কালের যাত্রা by পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়

আর মাত্র কটি দিনের প্রতীক্ষা। তিন রাত পার হলেই ফুটে উঠবে নববর্ষের প্রথম ঊষার আলো। সেদিন প্রভাতে আশ্চর্য সুন্দর রবির কর পশিবে প্রাণের পর। বাধাহীন অনাবিল আনন্দে জাগিয়া উঠিবে প্রাণ। নতুন সাজে উৎসব কোলাহলে ভোর হতে না হতেই বাঙালি ঘরের বার হবে।


রমনার বটমূলে ছায়ানটের শিল্পীদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে সবাই গাইবে 'এসো হে বৈশাখ'। টেলিভিশনে ছায়ানটের অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচারিত হবে। দেখবে কোটি কোটি মানুষ, দেশে এবং দেশের বাইরে।
কিন্তু না, এবার বোধ হয় দেশের বাইরের বাঙালিরা ছায়ানটের অনুষ্ঠান সরাসরি দেখতে পারবেন না। কারণ এবার অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার করবে শুধু বিটিভি। যদি বিটিভি ওয়ার্ল্ড এর সঙ্গে যুক্ত হয় তবে হয়তো প্রবাসে কিছু বাঙালি অনুষ্ঠানটি দেখলেও দেখতে পাবেন। হয়তো কিছু বাঙালি বলছি এ জন্য যে বিটিভি ওয়ার্ল্ড পৃথিবীর সবখানে দেখা যায় না। তবে কর্তৃপক্ষের দাবি, পূর্বে অস্ট্রেলিয়া থেকে পশ্চিমে সাইপ্রাস পর্যন্ত বিটিভি ওয়ার্ল্ডের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত এবং সেখান থেকে অনুষ্ঠান সম্পর্কে ফিডব্যাকও পাওয়া যায়। মস্কো থেকেও ফিডব্যাক আসে। কে জানে, হবে হয়তো! আমি অস্ট্রেলিয়া এবং সাইপ্রাসে কখনো যাইনি। আর যখন মস্কো গিয়েছিলাম তখন ঢাকা থেকে সেখানে চিঠি পেঁৗছাতেই লাগত তিন সপ্তাহ। তবে চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপের কোনো বড় শহরেই বিটিভি ওয়ার্ল্ড আমার চোখে পড়েনি। মধ্যপ্রাচ্যের ব্যাপারেও আমার অভিজ্ঞতা প্রায় একই রকম।
তবে বাংলাদেশের বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো যে ছয় মহাদেশে বিশাল সাম্রাজ্য বিস্তার করে রেখেছে, সে ব্যাপারে কারো কোনো সন্দেহ নেই বরং কেউ তা অস্বীকার করে বলেও শোনা যায় না। বিশ্বজুড়ে প্রবাসী বাঙালিদের তো এক সুতোয় বেঁধেছে বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোই। বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং এ অর্জন অত্যন্ত মূল্যবান। নিজ অভিজ্ঞতা থেকেই বলি, আমি সরকারি-বেসরকারি সব চ্যানেলেই অনেক ধরনের অনুষ্ঠান করি। কিন্তু সরকারি চ্যানেলের কোনো অনুষ্ঠানের জন্য আজ পর্যন্ত কখনো ফিডব্যাক পাইনি। অথচ বেসরকারি চ্যানেলের অনুষ্ঠানের পরপরই বিভিন্ন দেশ থেকে পাই বন্ধু-শুভাকাঙ্ক্ষীদের অসংখ্য ফোন কল। নিজ অভিজ্ঞতা থেকে আরো বলি, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার অনেক শহরেই দেখেছি বাঙালি মালিকদের রেস্তোরাঁর ভেতরে ও বাইরে বড় স্ক্রিনে দিনভর চলছে বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান। সেখানে দর্শকের ভিড় লেগেই আছে। বিশেষ করে প্রতিদিনের সংবাদ প্রচারের সময়গুলোতে। দেশের রোজকার খবর এভাবে তো আগে কখনো পাওয়া যেত না। পুরনো প্রবাসীদের কাছে আমার পরিচয় বিটিভির পুরনো অনুষ্ঠানের কারণে। কিন্তু বর্তমানে বেসরকারি চ্যানেল না চেনালে প্রবাসে কেই-বা চিনত। প্রবাসে বসবাসকারী নতুন প্রজন্ম আমাদের চেনে বেসরকারি টিভি চ্যানেলের কারণে, বিটিভি বা বিটিভি ওয়ার্ল্ডের জন্য নয়।
