চারদিক-খেয়ালি বাউল পাগলা কানাই

কী মজার ঘর বেঁধেছে,
হায়রে ঘর বাইন্ধাছে,
দুই খুঁটির উপর।


মরমি কবি ও সুরসাধক পাগলা কানাইয়ের এই গান শুনেছেন অনেকেই। বাংলার লোককবিদের মধ্যে পাগলা কানাই একজন অন্যতম সাধক। জারিগান গায়কির তিনটি ঢং আছে। ছোট ছোট আকারে বিশেষ সুরে যে গান গাওয়া হয় তাকে বলে মর্সিয়া, আর বয়াতি আলাদা সুরে বিস্তৃতভাবে যে গান পরিবেশন করেন তাকে বলে জারিগান। এ ছাড়া ধুয়ার সুরে যখন ঘটনা প্রকাশ করা হয় তখন তাকে বলে ধুয়া গান। সেই সময়কার ধুয়োজারি গানের রাজ্যে রাজত্ব করেছেন পাগলা কানাই। তাঁর লেখা ও সুর করা গানগুলো পল্লির সাধারণ মানুষের হূদয়কে নাড়া দিয়েছে প্রবলভাবে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন খেয়ালি, খাপছাড়া প্রকৃতির। কথায় কথায় ছড়া কাটতেন, যা ভালো বুঝতেন তা-ই করতেন। কারও কথায় কান দিতেন না। একটা পাগলামির ভাব ছিল তাঁর মধ্যে। ছোটবেলা থেকে তাই লোকে তাঁর নামের সঙ্গে ‘পাগলা’ শব্দটি জুড়ে দিয়েছিল।
পাগলা কানাই নিরক্ষর হলেও তাঁর গীতি রচনার স্বভাবজাত প্রতিভা ছিল। তিনি উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে একের পর এক গান রচনা করতে পারতেন। পালাগান বেঁধে সুর করে তা মনে রাখতে অসুবিধা হতো না তাঁর। বহু পালাগান এভাবে মনের মধ্যে গেঁথে রেখেই শ্রোতাদের শোনাতেন। কবির গানে মুগ্ধ হয়ে মানুষ আহার-নিদ্রা বাদ দিয়ে বসে বসে গান শুনতেন। তাঁর গানের কথা, সুমধুর কণ্ঠ, অপূর্ব গায়কি ঢং শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত। পাগলা কানাই সম্পর্কে কাঙাল হরিনাথ (১ম খণ্ড) গ্রন্থে জলধর বাবু পাগলা কানাই সম্বন্ধে বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘কানাই-এর গান শুনলে লোকে পাগল হইয়া যায়।’
মরমি সাধক ও সংগীত-রচয়িতা পাগলা কানাই ১৮০৯ সালে ঝিনাইদহের লেবুতলা গ্রামের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু তাঁর জীবন কেটেছে বেড়বাড়ি বোনের বাড়িতে। কানাইয়ের প্রকৃত নাম কানাই শেখ, বাবার নাম কুড়ন শেখ, মায়ের নাম মোমেনা বিবি। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে কানাই সবার বড়। ভাইয়ের নাম উজ্জ্বল শেখ, বোন স্বরনারী। পাঠশালায় পড়াকালে তাঁর বাবা কুড়ন শেখ মারা যান। পিতৃহারা হয়ে কানাই ভবঘুরে হয়ে যান। জীবনের তাগিদে মোমেনা বিবি কোনো উপায়ান্তর না দেখে কালীগঞ্জ উপজেলার চেউনে ভাটপাড়া গ্রামে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখানে কিছুদিনের মধ্যে তিনিও মারা যান। মা হারিয়ে কানাই হরিণাকুণ্ডু উপজেলার