শয়নকক্ষে আরো এক খুন-নিহত রিপন গত আওয়ামী লীগ সরকারের -সময় বাণিজ্যমন্ত্রীর এপিএস ছিলেন

রাজধানীতে নিজ শয়নকক্ষে আরো একজন খুন হয়েছেন। গ্রীন রোডের একটি বাড়িতে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। গতকাল রবিবার জিয়াউল ইসলাম রিপন (৪০) নামের ওই ব্যক্তির পচন-ধরা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। রিপন গত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে বাণিজ্যমন্ত্রী আব্দুল জলিলের ব্যক্তিগত সহকারী সচিব (এপিএস) ছিলেন বলে স্বজনরা জানিয়েছেন।


তিনি সাম্প্রতিককালে ওয়াসার ঠিকাদারি কাজ করতেন। একসময় ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও কোনো পদে ছিলেন না তিনি।
পুলিশ ও স্বজনরা বলছেন, রিপনকে হাত বেঁধে মাথায় আঘাত করে এবং শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, দু-তিন দিন আগে তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। বাসা থেকে তাঁর একটি মোটরসাইকেল ও দুটি মোবাইল ফোনসেট খোয়া গেছে। রিপনের বড় ভাই নাসিরুল ইসলাম রানা বাদী হয়ে কলাবাগান থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। গতকাল রাত পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, ঠিকাদারি বা ব্যবসায়িক বিরোধ, রাজনৈতিক বিরোধ ও ব্যক্তিগত বিরোধ- এ তিনটি কারণ সামনে রেখে মামলার তদন্ত শুরু হয়েছে। থানার পুলিশের সঙ্গে মাঠে নেমেছে গোয়েন্দা পুলিশও (ডিবি)।
কলাবাগান থানার ওসি এনামুল হক এনাম কালের কণ্ঠকে বলেন, গতকাল সকালে গ্রীন রোডের ৫৯ নম্বর দোতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষ থেকে রিপনের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। বড় ভাই নাসিরুল ইসলাম রানা রিপনের
লাশ দেখে থানায় খবর দেন। শোবার ঘরে বিছানার ওপর লাশটি পড়ে ছিল। গামছা দিয়ে তাঁর হাত বাঁধা এবং গলায় একটি তোয়ালে জড়ানো ছিল। ডান চোখের ওপর কপালে ও মাথায় রক্তাক্ত জখম ছিল। পরনে একটি লুঙ্গি ছাড়া আর কিছু ছিল না। লাশে পচন ধরায় দু-তিন দিন আগে রিপনকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শ্বাসরোধ ও মাথায় আঘাত করে এ হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি হাতল ভাঙা হাতুড়ি উদ্ধার করেছে পুলিশ। ওসি এনাম বলেন, 'চেনাজানা লোকই তাঁকে হত্যা করেছে বলে মনে হচ্ছে।'
লাশ উদ্ধারের পরপরই ডিএমপির রমনা জোনের ডিসি সৈয়দ নূরুল ইসলাম, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্রাইম সিন ইউনিট ও ডিবির একটি দল ঘটনাস্থলে আসে। দুপুর দেড়টার দিকে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
বাদী নাসিরুল ইসলাম রানা কালের কণ্ঠকে বলেন, তিনি পরিবার নিয়ে থাকেন ইন্দিরা রোডের একটি ভাড়া বাসায়। অবিবাহিত রিপন দীর্ঘদিন ধরে ৫৯ নম্বর গ্রীন রোডের বাসায় ভাড়া থাকতেন। দুই কক্ষের ভাড়া বাসার একটি কক্ষ রিপন দুই তরুণের কাছে সাবলেট দিয়েছেন। ওই দুই তরুণ ঈদে বাড়ি গেছে বলে শুনেছেন তাঁরা। তবে তাদের নাম-ঠিকানা জানেন না রিপনের স্বজনরা। বড় ভাই রানার বাসায় গিয়েই খাওয়া-দাওয়া করতেন রিপন। মাঝেমধ্যে বাসায় খাবার নিয়ে আসতেন। রানা ও তাঁর মেয়ে নওশিন রিপনের বাসায় আসা-যাওয়া করতেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে ভাইয়ের বাসায় গিয়ে খাবার খেয়ে আসেন রিপন। শুক্রবার রাতে রানা যোগাযোগের চেষ্টা করে রিপনের মোবাইল ফোন বন্ধ পান। পরের দিন শনিবার বিকেলে রিপনকে খুঁজতে গিয়ে বাসার নিচে মোটরসাইকেল না দেখে রানা ভাবেন, সে বাসার বাইরে আছে। গতকাল সকালে রিপনের বাসার চাবি নিয়ে আসেন রানা। ওই বাসার একটি চাবি তাঁদের কাছে ছিল বলে দাবি করেন রানা।
