মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার-সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলার আলামত ৭ মার্চের ভাষণ

একাত্তরের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণকে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আলামত হিসেবে দেখানো হয়েছে। এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. হেলালউদ্দিন গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দিকালে ওই ভাষণের রেকর্ডিং দেখান।


বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের ২৮তম সাক্ষী হেলালউদ্দিন গতকাল টানা পঞ্চম দিনের মতো জবানবন্দি দেন। এ সময় আসামির কাঠগড়ায় সাঈদী উপস্থিত ছিলেন।
জবানবন্দিতে হেলালউদ্দিন জানান, সাঈদীর বিরুদ্ধে পিরোজপুর সদর ও জিয়ানগর থানা, ঢাকা মহানগরের রমনা, উত্তরা ও শেরেবাংলা নগর থানা, রাঙামাটি, খুলনা, রাজশাহী, লালমনিরহাট প্রভৃতি জায়গায় ২০০৪ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে হত্যা, প্রতারণা, চুরি, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, কর ফাঁকি প্রভৃতি অভিযোগে ১৭টি মামলা হয়েছে। তিনি এসব মামলার নথি ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেন। এ সময় ট্রাইব্যুনাল জানতে চান, মামলাগুলো সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না? জবাবে হেলালউদ্দিন বলেন, এ মামলার অভিযোগের সঙ্গে এসব মামলার কোনো সম্পর্ক নেই। দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় এসব মামলা হয়েছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী নিরীহ, নিরস্ত্র ও শান্তিপ্রিয় মানুষকে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ প্রভৃতি মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছিল। তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্যে ও সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এটা প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়। পিরোজপুরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ এ থেকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এরপর তিনি ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তানের জন্ম থেকে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত একটি সংক্ষিপ্ত ঐতিহাসিক পটভূমি তুলে ধরেন। একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের বিষয়টি উপস্থাপনকালে ভাষণের অডিও-ভিজ্যুয়াল রেকর্ডিং মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরে দেখানো হয়। পরে এই ভাষণসংবলিত সিডি (কমপ্যাক্ট ডিস্ক) ‘বস্তু প্রদর্শনী-২’ উল্লেখ করে মামলার আলামত হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়।
এর আগে এ মামলার বস্তু প্রদর্শনী হিসেবে পিরোজপুরের আলমগীর পসারি ও মানিক পসারির বাড়ি থেকে সংগৃহীত মুক্তিযুদ্ধকালে অগ্নিসংযোগে পোড়াঘরের ঢেউটিন, একটি খুঁটি ও একটি চৌকাঠ ট্রাইব্যুনালকে দেখানো হয়।
সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা একটা পর্যন্ত হেলালউদ্দিন জবানবন্দি দেন। রাষ্ট্রপক্ষ তাঁকে বিশ্রাম দেওয়ার আরজি জানালে ট্রাইব্যুনাল একমত হয়ে এই মামলার কার্যক্রম ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত মুলতবি করেন।
সাকা চৌধুরীর পাঁচ আবেদন খারিজ: বিএনপির নেতা সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর আইনজীবী ফখরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে করা পাঁচটি আবেদন গতকাল শুনানির পর ট্রাইব্যুনাল-১ খারিজ করেন। একটি আবেদন মঞ্জুর করেন। বাকি তিনটি আবেদন শুনানির জন্য রোববার দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
এ নয়টি আবেদনের মধ্যে দুটি ছিল ট্রাইব্যুনাল-১-এর কার্যপ্রণালি বিধিমালা নিরপেক্ষ বিচারের জন্য অপর্যাপ্ত নয় মর্মে সংশোধনের আবেদন। শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল আদেশে বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের অধীনে যেকোনো কার্যক্রম বলতে শুধু ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম নয়, বরং তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনকেও (রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি দল) বোঝানো হয়েছে। এ জন্য ২৩ ধারা এই আইনের আওতাধীন সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু আইনের ৯(১) ধারায় শুধু ট্রাইব্যুনালে মামলার কার্যক্রম শুরু হওয়া বোঝায়। এই ব্যাখ্যাসহ আদেশে আবেদন দুটি খারিজ করা হয়।
এ ছাড়া সাকা চৌধুরীকে সেফ হোমে জিজ্ঞাসাবাদে তদন্ত সংস্থার পাওয়া তথ্য সরবরাহ, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ থেকে অব্যাহতির আবেদনের শুনানিতে দুই পক্ষের উপস্থাপিত যুক্তির নকল সরবরাহ প্রভৃতি বিষয়ে করা আবেদনগুলো ট্রাইব্যুনাল খারিজ করেন। তবে আসামিপক্ষকে সরবরাহ করা নথির মধ্যে অস্পষ্ট পৃষ্ঠাগুলোর স্পষ্ট অনুলিপি সরবরাহের আবেদন ট্রাইব্যুনাল মঞ্জুর করেন।
মুক্তিযুদ্ধকালে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হন। দুই লাখ নারী সম্ভ্রম হারান। এ সময়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে।

No comments

Powered by Blogger.