অভিমত নতুনের মননে, বঙ্গবন্ধু by কেয়া চৌধুরী

বল বীর বল উন্নত মম শির শির নেহারি আমারি নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির! ক্ষণজন্মা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সারাটা জীবনের অভিব্যক্তি যেন নজরুলের বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতার এ চরণগুলোতে খুঁজে পাই আমরা। যিনি কখনও মাথা নত করেননি; কোন অবৈধ শক্তি, ষড়যন্ত্র, জেল-জুলুম বা অত্যাচারে।


তিনি তো বঙ্গবন্ধু যিনি পাহাড় সমান মহৎ কর্মযজ্ঞ দিয়ে, ‘শেখ মুজিব‘ ডাকের ছোট্ট নামটিকে শাশ্বত, বরণীয়, চিরস্মরণীয় করে নামমাহাত্ম্যে উদ্দীপনীয় করে তুলেছেন গোটা জাতির হৃদয়ে। মুক্তি সংগ্রামের বিরল ইতিহাসে মুজিব একটি নক্ষত্রের নাম। উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও কায়েমি স্বার্থের শৃঙ্খল চূর্ণ করে যে ক’জন মহান ব্যক্তিত্ব মানব সভ্যতার রথকে সামগ্রিক মুক্তির সূর্য তোরণের দিকে শত সংগ্রাম ও ত্যাগের ভেতর দিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, তাদের সারিতে সমহিমায় অধিষ্ঠিত আছেন, মধুমতি নদীর কুলঘেঁষা টুঙ্গিপাড়ার মেঠোপথের ধুলায় মাখা ভালবাসার জাদুকর ‘শেখ মুজিব’। মুজিব চির সজীব, চির নতুন। প্রতিযুগে অনাগত প্রজন্মে উন্নত শির। মুজিব একটি আদর্শ। একটি চেতনার নাম। আদর্শ বা চেতনার মৃত্যু হয় না। একে কেবল লালন করা যায়। তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব অক্ষয়, অমর, ত্রিভুবনে অনুপামচারী এক মহাবীর।
পৃথিবীজুড়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে জোসেফ স্টালিন, ডক্টর ফিদেল ক্যাস্ট্রো, হো চি মিনের নাম ভুবন কাঁপানো। কিন্তু নিষ্পেষিত বাঙালী জাতির মুক্তি সংগ্রামের নায়ক মুজিব ছিলেন একেবারে ভিন্ন মাত্রার এক বিশ্বনেতা। বঙ্গবন্ধু ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জের বর্ধিষ্ণু গ্রাম টুঙ্গিপাড়ার ছেলে, বেড়ে উঠেছিলেন প্রকৃতির লীলা নিকেতন, গ্রামীণ সৌন্দর্যে সুসমাম-িত পরিবেশে। চিরচেনা বাংলা, গ্রীষ্ম থেকে বসন্ত প্রতিটি ঋতুর নিরন্তর চক্রাকাররূপে আবর্তিত হওয়াকে মুজিব দেখেছেন দুচোখ জুড়িয়ে। সুশীতল টুঙ্গিপাড়ার গ-ি পেরিয়ে তিনি বাঙালী জাতীয়তাবোধ তথা স্বাধীন বাংলাদেশকে বুকে ধারণ করতে পেরেছিলেন অবলীলায়। কিন্তু তার পথ কি সহজ ছিল? ইতিহাস আমাদের বার্তা দেয়, না।
বঙ্গবন্ধু কোন ব্যক্তি, পরিবার বা রাজনৈতিক দলের সম্পদ নয় । তিনি বাংলার অহঙ্কার, বাংলার মূল্যবান সম্পদ। দেশের মানুষের কাছে এমনটি বলেই তিনি বিশ্বের একজন সমাদৃত নেতা। শোষণকারীদের অত্যাচার থেকে নিষ্পেষিত বাঙালী জাতিকে অধিকার সচেতন করে মুক্তির পথ দেখিয়েছেন তিনি। সমগ্র জাতিকে স্বাধীনতার লক্ষ্যে সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়ে একটি স্বাধীন দেশ ও একটি সংবিধান উপহার দিতে বঙ্গবন্ধু আজন্ম আত্মত্যাগে বলীয়ান । তাই তিনি বাঙালীর জাতির জনক।
