শান্তিময় সমাজ গঠনে ইসলামের বিধান by মুফতি এনায়েতুল্লাহ

নৈতিক স্খলনজনিত কারণে রাজধানীর নামকরা এক স্কুলশিক্ষককে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ বেশ গুরুতর। তার বিরুদ্ধে এক ছাত্রীকে পাশবিক নির্যাতনসহ তার বিবস্ত্র ছবি তোলার অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত এই শিক্ষকসহ অন্য আরেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের সঙ্গে অসদাচরণ,


কটূক্তি, অশল্গীল বাক্য উচ্চারণসহ বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে তদন্তও চলছে। এ ধরনের অনৈতিক নানা বিষয়ের খবর অহরহই পত্রিকার আসছে। সমাজ উন্নয়নকর্মী থেকে শুরু করে বিবেকবান মানুষ এসবের তীব্র নিন্দা করে এর প্রতিকার খুঁেজ চলছেন। আমরাও কামনা করি অতি দ্রুত সমাজ থেকে এ ধরনের অনৈতিক বিষয় দূর হোক।
সমাজের এসব অনৈতিক কার্যকলাপ ও অবক্ষয় রোধে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নৈতিকতাবোধের উজ্জীবন। এ ক্ষেত্রে সর্বদা আমাদের কোরআনুল কারিম ও প্রিয় নবী (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করতে হবে। কোরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে_ 'শপথ মানুষের এবং তাঁর যিনি একে সুঠাম করেছেন। সে-ই সফলকাম হবে যে নিজেকে পবিত্র করবে এবং সে-ই ব্যর্থ হবে যে নিজেকে কলুষাচ্ছন্ন করবে।' সূরা শামস : ৭-১০।
বাংলাদেশের নব্বই ভাগ মানুষ মুসলমান। ধর্মে বিশ্বাসী প্রত্যেক মুসলমানের কাছে নারী নিজ নিজ জায়গায় সম্মানিত ও মর্যাদাসম্পন্ন। এরপরও নারী নির্যাতনের হার দিন দিন বেড়েই চলছে। এর কারণ কোরআনের আদেশ ও প্রিয় নবী (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণে আন্তরিক না হওয়া; যার জন্য আজ নারী লাঞ্ছিত ও বিপর্যস্ত। মানুষের বোধহীনতা সীমা ছাড়িয়ে গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষকে দেখা যায় পশুরও অধম। সমাজের অধিকাংশ মানুষ অসৎকার্য দ্বারা নিজেদের কলুষাচ্ছন্ন করছে এবং সমাজে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। কিন্তু মানুষ একবারও ভাবছে না_ 'অশান্তি সৃষ্টি করা হত্যার চেয়েও জঘন্য অপরাধ।' সূরা বাকারা : ১৯১।
পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে অশান্তি, বিশৃঙ্খলা ও নাফরমানি করার জন্য নয়, মানুষকে আল্লাহতায়ালা সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদতের জন্য। ইবাদত অর্থ আল্লাহর দাসত্ব স্বীকারপূর্বক তাঁর অনুগত হয়ে তাঁর সব আদেশ-নিষেধ মেনে চলা, তাঁর হুকুম-আহকাম পালন করা। সোজা কথায় কোরআনের বিধিবিধান অনুযায়ী চলা। আর ভালো-মন্দ, সত্য-অসত্যকে জানা ও চেনার জন্যই আল্লাহতায়ালা নাজিল করেছেন কোরআনুল কারিম। ইরশাদ হচ্ছে_ 'মানুষের দিশারি, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে।' সূরা বাকারা : ১৮৫।
মানুষ কীভাবে জীবনযাপন করবে, কীভাবে চলবে, কীভাবে কথা বলবে, কিসে পাপ, কিসে পুণ্য, কী তার দায়দায়িত্ব, কোনটি ন্যায়, কোনটি অন্যায়, সব বিষয়ে দিকনির্দেশনা রয়েছে কোরআনুল কারিমে।
কোরআনিক দর্শনের নৈতিক শিক্ষা শুধু দার্শনিক তত্ত্ব নয়। এ নৈতিক দর্শনকে সারা দুনিয়ার মানুষের কাছে নিদর্শন হিসেবে উপস্থাপনের জন্য আল্লাহতায়ালা তাঁর প্রিয় হাবিব হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের মাধ্যমে তা প্রতিফলিত করে প্রকাশ করে দিয়েছেন। ইনসাফ, ন্যায়বিচার, সততা ও কর্তব্যবোধ, বিশ্বস্ততা ও ওয়াদা পালন, শালীনতা, শিষ্টাচার, আল্লাহর রাস্তায় ব্যয়, সঠিক দায়িত্ব গ্রহণ ও পালন, ন্যায়পরায়ণতা, উদারতা, সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা, ক্ষমা প্রদর্শন ও প্রয়োজনে প্রতিশোধ গ্রহণ, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, আমলে সালেহ, মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী ইত্যাদি তাঁর চরিত্রের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন। এককথায় একজন আদর্শ মানুষের প্রতিচ্ছবি হলেন হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)। আর এ জন্যই তাঁর চরিত্রকে পুরোপুরি অনুসরণের জন্য কোরআনে নির্দেশ রয়েছে। 'তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখিরাতের ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য, রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।' সূরা আহজাব : ২১।
ইসলামী অনুশাসন মানুষ ও সমাজকে অসভ্যতার বল্গাহীনতার দিকে ঠেলে দিয়ে ধ্বংস করে না, বরং মানুষকে করে পরিপূর্ণ এবং সমাজকে করে সুশৃঙ্খল ও সভ্য। প্রতিটি মানুষেরই 'কর্ণ, চক্ষু, হৃদয় এদের প্রত্যেকের সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।' সূরা বনি ইসরাইল : ৩৬।
চুলচেরা হিসাব নেওয়া হবে প্রতিটি মানুষের কৃতকর্মের। ভালো কাজের জন্য পুরস্কার আর মন্দ কাজের জন্য রয়েছে শাস্তি। এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হচ্ছে_ '(হে নবী) ভালো ও মন্দ কখনও সমান হতে পারে না। মন্দকে ভালো পন্থায় প্রতিরোধ করো, তখন দেখবে, তোমার সঙ্গে যার শত্রুতা, সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধুতে পরিণত হয়েছে।' সূরা হা-মিম আস সাজদা : ৩৪।
আমাদের চলার ক্ষেত্রে যখন আমরা এ বিষয়গুলো সামনে রাখব_ তখন আমাদের জীবনে নৈতিকতাবোধের উজ্জীবন ঘটতে বাধ্য। আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে_ ত্যাগহীন ইবাদতে, বিবেকবর্জিত কর্মে, নীতি-নৈতিকতাহীন রাজনীতিতে, চরিত্রহীন বিদ্যায়, অসৎ ব্যবসায়, চালচলনের নগ্নতায়, ন্যায়-নীতিহীন জীবনযাপনে কোনো শান্তি ও কল্যাণ নিহিত নেই, এতেই বরং নৈতিক স্খলন ঘটে; যার চিত্র হামেশা আমাদের সামনে ফুটে উঠছে। তাই সমাজের সর্বস্তরে নীতি ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমাদের সবাইকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়_ এই ভূমিকাটা সমাজ উন্নয়নের জন্য অনেক বেশি প্রয়োজন।
muftianaet@gmail.com
 

No comments

Powered by Blogger.