মহাজোট সরকারের এক বছরঃ শিল্পখাতে ধস by আবুল কাসেম হায়দার


গত জুলাই মাসে শিল্পখাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৫০ শতাংশ। এ খাতের আটটি উপখাতের মধ্যে একটি খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। অবশিষ্ট সাতটিতে প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই সার্বিকভাবে শিল্প উত্পাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বমন্দার কারণে রাসায়নিক ও পেট্রোলিয়াম খাতে প্রবৃদ্ধির হার হয়েছে নেতিবাচক। বছর শেষে এ খাতে প্রবৃদ্ধি কেমন বৃদ্ধি পায় তা দেখার বিষয় রয়েছে।

শিল্পখাতে ২০০৯ সাল অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে জাতির সামনে হাজির হয়েছে। প্রত্যাশিত গতি শিল্পখাতে আসেনি। নানা কারণে আমরা শিল্পখাতের প্রবৃদ্ধি আশানুরূপ না হওয়ার হেতুগুলো চিহ্নিত করছি। তাই শিল্প উত্পাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে প্রবৃদ্ধির হার অনেক হ্রাস পেয়েছে। প্রধানত তিনটি মূল বিষয়কে আমরা শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি হ্রাসের কারণ মনে করতে পারি। প্রথমত, বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব; দ্বিতীয়ত, নতুন সরকারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার অভাব, তৃতীয়ত, গ্যাস ও বিদ্যুত্ সঙ্কট।
বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শিল্পখাতের মূলে আঘাত হানা হয়েছে। শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের প্রতি করা হয়েছে অমানবিক নির্যাতন, মামলা ও সামাজিক অত্যাচার। যার ফলে এদেশে শিল্পবাণিজ্যে এক নেতিবাচক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। শিল্প-ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারীদের ওপর যৌথ বাহিনীর নির্যাতনের রেশ এখনও কাটেনি। যদিও একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায়। তার পরও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা এখনও পুরোপুরি ফিরে আসেনি। সরকারের পক্ষ থেকে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করার জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। হয়তো এসব উদ্যোগের ফলাফল বছর শেষে আমরা দেখতে পাব।
২০০৯ সাল আমাদের জন্য শিল্প-বান্ধব ছিল না। বিদায়ী বছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধির হার আগের বছরের তুলনায় অনেক কম। বিশ্বমন্দায় রফতানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব, নতুন শিল্প স্থাপনে উদ্যোক্তাদের অনাগ্রহ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শিল্প উদ্যোক্তাদের ওপর নির্যাতন, শোষণ, দুর্নীতি এবং গ্যাস, বিদ্যুতের সঙ্কটের কারণে বিগত বছর শিল্প খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ হয়নি বললে চলে। অন্যদিকে মহাজোট সরকারের রাজনৈতিক অসহিষ্ণু পরিবেশ শিল্প বিনিয়োগ হ্রাস হওয়ার আরও একটি কারণ। তবে যে পরিবেশ হয়েছিল, তাতে আমরা আশঙ্কা করেছিলাম শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হবে। আল্লাহর রহমতে তা হয়নি। সার্বিকভাবে শিল্প খাতের তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। প্রবৃদ্ধি কমেছে। তবে দেশের ইপিজেড, বিসিক শিল্পনগরী এবং এসএমই খাতে বিনিয়োগ কিছুটা বেড়েছে। যার ফলে শিল্প প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক অবস্থান ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে শিল্পখাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। এদিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সমপ্রতি প্রকাশিত অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে বিশ্ব মন্দাকে দায়ী করেছে। এডিবি অবশ্য বলেছে, রফতানি খাত হচ্ছে শিল্প প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি। কিন্তু বিশ্ব মন্দার কারণে রফতানি আয়ের ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির হারও বেশ কমে গেছে।