নতুনদের জানার আকাক্সক্ষাÑএত বড় মাপের এই মানুষটি কেমন ছিলেন ব্যক্তি জীবনে, কেমন ছিলেন দেখতে? আমাদেরকে তাঁর কাছের মানুষরা কি বলেন তাঁদের মুজিব ভাবনায়। মহৎপ্রাণের বঙ্গবন্ধু কখনই শঠতা, প্রবঞ্চনা, ভণিতা জানতেন না। নিজে যেমন মনের ছিলেন তেমন্্্্্্্্্্্্্ই ভাবতেন দুনিয়ার সব কিছু। দেশের মানুষের ওপর এত বিশ্বাস ছিল যে, সতর্কতার বার্তা বঙ্গবন্ধু বাতাসের সঙ্গে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
অবশেষে...
বৃষ্টিভেজা পাতা। শ্রাবণের শেষদিন, ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫। ফজরের আযান তখনও শেষ হয়নি। ধানম-ির ৩২নং সড়কের জাতির জনকের ৩২নং বাড়ি ঘিরে সামরিক জীপ, ট্যাঙ্ক । বুটের শব্দ আর বন্দুকের অনেক অনেক গুলি .... ধোঁয়া,বারুদের গন্ধ। সাদা সফেদ পাজ্ঞাবি রক্তে ভেজা। সিঁড়িতে পড়ে থাকা মহান নেতার নিথর দেহ। ঝরে পড়ল ১৭টি নিরপরাধ প্রাণ। ক্্েউ নেই, শুধু সাক্ষি হয়ে রইল বাংলার ভোররাতের সাদা-কালো আকাশ, ভেজা ভারি বাতাস আর পরম মমতায় লাগানো ৩২নং বাড়ির সবুজ বৃক্ষরাজি। আওয়াজে জেগে উঠল রাজধানীর মানুষ,পশু-পক্ষী। সকালে রেডিওতে ডালিমের উত্তেজিত কণ্ঠ স্তব্ধ করে দিল গোটা জাতির বিবেক। মানুষ দিশাহারা। পৃথিবীর নিকৃষ্টতম, ঘৃণিত বঙ্গবন্ধুর খুনীরা ভাবল, ব্যস এবার ইতিহাস খতম। এ বাংলায় কখনও আর উচ্চারিত হবে না মুজিবের নাম!!
’৭৫ পরবর্তী মহান মুক্তিযুদ্ধের আলোকিত ইতিহাস বিশাল আয়োজন নিয়েই বিকৃত করা শুরু হলো। বাঙালীর ভাষাভিত্তিক জাতীয় চেতনার সংগ্রাম থেকে ’৭১ স্বাধীনতা সংগ্রাম যে গৌরবোজ্জ্বল ধারাবাহিকতা তা একেবারেই উপেক্ষিত হতে থাকল । বঙ্গবন্ধুর বর্ণাঢ্যময় ইতিহাসকে যত কুৎসিতভাবে বিদ্রƒপ, খাটো করা যায় তার সব ব্যবস্থাই করা হলো কিছু অধম বিদ্যানের হাত ধরে । রাজনীতির নামে অ-রাজনীতির ফায়দা হাসিলের তাগিদে বিশ্বের মহান নেতা বঙ্গবন্ধুকে তারা নানা অপবাদে কলঙ্কিত করতে লাগল। ষড়যন্ত্রকারীরা ভেবেছিল খুনীদের গুলিতে নিহত বঙ্গবন্ধুর নিথর দেহের সঙ্গে তাঁর বিশাল কীর্তিমান ইতিহাস ও বিরল আদর্শকেও তারা কফিনবন্দী করতে পারবে! জিয়া সরকার খুনীদের পুরস্কৃত করল। অবাক হলো পৃথিবী!
সাময়িকভাবে যদিও ’৭৫ পরবর্তী প্রজন্ম বাঙালীর জাতিসত্তা মূল যে চেতনা, তা থেকে কিছু বিপথগামীর প্ররোচনায় প্রভাবিত হয়েছিল। তারা মনে করেছিল জীবনে অর্থ ও অস্ত্রই সব । কিন্তু না। সত্য ও সুন্দরের শক্তি যে অনেক বেশি। আজ সত্য ইতিহাস বের হয়ে আসার সময় এসেছে। ৩৭ বছর, বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে সময় পার হলেও ইতিহাস তাঁকে আবারও প্রাসঙ্গিক করে তুলছে। তুলবে অনাগত ভবিষতে। কারণ বঙ্গবন্ধু নতুনদের প্রতিদিনকার শক্তি, সাহস, চেতনার উৎস । আমরা তাঁকে গভীরভাবে জানার চেষ্টা করব, প্রকৃত ইতিহাস জেনে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে সমুন্নত রাখতে আন্তরিক হব।ত্যাগ ও মহত্ত্ব কখনও খাটো হতে পারে না । ইতিহাস বিন্দু পরিমাণ প্রবঞ্চনা বহন করে না। ইতিহাস সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক স্থানে বসায়, উদাহরণ, বঙ্গবন্ধু।

লেখক: আইনজীবী ও সমাজকর্মী
কপযড়ফিযঁৎু৭১@মসধরষ.পড়স

No comments

Powered by Blogger.