তিনি বলেন, সকাল ৭টার দিকে বাসার তালা খুলে ভেতরে গন্ধ পান এবং বিছানায় একজনের পা দেখেন। দ্রুত তিনি থানায় খবর দেন। পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে। স্বজনরা বলেন, বাসা থেকে রিপনের দুটি মোবাইল ফোন ও একটি বাজাজ ডিসকভার মোটরসাইকেল ছাড়া আর কিছু খোয়া যায়নি। তাঁদের দাবি, ঘটনাটি চুরি বা ডাকাতি নয়; পরিকল্পিতভাবে রিপনকে হত্যা করা হয়েছে। স্বজনরা জানান, রিপন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলের সাধারণ সম্পাদক ও বাণিজ্যমন্ত্রী আব্দুল জলিলের এপিএস ছিলেন। ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও কোনো পদে ছিলেন না তিনি। তবে দলে সক্রিয় থেকে ওয়াসার ঠিকাদার হিসেবে কাজ করতেন। তেজগাঁওয়ের 'জেআই কনসোর্টিয়াম' নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ছিলেন রিপন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, রিপন ছাত্রলীগসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে কাজ করেছেন। তিনি দলের হয়ে গোপনে প্রত্যেকের তথ্য সংগ্রহ করে রিপোর্ট করতেন। এতে দলীয় কোনো পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ঠিকাদারি কাজ নিয়ে আর্থিক লেনদেনের কারণেও খুন হতে পারেন। তাঁর বাসায় যে দুজন থাকতেন তাদের পরিচয় জানা যায়নি।
একটি সূত্র জানায়, রিপনের সঙ্গে এক মেয়ের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। দুই বছর ধরে ওই সম্পর্কে টানাপড়েন চলছিল। এসব ব্যাপার সামনে রেখে তদন্ত করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ডিবির ৪ নম্বর টিমের সহকারী কমিশনার হাসান আরাফাত বলেন, হত্যাকাণ্ডের আলামত ও পরিবার-পরিজনের সঙ্গে কথা বলে হত্যার কারণ হিসেবে ঠিকাদারি-সংক্রান্ত টাকাপয়সা নিয়ে বিরোধ, রাজনৈতিক বিরোধ এবং প্রেমের ব্যাপারটিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
গতকাল দুপুরে রিপনের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, তাঁর কক্ষ ও পাশের কক্ষের টেলিভিশন, কম্পিউটার, ফ্রিজসহ সব দৃশ্যমান মূল্যবান জিনিসপত্র আছে। ঘরের কোথাও তছনছের আলামত নেই। দুই কক্ষের বাসার প্রথম কক্ষে সাবলেট হিসেবে দুই তরুণ থাকতেন বলে জানা গেছে। সেখানে কম্পিউটারসহ সব মালামাল আছে। আছে বইপত্র। টেবিলে রিপনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র। রিপনের কক্ষের বিছানায় কোলবালিশে তাঁর রক্তের দাগ। আর সব কিছুই স্বাভাবিক।
বাড়ির মালিক মোহাম্মদ সাঈদ কালের কণ্ঠকে বলেন, সাত বছর ধরে দুই তলার বাসাটিতে থাকতেন রিপন। সেখানে তিনি সাবলেট তুলতেন। আবার একাও থাকতেন। এসব ব্যাপারে হস্তক্ষেপ বা খোঁজখবর করতেন না তিনি। সম্প্রতি দুই তরুণকে ওই বাসায় দেখা যেত। বাড়ির সিঁড়ির নিচে শিকল দিয়ে তালাবদ্ধ করে মোটরসাইকেল রাখতেন রিপন। গত শুক্রবার রাত ১২টার দিকে প্রধান ফটকের তালা লাগাতে গিয়ে সাঈদ দেখেন, রিপনের মোটরসাইকেলটি নেই। রিপন বাসায় ফিরবেন কি না, জানতে মোবাইল ফোনে কল করেন তিনি; কিন্তু ফোন বন্ধ পান।
রিপনের পাশের ফ্ল্যাটের গৃহিণী জোছনা বেগম বলেন, ঈদের আগের দিন সপরিবারে বাড়ি যাওয়ার সময় তিনি রিপনকে বাসায় দেখে যান। শনিবার রাতে তাঁরা ফেরেন কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ পাননি প্রতিবেশীর।
স্বজনরা জানান, রিপনের বাবার নাম রফিকুল ইসলাম। তাঁদের গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের বেলেপুকুর গ্রামে। তিন ভাইয়ের মধ্যে রিপন ছিলেন দ্বিতীয়। বড় ভাই রানা গৃহনির্মাণ প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ী। ছোট ভাই অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী।

গতকাল রাতে পুলিশের রমনা জোনের উপকমিশনার সৈয়দ নূরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, হত্যাকারী শনাক্ত করতে থানার পুলিশের সঙ্গে ডিবির টিমও মাঠে নেমেছে। হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
প্রসঙ্গত, গত বুধবার রাতে রাজধানীর মহাখালীতে বক্ষব্যাধি হাসপাতালের কোয়ার্টারের নিজ শয়নকক্ষে খুন হন ওই হাসপাতালের চিকিৎসক নারায়ণ চন্দ্র দত্ত (নিতাই)।

No comments

Powered by Blogger.