আরেক আলোকে-অন্তিমকালে প্রসাধনী প্রয়োগ by ইনাম আহমেদ চৌধুরী

দেশের আইন-শৃঙ্খলা আজ সর্বনিম্ন পর্যায়ে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে কুইক রেন্টাল ঘটিত অবিবেচনাপ্রসূত দুর্নীতির ফলাফল জাতিকে বহুদিন ভোগ করতে হবে। অন্য প্রায় সব মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডে দুর্নীতি বা স্থবিরতার দুর্নাম। প্রশাসনে হয়েছে দলীয়করণ-দুর্বৃত্তায়ন।


এমতাবস্থায় মন্ত্রিসভায় কতিপয় নতুন মুখের সংযোজন কোনো সুফল প্রসব করতে পারবে বলে মনে হয় না
সূর্য প্রায় অস্তচূড়াবলম্বী। বর্তমান সরকারের আয়ুষ্কালের শেষ প্রান্তে এসে চতুর্থবারের মতো এবার হলো মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি ৩২ সদস্যের মন্ত্রিসভা নিয়ে যাত্রা শুরু করে আজ এ হয়ে দাঁড়াল ৫০ সদস্যের। মেয়াদপূর্তির তেরো মাস আগে।
রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে মন্ত্রিসভায় অদলবদল করে একে সুফলপ্রসূ করে তোলার প্রচেষ্টার প্রবণতা প্রত্যেক গণতান্ত্রিক দেশেই রয়েছে। তবে এবার যে বিরাটাকারে এই সংযোজন ঘটল, তাতে একটা বিষয় প্রতিষ্ঠিত হলো। তা হচ্ছে সরকারের আপাত ব্যর্থতা এবং সরকারপ্রধানের এই বাস্তবতার স্বীকৃতি প্রদান। সরকারের বিভিন্ন প্রতিনিধিবর্গ হরহামেশা বলেই চলেছেন, দেশের প্রভূত উন্নয়ন হচ্ছে_ বাংলাদেশে এর চেয়ে ভালো অবস্থা আগে কখনও ছিল না। এই দাবিটি যে কত অমূলক এবং বাস্তবতা জ্ঞানহীন সত্য ভ্রষ্টতা, তা সরকারের সর্বোচ্চ মহলে উপলব্ধিসঞ্জাত এই বিরাট পরিবর্তনের প্রচেষ্টা তাই প্রমাণ করছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিবর্তন বা পরিবর্ধন কতটুকু কার্যকরী বা ফলপ্রসূ হবে? এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন মন্ত্রীরা কতটুকু নিজস্ব ও সমষ্টিগত সাফল্য অর্জন করতে পারবেন?
এই নিবন্ধ রচনার সময়ে আমি জানি না কে কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাচ্ছেন অথবা কোন বর্তমান মন্ত্রী তার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হারাচ্ছেন বা কে কে মন্ত্রিসভায় যোগদানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছেন। তবে যাই হোক না কেন, আমার মনে হয় বর্তমানে অবস্থা যে পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে কতিপয় নায়কের পরিবর্তন কোনো বিশেষ সুফল আনতে পারবে না। কেননা, এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। প্রশাসনিক কাঠামোতে ধরে গেছে পচন। কোনো কসমেটিক সার্জারি এখন কাজে আসবে না। যদি না পরিবর্তন হয় সরকারের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিতে, নীতি ও আচরণে এবং প্রশাসন দলীয়করণের প্রবণতায়। কোনো কোনো প্রস্তাবিত দলীয় নেতা যদি মন্ত্রিসভায় যোগদান না করেন তবে তা অবিসংবাদিতভাবেই প্রমাণ করবে যে তিনি ডুবো তরীতে আর উঠতে চাইছেন না এবং মনে করছেন যে, এই পর্যায়ে সরকারে কোনো মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হবে না। অর্থাৎ এই পতনোন্মুখ সরকারের একাংশ হতে তাদের মন বা বিবেচনা চাইছে না। দুঃখের বিষয়, রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় জীবনের প্রায় সর্বক্ষেত্রেই বর্তমানে নেমে এসেছে বিপর্যয় বা স্থবিরতা। প্রথমেই ধরা যাক, অর্থনীতি বিষয়ক বা সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র।
শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি ও সোনালী ব্যাংক লুটের সঙ্গে সরকারের উচ্চপদস্থ মন্ত্রী বা মন্ত্রী পর্যায়ের পদাভিষিক্তদের নাম সংশ্লিষ্ট রয়েছে। হলমার্কের তানভীর মাহমুদের সঙ্গে এখন সোনালী ব্যাংকের আরেক লুটেরার নাম উঠে এসেছে। গৌতম কুমার মিত্র। তিনি নাকি জালিয়াতি করেছেন ৫১ কোটি টাকা। আরও কত নাম, কত লুটপাটের কথা ধীরে ধীরে প্রকাশ পাবে। ডেসটিনি গ্রুপের বিরাট ঠগবাজির ঘটনায় দেখা যায় এমডি রফিকুল আমীন ছাড়াও সংশ্লিষ্ট রয়েছেন চেয়ারম্যান লে. জেনারেল হারুন-অর-রশীদ। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের নেতা। প্রাক্তন সেনাপ্রধান এবং আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে খ্যাত। তার সংশ্লিষ্টতা অতীব দুঃখ এবং উদ্বেগজনক। সাবেক রেলমন্ত্রীর কাহিনী সর্বজনবিদিত। রেল মন্ত্রকের উৎকোচ গ্রহণ সম্ভবত দেশের সর্বকালের সর্ববৃহৎ সুসংবদ্ধ আর্থিক ক্রাইম। পদ্মা সেতু সম্পর্কিত দুর্নীতির কথা আর নাইবা বললাম। রাষ্ট্রব্যবস্থার উচ্চতম পর্যায়ের পদাভিষিক্তদের অভিযুক্ত দুর্নীতির কারণে দেশের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যাহত আগে কখনও হয়নি। আন্তর্জাতিকভাবে নিন্দিত এই ঘটনা দেশের অন্যান্য উন্নয়ন প্রচেষ্টায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আর আন্তর্জাতিকভাবে সর্বনন্দিত গ্রামীণ ব্যাংককে আত্মসাৎ করার সরকারি প্রচেষ্টা সর্বজনধিক্কৃত। বর্তমানের এই অর্থনৈতিক সংকটাবস্থায় ব্যবসায়ী মহল এবং এফবিসিসিআইও শঙ্কিত।
শিক্ষাক্ষেত্র এখন চরমভাবে বিপর্যস্ত। পত্রিকার পাতায় পাতায় দেখা যায় সরকারি মদদপুষ্ট একটি বিশেষ ছাত্র সংগঠন কী সব তাণ্ডবলীলা চালাচ্ছে। মারপিট-দাঙ্গা করছে। শিক্ষায়তন-প্রশাসন করে দিচ্ছে স্থবির। বুয়েটসুদ্ধ অনেকগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন শিক্ষা প্রদান ব্যাহত এবং বিরাজমান রয়েছে চরম উচ্ছৃঙ্খলতা। সিলেটে প্রশাসনের এবং কলেজ কর্তৃপক্ষের নাকের ডগায় তিনটি ছাত্রাবাস পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া হলো; অথচ সরকারের শিক্ষা বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রতিকারমূলক কার্যক্রম নেই। শিক্ষাক্ষেত্রে আজ চরম নৈরাজ্য ও সরকারি ব্যর্থতা।
দেশের আইন-শৃঙ্খলা আজ সর্বনিম্ন পর্যায়ে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে কুইক রেন্টাল ঘটিত অবিবেচনাপ্রসূত দুর্নীতির ফলাফল জাতিকে বহুদিন ভোগ করতে হবে। অন্য প্রায় সব মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডে দুর্নীতি বা স্থবিরতার দুর্নাম। প্রশাসনে হয়েছে দলীয়করণ-দুর্বৃত্তায়ন।
এমতাবস্থায় মন্ত্রিসভায় কতিপয় নতুন মুখের সংযোজন কোনো সুফল প্রসব করতে পারবে বলে মনে হয় না। এটাকে ধরে নেওয়া যেতে পারে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে প্রসাধনী প্রলেপের একটি মর্মান্তিক প্রচেষ্টা।
এর চেয়ে যদি সরকার ঘোষণা করত, বাস্তব ক্ষেত্রে দেখাতে পারত যে, দুর্নীতির প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে তারা 'জিরো টলারেন্স' দেখাচ্ছে। দেশের উন্নয়নের স্বার্থে উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের দুর্নীতির অভিযোগে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনে শৃঙ্খলা ও শিক্ষানুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে, দোষী ব্যক্তিরা সাজা পাচ্ছেন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার আন্তরিক প্রচেষ্টা হচ্ছে_ তা হলে হয়তো সরকারের উদ্যোগ ফলপ্রসূ হতো। সরকারের যেসব লোককে দেখলে জনগণ ধিক্কার দিয়ে প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসার ভাষায়_ 'তুই চোর, তুই চোর' বলবে, সেসব লোকের শাস্তি প্রদান ও অপসারণই ছিল সবচেয়ে বড় কাম্য।

ইনাম আহমেদ চৌধুরী : সাবেক সচিব
 

No comments

Powered by Blogger.