বলরামপুরে ভরস মণ্ডলের বাড়িতে রাখালির কাজ নেন। বোন স্বরনারী দুই ভাইকে সেখান থেকে নিজের আশ্রয়ে শ্বশুরবাড়ি বেড়বাড়িতে নিয়ে আসেন। বোনের শ্বশুরবাড়ির অবস্থা ভালো হওয়াতে কানাইয়ের গান চর্চার রাস্তা আরও সহজ হয়। কানাই বোনের বাড়ির গরুর পাল চরাতেন আর গান বাঁধতেন, তাতে সুর দিতেন। সুর দেওয়া হয়ে গেলে আপন মনে গলা ছেড়ে তা গাইতেন। অস্থির পাগল এই স্বভাবকবির কোনো এক জায়গায় বেশি দিন ভালো লাগত না। গরু চরানো রেখে কাজ নেন মাগুরা জেলার আঠারখাদার জমিদার চক্রবর্তী পরিবারের বেড়বাড়ির নীলকুঠিতে। দুই টাকা বেতনের সেই খালাসির চাকরি বেশি দিন করা হয়ে ওঠেনি। গানের প্রতি টানে চাকরি ছেড়ে-ছুড়ে পথে বের হন আবারও।
ধুয়োজারি গানের ধারক কানাই শেখ পালাগান-জারিগান রচনা করে, গেয়ে এলাকায় পরিচিত হয়ে ওঠেন। যখন-তখন শ্লোক বানিয়ে বলতে পারতেন। কথার পিঠে কথা লাগিয়ে তাৎক্ষণিক গান শোনাতে পারতেন। এভাবে তিনি ধীরে ধীরে শ্লোকের রচয়িতা বা বয়াতি হয়ে ওঠেন। মাঠে গরু চরানো বালকের দলের সঙ্গে গানের পাল্লা দিতে দিতে একদিন পৌঁছে গেলেন পাল্লার বড় আসরে। কানাইয়ের স্মৃতিশক্তি ছিল প্রখর। তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। বিয়েও করেছিলেন। তার পরও ঘর তাঁকে বাঁধতে পারেনি, ক্রমশ আধ্যাত্মিকতার দিকে ঝুঁকে পড়েন। কানাই ছিলেন স্বভাবকবি। মুখে মুখে গান রচনা করতেন এবং নিজেই গেয়ে তা প্রচার করতেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক গান রচনা ও পরিবেশনায় তিনি পারদর্শী ছিলেন। শিষ্যদের নিয়ে যশোর, কুষ্টিয়া, পাবনা, রাজশাহী, বগুড়া অঞ্চলে গান গেয়ে বেড়াতেন। তাঁর শিষ্যদের মধ্যে কালাচাঁদ বয়াতি, হাকিম শাহ, করিম বিশ্বাস, ইন্দু বিশ্বাস ও করমদ্দী ছিলেন প্রধান। তিনি মূলত দেহতত্ত্ব-বিষয়ক মরমি ও ভাবগান রচনা করতেন। এ ছাড়া তাঁর রচিত কিছু পালাগান ও কবিগান আছে। দেহতত্ত্ব, গুরুতত্ত্ব, যোগতত্ত্ব, সংসারের অনিত্যতা, জীবনরহস্য, নবীতত্ত্ব, কৃষ্ণবন্দনা তাঁর গানের বিষয়বস্তু।
ঝিনাইদহের বেড়বাড়িতে আছে কবি পাগলা কানাইয়ের বাড়ি। তাঁর বাড়ির নামে ওই এলাকাকেই এখন লোকে পাগলা কানাই নামে চেনে। সেখানে স্থানীয় সরকার কর্তৃক নির্মিত হয়েছে পাগলা কানাইয়ের নামে পাঠাগার, সংগীত শিক্ষাকেন্দ্র, মিলনায়তন, সমাধি ও কবির একটি আবক্ষ প্রতিমূর্তি। আজ ৯ মার্চ কবির জন্মদিনকে উপলক্ষ করে বেড়বাড়ির কবির সমাধিস্থলে শুরু হচ্ছে লোকমেলা ও বাউলগানের আসর। তাঁর শিষ্যরা সব হাজির হয়ে আজ গুরুবন্ধনা করবেন।
 ইমরান উজ-জামান

No comments

Powered by Blogger.