সর্বনাশের আশায় by সুভাষ সাহা

সুমাত্রায় বুধবার প্রচণ্ড ভূমিকম্পের পর ঢাকায় এ ধরনের বা কাছাকাছি মাত্রার ভূমিকম্পে আমাদের কী অবস্থা, কী হবে সেটা কল্পনা করতেই ভয়-আতঙ্ক ঘিরে ধরছে। অনেকেরই মনে থাকার কথা, সাত বছর আগে ২০০৪ সালে সুমাত্রায় ভারত মহাসাগরের নিচে রিখটার স্কেলে ৯ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্পে সৃষ্ট সুনামিতে ১৪ দেশের দুই লাখেরও বেশি


মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এবার একই জায়গায় প্রায় ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। তবে আগের মতো এবার একটি প্লেট অন্যটির ওপর আড়াআড়িভাবে উঠে যায়নি, বরং একে অপরের ওপর পিছলে গেছে। ফলে প্লেট দুটির মাঝখানে কোনো শূন্যতা সৃষ্টি হয়নি, যে কারণে টেকটনিক প্লেটের সংঘর্ষে হিরোশিমায় ফেলা আণবিক বোমার দুই কোটি গুণ বেশি শক্তি নির্গত হলেও সেটা মাটির আস্তর ভেদ করে ওপরে আসার পথ পায়নি এবং পানিকেও ওপরের দিকে ঠেলে নিয়ে সুনামির মতো সর্বনাশা বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারেনি।
এ তো গেল সুমাত্রায় ভারত মহাসাগরের নিচে প্রচণ্ড ভূমিকম্পের কথা। আমাদের প্রিয় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা যে ইতিমধ্যে ফল্ট লাইনের মধ্যে ঢুকে পড়েছে তার কী হবে! আমাদের এই অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার পর প্রায় ১১২ বছর কেটে গেছে। একই স্থানে বড় ধরনের ভূমিকম্প একশ' থেকে দেড়শ' বছরের ব্যবধানে হওয়ার কথা। এখন তো প্রায়ই মাঝারি ধরনের ভূমিকম্পে দেশের কোনো না কোনো এলাকা কেঁপে উঠছে। এভাবে ঘনঘন মাঝারি ভূমিকম্প বড় ধরনের ভূমিকম্পের পূর্ব লক্ষণ বলে মনে করা হয়। অর্থাৎ যে কোনো সময়, এমনকি এ বছরেই যদি প্রচণ্ড ভূমিকম্প আঘাত হানে তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে সিডিএমপির ২০০৮-০৯ সালের মধ্যে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার মধ্যেই যদি শক্তিশালী ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল হয় এবং সেটি যদি ৬ রিখটার স্কেলের হয়, তাহলে রাজধানীর ৭৮ হাজার ৩২৩টি ভবন সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। আর যদি মধুপুরের ফল্টে ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল হয় এবং এর মাত্রা যদি ৭ দশমিক ৫ হয়, তাহলে এতে ৭২ হাজার ৩১৬টি ভবন সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে এবং ৫১ হাজার ১৬৬টি ভবন আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে তাৎক্ষণিকভাবে মারা যাবে এক লাখ ৩১ হাজারেরও বেশি মানুষ। তবে ঢাকা শহরের ভবনগুলোর যা অবস্থা তাতে স্বল্পমাত্রার ভূমিকম্প এক মিনিট স্থায়ী হলেও লঙ্কাকাণ্ড ঘটে যেতে পারে।
সমুদ্রের নিচে প্রচণ্ড ভূমিকম্প সৃষ্ট সুনামির বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিশ্ব যথেষ্ট সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু ঢাকা বা দেশের অন্য কোনো অঞ্চলে প্রচণ্ড ভূমিকম্প আঘাত হানলে এবং আমাদের সেবাগুলোর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে সে ধকল কাটিয়ে ওঠার মতো বিকল্প ব্যবস্থা কি আমরা এখনও পর্যন্ত করে উঠতে পেরেছি? যেসব ভবন ছয় থেকে সাড়ে সাত রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পে ধসে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে সেগুলোর ব্যাপারে আমরা কি এখনও কোনো ব্যবস্থা নিতে পেরেছি? ভারতের গুজরাট রাজ্যের ভুজ শহরে ভূমিকম্পে সুন্দর সুন্দর ভবনগুলো কীভাবে বিধ্বস্ত হয়েছিল সে সময় সেসব চিত্র যারা টিভিতে দেখেছেন তারা এর ভয়াবহতা সম্যক আঁচ করতে পারবেন। তখন বিল্ডার্সদের তৈরি বহুতল ভবনগুলোই বেশি সংখ্যায় ধসে পড়েছিল। আমাদের এখানে যে এর অন্যথা হবে তার নিশ্চয়তা কী? আমরা কি আমাদের সকলকে নিয়ে সর্বনাশের আশায় বসে থাকব!

No comments

Powered by Blogger.