এক জীবনবাদী ধর্ম সাধক by এম আবদুল আলীম

পরনে শ্বেতবসন, কপালে চন্দন তিলক, করপুটে ভক্তির অর্ঘ্য, কী এক ঐশী আলোকস্পর্শ পেতে একাগ্রচিত্তে ধ্যানমগ্ন ভক্ত, সামনে যোগাসনে বসা ঠাকুরের চিত্রপট, গুরুগম্ভীর শঙ্খধ্বনি, বাতাসে ধূপকাঠির সুগন্ধ, কীর্তনের সুর মূর্ছনা_ এ চিত্র দৃশ্যমান হয় পুণ্যভূমি পাবনার হেমায়েতপুরের সৎসঙ্গ আশ্রমে।


সারাবছরই অগণিত ভক্তের ভক্তিরসে সিক্ত হয় ওই পুণ্যভূমি। কেবল সনাতন হিন্দুরাই নন, অন্য ধর্মাবলম্বীরাও আসেন এখানে। ঠাকুর তো কেবল সনাতন হিন্দু ধর্মের সারসত্যকে চেতনায় ধারণ করেননি, বরং সব ধর্মের নির্যাস থেকে পরম স্রষ্টাকে অনুসন্ধান করেছেন। ধর্মকে তিনি পৃথক করে দেখেননি, বহুমতের স্রোতধারাকে তিনি একই ধর্ম সমুদ্রে মিলিত হতে দেখেছেন। লালনের একাত্মবাদী দর্শনের মর্মবাণীই (আরবি ভাষায় বলে আল্লাহ/ ফার্সিতে কয় খোদাতালা/গড বলিছে যিশুর চ্যালা/ভিন্ন দেশে ভিন্নভাবে।) যেন ঠাকুরের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে।
অনুকূলচন্দ্র ঠাকুর এক ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ। তিনি আপন সাধনা, উপলব্ধি, কর্মানুষঙ্গ ও চেতনা আদর্শ দ্বারা অগণিত মানুষের আস্থা, বিশ্বাস ও চেতনার জগতে অনুরণন তুলেছেন। স্বকাল, স্বসমাজের গণ্ডি অতিক্রম করে সর্বযুগের সব মানুষের অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। 'সৎসঙ্গ' নামে এক ধর্মমতের প্রবর্তন করে অগণিত মানুষকে পথের দিশা দিয়েছেন। 'কেউ কারও ওপর নির্ভরশীল হবে না, কেউ কারও কাছে প্রত্যাশী হবে না, স্বাবলম্বন ও দীক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে সাধনায় সিদ্ধিলাভ করতে হবে'_ এই হলো সৎসঙ্গ আশ্রমের মূলমন্ত্র।
সত্য অনুসন্ধানী মনোভাব থেকেই তার উচ্চারণ_ 'সর্বপ্রথম আমাদের দুর্বলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে_ সাহসী হতে হবে, বীর হতে হবে।' সাহসী হলে এবং কপটতা ত্যাগ করলেই কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব ধর্মরাজ্যে প্রবেশ করা। আরাধ্য ইষ্ট লাভের জন্য সবকিছুকে ইতিবাচক ও সুন্দর দৃষ্টিতে অবলোকন করতে হবে। এ যেন সেই 'সত্যম সুন্দরম শিবম'-এর সাধনা। এ সাধনার জন্য চাই দৃষ্টির প্রখরতা। সেই প্রখর দৃষ্টিতে বিশ্রীও হয়ে উঠবে সুশ্রী। ঠাকুরের আদেশ_ 'যদি সুন্দর হতে ইচ্ছা থাকে তাহলে বিশ্রিতাকেও সুন্দর দেখ।' সুন্দরের এই যে আরাধনা তা হতে হবে স্বকীয় মণ্ডিত, বিনয় আর ঔদার্যে পরিপূর্ণ; স্বাধীন চিন্তা এবং স্বাধীন মত প্রকাশের অক্লান্ত এষণাও এখানে থাকতে হবে। আধুনিকমনস্ক অনুকূল ঠাকুর ব্যক্তি মানুষকে সত্যদর্শীর আশ্রয় নিতে বলেছেন, বলেছেন স্বাধীন চিন্তার অধিকারী হতে। স্বাধীন চিন্তার অধিকারী মানুষ স্বাধীনভাবে নিজের মতপ্রকাশ করতে দৃঢ়চেতা হবে স্বাভাবিকভাবেই।
অনুকূল ঠাকুর মানুষকে সৎ হতে বলেছেন। 'তার গড়া সৎসঙ্গ ধর্ম সম্প্রদায় নির্বিশেষে সৎ মানুষের জন্য মুক্তমঞ্চ ও আনন্দবাজার বসিয়েছেন।' যে মানুষ অন্যকে সৎ ভাবতে পারে না সে নিজে কখনও সৎ হতে পারে না। তাই বলে অসৎকে সৎ বলতে ঠাকুর নারাজ। অসত্যকে তিনি কখনোই প্রশ্রয় দিতে বলেননি। ব্যক্তিকে আত্মশুদ্ধির জন্য সচেষ্ট থাকতে হবে, সত্যনিষ্ঠ হতে হবে, সৎ জীবনযাপন করতে হবে। এতে তাকে অনুসরণ করে অন্যরা আলোকিত জীবন গড়তে পারবে। ঠাকুরের গভীর উপলব্ধিজাত উচ্চারণ_ 'তুমি যদি সৎ হও, তোমার দেখাদেখি হাজার হাজার লোক সৎ হয়ে পড়বে। আর যদি অসৎ হও, তোমার দুর্দশার জন্য সমবেদনা প্রকাশের কেহই থাকবে না। কারণ তুমি অসৎ হয়ে চারদিকই অসৎ করে ফেলছ।' অনুকূল ঠাকুরের দেখানো পথ সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের পথ। কেবল কথার ফুলঝুরিতে নয়, কর্মের মাধ্যমে ভক্তদের জন্য ঠাকুর রেখে গেছেন জীবনের পথচলার নির্দেশনা। তার অসংখ্য পঙ্ক্তি ও বাণীবন্ধ পুস্তিকা ভক্তদের কর্মের পথকে করছে কণ্টকমুক্ত। হেমায়েতপুর ও দেওঘরে প্রতিষ্ঠিত বহুমুখী প্রতিষ্ঠান তাদের করছে প্রেরণাদীপ্ত। অনুকূলচন্দ্রের দীপ্তিতে ভক্তপ্রাণ আজ ব্যাকুল, নিত্যনতুন আলোকছটায় উদ্দীপ্ত। তাদের প্রাণে ঠাকুরের আদর্শের আলোক যেন উছলে পড়ছে। শত অবক্ষয়ের মধ্যেও তা যেন অনন্ত আলোর দিশা।

ড. এম আবদুল আলীম : সভাপতি বাংলা বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
dr.alim36@yahoo.com
 

No comments

Powered by Blogger.