অন্যদিকে চলতি অর্থবছরে শিল্প খাতে ঋণ বিতরণ কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত অর্থবছরে এ খাতে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঋণ বিতরণ হয়েছিল পাঁচ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এ সময়ে ঋণ বিতরণ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। বছরের শুরুতে মূলধনের জোগান হ্রাস পেয়েছিল। বর্তমানে তা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে আশানুরূপ নয়। বর্তমানে এসএমই খাতে ঋণ বিতরণের হার কিছুটা বেশি। এ হার ৪২ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। গত বছর এ খাতে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঋণ ছিল চার হাজার কোটি টাকার সামান্য বেশি। গত সেপ্টেম্বরে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ছয় হাজার ৩০০ কোটি টাকার চেয়ে বেশি। বিশ্ব মন্দার কারণে রফতানির প্রধান খাতে প্রবৃদ্ধির হার বেশ হ্রাস পেয়েছিল। বিভিন্ন খাতে যথেষ্ট বাধার সৃষ্টি হয়েছিল। তাই বছরের শুরুতে প্রবৃদ্ধির হারে নিম্নগতি ছিল,
যা বছরের শেষ পর্যন্ত চলেছে। বছরের শুরুতে রফতানি আয় নেতিবাচক হলেও অক্টোবর থেকে তা বৃদ্ধি পাওয়া শুরু করেছে। মন্দার প্রভাবে চামড়া, চামড়াজাতদ্রব্য, পাট, হিমায়িত পণ্য ও চাসহ বেশ কয়েকটি পণ্যের নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। রফতানি খাতে প্রধান পণ্য তৈরি পোশাকের প্রবৃদ্ধির হারও বেশ কমেছে।
অর্থনীতিবিদ ও শিল্পোদ্যোক্তারা আশা করেছিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরে স্থবির হওয়া অর্থনীতি নির্বাচিত মহাজোট সরকারের সময় গতি লাভ করবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা আমাদের পূরণ হয়নি। অর্থনীতিবিদ ও শিল্পোদ্যোক্তাদের মতে বিগত বছরটি অত্যন্ত কঠিন সময় ও স্থবিরতার মধ্যে কেটেছে। তবে আমাদের প্রশ্ন কেন শিল্প খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে না! তরল অর্থ ব্যাংকগুলোয় পড়ে রয়েছে। ব্যাংকগুলো শিল্পে বিনিয়োগ করতে পাচ্ছে না। অর্থাত্ দেশে শিল্পে বিনিয়োগ হচ্ছে না। তাই কর্মসংস্থানও তেমন হয়নি। এর কারণ সম্পর্কে আমরা কয়েকটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছি নিবন্ধের শুরুতে। আরও কয়েকটি সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করে প্রবন্ধ শেষ করব।
এক. গ্যাস ও বিদ্যুতের সঙ্কট : আজ দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের সঙ্কট ভয়াবহ। গ্যাসের স্বল্পতার কারণে দিনের অর্ধেক সময় মিল কারখানা চালানো যাচ্ছে না। বিদ্যুতের সরবরাহ তো বেশ কয়েক বছর ধরে নেই। বড়-বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান গ্যাস নিয়ে বিদ্যুত্ উত্পাদন করে কারখানা পরিচালনা করে। কিন্তু এখন গ্যাসের সরবরাহ হ্রাস পাওয়ায় কারখানাগুলোয় অর্ধেক সময় উত্পাদন বন্ধ থাকে। সরকার বলছে, গ্যাসের মজুদ কমে যাওয়ায় গ্যাসের চাপ কমেছে। তাই মজুদ বৃদ্ধি করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। মজুদ বৃদ্ধির জন্য গ্যাসকূপ খনন করতে হবে। গ্যাসকূপ খননের পর গ্যাস পাওয়া গেলে তখন মজুদ বৃদ্ধি পাবে। মজুদ বৃদ্ধি পেলে সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে। তাতে শিল্প কারখানায় গ্যাসের সরবরাহ শতভাগ নিশ্চিত হলে শিল্পে উত্পাদন শতভাগ হবে। এ আশায় আমরা দিন গুনছি। হয়তো আরও ২/১ বছর এভাবে কেটে যেতে পারে। যদি সরকার দ্রুত গ্যাসকূপ খনন, গ্যাস উত্তোলন ও সরবরাহ নিশ্চিত না করে শিল্প খাতে উত্পাদন বৃদ্ধি পাবে না। তখন প্রবৃদ্ধি ও বৃদ্ধির কোনো কারণ থাকবে না।
বর্তমানে চাহিদা মোতাবেক দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে। তা পূরণের একমাত্র উপায় বিদ্যুত্ উত্পাদন। তবে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। হয়তো আগামী দুই/তিন বছর পর বিদ্যুতের উত্পাদন চাহিদা মোতাবেক হতে পারে।
দুই. চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দুর্নীতি : আজ আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় ব্যাধি চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দুর্নীতি। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সরকারের বিভিন্ন সংগঠন আজ এ কাজে সবচেয়ে বেশি জড়িত। চাঁদাবাজির কারণে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিবহন খরচ চাঁদাবাজির জন্য আজ ১৫ শতাংশ বেড়েছে। টেন্ডারবাজির জন্য উন্নয়ন ব্যয় থমকে দাঁড়িয়েছে। আর দুর্নীতির জন্য সমাজ ও সমাজের সব মানুষ দিশেহারা। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দুর্নীতি দূর করার চরম উদ্যোগ গ্রহণ না করলে আগামী বছরও শিল্পখাতে বিনিয়োগ ধস নামবে।