ফিরে আসি ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে। বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন এবং ছায়ানট এখন সব বাঙালির কাছে সমার্থক। প্রতিবছর নববর্ষের প্রথম প্রভাতে অনুষ্ঠানটি দেখার জন্য উপচে পড়ে মানুষ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল এবং প্রবাস থেকেও আসে অনেক বাঙালি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও আস্থা প্রদর্শনের বিষয়টিও এর সঙ্গে জড়িত। আটের দশকে দেখেছি, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার অঙ্গীকারেও এসেছে মুক্তিপাগল অসাম্প্রদায়িক দর্শনের অজস্র জন। আর যেবার মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধীদের ছত্রছায়ায় জঙ্গিরা আবহমান বাংলার ঐতিহ্যিক সংস্কৃতি ধ্বংস করতে ছায়ানটের পবিত্র বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বর্বরোচিত বোমাবাজি করে নিরীহ মানুষদের হত্যা করল, সেবার পাষণ্ডদের রুখে দিতে বাঙালির রুখে দাঁড়ানোর ভঙ্গি তো ভবিষ্যতে দৃষ্টান্ত হয়েই রইবে। ঠিক তার পরের বছর সব ভয়কে জয় করে বাঙালির যে দল নেমেছিল নববর্ষের নবপ্রভাতে, সেটাও সাহসী জাতির অনুপ্রেরণার ক্ষেত্রে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কোটি চিত্তে সেদিন ধ্বনিত হয়েছিল একটাই সুর_'রুখবে মোদের কে?'
২০০১ সালে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে বোমা হামলার ঘটনা সারা দেশে মুহূর্তের ভেতর প্রচার করেছিল বিটিভি। কেননা বিটিভি অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করছিল। বিটিভি এর আগেও নববর্ষে ছায়ানটের অনুষ্ঠান সরাসরি প্রচার করেছে। যতদূর মনে পড়ে, বিটিভির কর্মকর্তা ম. হামিদের উদ্যোগে ছায়ানটের অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার শুরু হয়েছিল। কিন্তু ২০০২ সাল থেকে চ্যানেল আই যখন ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান রমনার বটমূল থেকে সরাসরি সম্প্রচার শুরু করে, বলতে গেলে তখন থেকেই বিদেশের দর্শকরা অনুষ্ঠানটি প্রতিবছর সরাসরি দেখতে থাকেন এবং প্রতিবছর এভাবেই চ্যানেল আই তার অগণিত প্রবাসী দর্শকের তৃষ্ণা মিটিয়ে চলেছে। পত্রিকা পড়ে জেনেছি, আসন্ন বর্ষবরণ অনুষ্ঠানটি চ্যানেল আই আর দেখাতে পারবে না। অনুষ্ঠানটি শুধু দেখাবে বিটিভি এবং বিটিভি ওয়ার্ল্ড। কারা এই সিদ্ধান্ত নিলেন, কেন নিলেন, উদ্দেশ্যটা কী ইত্যাদি ব্যাপার জানার চেষ্টা করিনি। চাইলে জানতে পারবই। এ সিদ্ধান্তের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লিখেছেন কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। পত্রিকায় সেসব লেখা পড়েছিও। কানাডার অটোয়া থেকে লুৎফর রহমান রিটন লিখেছেন, চ্যানেল আইকে এ বছর সরাসরি সম্প্রচারের সুযোগ না দেওয়া বাঙালির গৌরব আর অহংকারের তাৎপর্যপূর্ণ আয়োজনটি উপভোগ করা থেকে প্রায় এক কোটি প্রবাসী বাঙালিকে বঞ্চিত করা হবে। কথাটি অপ্রাসঙ্গিক বা মিথ্যা নয়। প্রবাসে বসবাসরত নতুন প্রজন্মের হাতে গৌরব এবং অহংকার করার মতো কিছুই তো আমরা যথার্থভাবে তুলে দিতে পারিনি। এ ব্যাপারে তাদের মনঃকষ্টও আছে। মিলেমিশে থাকা অন্যান্য জাতির পাশে তারা আমাদের অনেক অহংকারী অর্জনের ইতিহাস উঁচু মাথায় তুলে ধরতে পারে না। আমাদের চিরনমস্য মনীষীদের ব্যাপারে তারা যথার্থই অজ্ঞ। আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যিক সংস্কৃতি তাদের অজানা। মুক্তিযুদ্ধ এবং আমাদের জাতীয় ইতিহাসের বীরগাথা সম্পর্কে তারা কমই জানে। রাষ্ট্র, সরকার, রাজনীতি_প্রায় সব ক্ষেত্রেই আমরা আমাদের গৌরবের অমূল্য অধ্যায়গুলো প্রবাসীদের মধ্যে ইতিবাচকভাবে প্রচার এবং তা প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি। এটা সত্য।
প্রত্যাশা করি, এ লেখাটি প্রকাশ হওয়ার আগেই উদ্ভূত সমস্যাটি মিটে যাবে। উদ্যোগ নিতে হবে ছায়ানটকে। ছায়ানট যদি তার অনুষ্ঠান চ্যানেল আইসহ অন্য চ্যানেলগুলোকে সম্প্রচারের সুযোগ দেয় তাতে কার কী বলার আছে! ছায়ানট ছাড়াও ঢাকা, চট্টগ্রাম, বগুড়া, রাজশাহী, খুলনা, বরিশালসহ সারা দেশেই বর্ষবরণ হয় বর্ণাঢ্য আয়োজনে। সেসব অনুষ্ঠানও সরাসরি সম্প্রচারিত হোক। দেখুক প্রবাসের অগণিত বাঙালি দর্শক। তাতে লাভ তো আমাদেরই। জয় বাংলা।
লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

No comments

Powered by Blogger.