য।
এভাবেই পথ, কর্ম আর গন্তব্য জানা ছিল তাঁর। ভূমি সংলগ্ন মানুষের কথা, তাদের সংগ্রাম, বোধ-বিশ্বাস, স্বার্থপরতা, উত্থান-পতন জীবনের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এসব তিনি জানতেন। দেখেছেন গভীর পর্যবেক্ষণী দৃষ্টি দিয়ে-
বাংলা সাহিত্যের বিষয় আধুনা নগরকেন্দ্রিক.... এত সাহিত্যের কতটা উন্নতি ঘটছে জানি নাÑ কিন্তু বিশাল এক আত্মপ্রবঞ্চনা ঘটছে। জনসংখ্যার এক প্রকাণ্ড অংশ গ্রামবাসী।
লেখক হিসেবে তিনি যেমন তাঁর দায়িত্বের কথা বলেছেন, তেমনি রাজনৈতিক সামাজিকভাবেও তিনি দায়িত্বশীল ছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন এক কলমী মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৬৮-৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানে তিনি কলম ধরেছিলেন। বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে লিখেন কথিকা এবং পাঠ করেন কলকাতার আকাশবাণী রেডিওতে।
এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, ‘১৯৭১ আমার কাছে এক উত্তেজনার বর্ষ। আমি মনেপ্রাণে বাঙালী, তাই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে আমি এসে দাঁড়িয়েছিলাম মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে। অস্ত্র ছিল আমার কলম।
অসাম্প্রদায়িক, গোঁড়ামিমুক্ত, সংস্কারহীন এ মুক্ত মানব জানতেন তাঁর সাহিত্যকর্ম আর দর্শন। জীবনের রহস্য উন্মোচনে তিনি নিবেদিত ছিলেন। নিজের সাহিত্য সম্পর্কে তাই তাঁর মূল্যায়নÑ
জীবনের নানা রহস্যকে বুঝতে চেয়েছি। ধরতে আগ্রহী হয়েছি,তবু জীবন তাঁর যাবতীয় জটিলতা নিয়ে এখনও যে রয়ে গেছে এক জটিল অন্ধকারে ঢাকা। ....ধর্মের ব্যাপারে আমার মনে বিন্দুমাত্র গোঁড়ামি নেই... দুই সম্প্রদায়ের মানুষেরই নানাবিধ ঘরোয়া ও সামাজিক সমস্য,া যা আমার শিল্পভাবনাকে আলোড়িত করেছে সেখানে আমি নিরপেক্ষ ও নিষ্ঠাশীল হতে চেয়েছি।

মিথিক্যাল ম্যান
নিজের আত্মকথা লিখতে গিয়ে বলেছেন, কোথায় আছি? সত্যি সত্যি আছি তো।
বরেণ্য এ কথাসাহিত্যেকের অবস্থান বাংলা সাহিত্যের কোথায় নির্ধারিত হবে তা নির্ধারণ করবে কাল। সাহিত্যে কারও সঙ্গে কারও স্থান তুলনীয় নয়। জোর করে এখানে দখলও নেয়া যায় না। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ তার বিপুল, বিচিত্র, বিস্ময়কর সৃষ্টি দ্বারা পাঠকের মনে আসন গেড়ে নিয়েছেন। তাঁর এ শারীরিক প্রস্থান হয়তো তাঁকে আরও বেশি করে আবি®কৃত করবে, পাঠকের কাছে আরও বেশি করে উন্মোচিত করবে। এভাবেই তিনি হয়ত হয়ে উঠবেন জীবন ও প্রকৃতির সমার্থক- সাহিত্যের এক আশ্চর্য অলীক পুরুষ।
nurquamrunnaher@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.