তিন. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা : বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দেশে রাজনীতি ছিল না। ছিল স্বৈরশাসন, দুর্নীতি, নিপীড়ন, শোষণ ও দলবাজি। আর এখন শুরু হয়েছে একদলীয় শাসন। সব ক্ষেত্রে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ, বদলি ও সুযোগ-সুবিধার কারণে দেশ একমুখী হয়ে পড়েছে। মানুষ হয়ে পড়ছে হতাশ। ক্রমে রাজনৈতিক দলগুলোয় অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। হয়তো আগামীতে হরতাল, অবরোধ ও আন্দোলন শুরু হলে শিল্প খাতে বিনিয়োগ নতুন করে বাধাগ্রস্ত হবে। তাই সরকারকে রাজনৈতিক সহাবস্থানে আসতে হবে। নির্যাতন, নিপীড়ন, মামলা-হামলা বন্ধ করতে হবে। সবার প্রতি সমান সুযোগ, সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। উত্পাদনের রাজনীতির জন্য সব ধরনের রাজনৈতিক নিপীড়ন বন্ধ করতে হবে। হিংসা, হানাহানির রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। দেশকে, দেশের মানুষকে ঐক্যের রাজনীতিতে আহ্বান করতে হবে। জাতিকে দ্বিধাবিভক্ত করা যাবে না। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ও মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি বলে নেতিবাচক রাজনীতি পরিহার সবাইকে করতে হবে। ঐক্যের রাজনীতির আহ্বান করতে হবে। তাহলে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে। তখন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে। নতুন নতুন শিল্প গড়ে উঠবে। কর্মসংস্থান দ্রুত বাড়বে।
চার. শিক্ষা খাতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে : শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড আমরা জানি এবং বলি কিন্তু কাজ করি না। শিক্ষা খাত আজ সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। শিক্ষককুল আজ সবচেয়ে বঞ্চিত। সবচেয়ে কম বেতনে কাজ করেন শিক্ষকরা। তাই সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও কর্মযোগ্যতা সম্পন্ন জনশক্তি শিক্ষকতা বেছে নেন। তাই শিক্ষককুল দুর্বল নানা দিকে। শিক্ষকদের বেতন কাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা সবচেয়ে বেশি দিতে হবে। তবে সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রছাত্রী শিক্ষকতা পেশায় আসবে। তখন শিক্ষক হবে শক্তিশালী, মেধাবী। তখন শিক্ষা খাতকে এগিয়ে নেয়া সহজ হবে।
দ্বিতীয়ত, কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তিকে উত্পাদনমুখী জনশক্তিতে রূপান্তরিত করা যাবে। দরিদ্রতা দূর করার একমাত্র হাতিয়ার শিক্ষা। তাই শিক্ষাকে চর, বিল, গ্রাম, উপকূল, পাহাড় পর্বত সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে হবে। এখনও এদেশের ৭০ শতাংশ মানুষ প্রকৃত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। আর দক্ষ জনশক্তি তৈরি না করতে পারলে শিল্পখাতে উত্পাদন বৃদ্ধি পাবে না।
শুধু বিএ, এমএ পাস করে গেলে দেশের জনশক্তি দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত হয় না। তাই উচ্চ শিক্ষার নামে শুধু সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন বন্ধ করতে হবে। দেশে যথেষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এখন প্রয়োজন কারিগরি শিক্ষাসম্পন্ন জনশক্তির। তাই সরকারের ঘোষিত প্রতিটি উপজেলায় কারিগরি স্কুল, কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যাতে করে কর্মের হাতিয়ার তৈরি হয়ে দেশে শিল্পখাতে উত্পাদনের শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারবে এবং বিদেশে দক্ষ জনশক্তি রফতানির পথ সুগম হবে।
বিগত এক বছর শিল্প খাতের নেতিবাচক অবস্থান থেকে বের হয়ে আসতে হলে উল্লিখিত বিষয়গুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সরকারপ্রধানকে বিবেচনায় আনতে হবে।
লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, সাবেক সহসভাপতি, এফবিসিসিআই

No comments

Powered by Blogger.