কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন-‘মন্দের ভালো’ প্রার্থীতে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে ভোটারদের! by আনোয়ার হোসেন

কারও চোখে কুমিল্লার প্রধান সমস্যা মাদক, কারও চোখে সন্ত্রাস। কেউ বলছেন, জলাবদ্ধতা ও যানজট এই নগরের মূল সমস্যা। কোনটা প্রধান, কোনটা অপ্রধান, সেই বিচারে না গিয়ে বলা যায়, কুমিল্লার প্রথম মেয়রকে এই চার সমস্যার সমাধানে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। মেয়র পদপ্রার্থীরা সে হিসেবে প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন। কিন্তু এটা করার জন্য যে ব্যক্তিত্ব, সার্বিক গ্রহণযোগ্যতা আর সততা ও সাহসের দরকার, তেমন কোনো মেয়র কি পেতে যাচ্ছে কুমিল্লাবাসী?


এসব কাজ করার জন্য কোন প্রার্থীকে যোগ্য বলে মনে করছেন ভোটাররা? কয়েক দিন ধরে নগরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে এই দুই প্রতিবেদক নানা পেশা ও বয়সের ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের মনোভাব ও প্রত্যাশা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেছেন। অধিকাংশ ভোটার মনে করেন, প্রত্যাশিত প্রার্থী তাঁরা পাননি। তার পরও মন্দের ভালো একজনকে নির্বাচন করতে হবে তাঁদের।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। এই নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হয়েছেন আটজন। কাউন্সিলর পদে ২৮৭ জন।
মেয়র পদপ্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও আলোচনা সীমাবদ্ধ আছে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী আফজল খান, বিএনপি থেকে অব্যাহতি নিয়ে সম্মিলিত নাগরিক কমিটির ব্যানারে প্রার্থী হওয়া মনিরুল হক সাক্কু, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী নূর-উর রহমান মাহমুদ ও আনিসুর রহমান এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থী এয়ার আহমেদ সেলিম।
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শিক্ষাবিদ আমীর আলী চৌধুরী ও বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতি কুমিল্লার সভাপতি পাপড়ি বসু মনে করেন, যিনি গতিশীল নেতৃত্ব ও দক্ষতার সঙ্গে জনগণের দুয়ারে গিয়ে নাগরিক সেবা দিতে পারবেন, তেমন একজনকে মেয়র নির্বাচন করা উচিত। কিন্তু সচেতন নাগরিক কমিটি কুমিল্লার সাবেক আহ্বায়ক বদরুল হুদা মনে করেন, এই নির্বাচনে সৎ, যোগ্য ও প্রত্যাশিত প্রার্থী নেই। তাই বদনাম তুলনামূলক কম, এমন প্রার্থীকেই বেছে নেওয়ার চেষ্টা করবেন ভোটাররা।
কুমিল্লা কমার্স কলেজের ছাত্র ফখরুল ইসলাম থাকেন নগরের সংরাইশ এলাকায়। তিনি বলেন, এই এলাকায় দিনদুপুরে ফেনসিডিল, হেরোইনসহ নানা মাদক বিক্রি হয়। এটা পুরো কুমিল্লা শহরের সমস্যা। যিনি মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন তাঁকেই ভোট দেবেন তিনি।
সংরাইশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রমজান হোসেন বলেন, ‘মাদক এখানে অলিগলিতে পাওয়া যায়। কারা এসব মাদক ব্যবসা করে সবাই জানে, কিন্তু ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। সব প্রার্থীই বলছেন জয়ী হলে মাদক নিয়ন্ত্রণ করবেন। এর মধ্যে কে পারবেন, সেটা বিবেচনা করেই ভোট দেব।’
কুমিল্লা সদরকে ভেঙে কুমিল্লা দক্ষিণ পৌরসভা হয় ২০০৩ সালে। প্রতিষ্ঠার পর এই পৌরসভার কোনো নির্বাচন হয়নি। প্রশাসক দিয়েই চলছে। এই এলাকার ভোটাররা এবারই প্রথম মেয়র নির্বাচনের সুযোগ পাচ্ছেন। স্থানীয় ভোটারদের দাবি, প্রায় ৫০ হাজার ভোটার-অধ্যুষিত এই এলাকাটি সদরের তুলনায় অনুন্নত। নেই পরিকল্পিত পয়োনিষ্কাশন-ব্যবস্থা, রাস্তাঘাটও ভাঙাচোরা। তাই উন্নয়নই তাদের প্রধান দাবি।
পদুয়ারবাজার এলাকার ওষুধের দোকানি রিপন দেবনাথ বলেন, সব মেয়র পদপ্রার্থীই তাঁদের কাছে নতুন। কিন্তু সবাই সদর এলাকার। দক্ষিণের উন্নয়ন করবে কে?
গত কয়েক দিন বিভিন্ন বয়স ও পেশার শতাধিক মানুষের সঙ্গে কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকদের। নতুন মেয়রের কাছে তাঁদের দাবির অন্ত নেই। নগরের রেসকোর্স এলাকার গৃহিণী শাহিদা আখতার, বাদুড়তলার আলতাফ হোসেন, সংরাইশের মোমেনা খাতুন, পুরাতন চৌধুরীপাড়ার মাহমুদা আখতার যাঁর যাঁর এলাকার নাগরিক সমস্যার সমাধান চান। কিন্তু তাঁদের অনেকের আফসোস, কোনো দলই নারায়ণগঞ্জের উদাহরণ সামনে রেখে পরিচ্ছন্ন কোনো প্রার্থী জনগণের সামনে দিল না। ফলে ভোটারদের সামনে কোনো ভালো বিকল্প থাকল না।
এসিড-সন্ত্রাস নির্মূল কমিটির কুমিল্লার সভাপতি দিলনাশি মোহসেন বলেন, কুমিল্লার মেয়র কে হবেন, ভোটাররা মোটামুটি ঠিক করে ফেলেছেন। প্রথম মেয়রকে পাঁচ বছরের চিন্তা না করে ৫০ বছরের পরিকল্পনা করতে হবে।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিপণনকাজে সংশ্লিষ্ট মো. ইব্রাহিমের মতে, মেয়র প্রার্থীদের কারই অতীত ভালো নয়। সন্ত্রাস করা, সন্ত্রাস লালন ও টেন্ডারবাজির অভিযোগ আছে তাঁদের বিরুদ্ধে। কিন্তু কাউকে না কাউকে তো বেছে নিতে হবে। কার অতীত একটু কম খারাপ সেটাই এখন বিবেচনা করতে হচ্ছে।
সদর দক্ষিণ এলাকার পদুয়ারবাজারের দোকানি মো. ইউসুফ বলেন, ‘যারা দাঁড়াইছে তারার চেয়ে ভালো প্রার্থী দাঁড়াইতে পারত। এখন যারা আছে তারা কেউ পয়সার জোরে, কেউ শক্তি দিয়া মাঠে নামছে।’
নগরের বাদুড়তলার গৃহিণী সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, সব প্রার্থীই নিজেকে ভালো দাবি করছেন। কিন্তু কেউ ধোয়া তুলসীপাতা নন। কুমিল্লাবাসীর দুর্ভাগ্য, ভালো লোক প্রার্থী হয় না।
প্রার্থীদের আত্মপক্ষ সমর্থন: ভোটারদের এই মনোভাবের বিষয় জানিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী আফজাল খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি কোনো খুনখারাবির সঙ্গে জড়িত নই। জরুরি অবস্থার সময় কিছু মামলা হয়েছিল, এগুলো মিথ্যা মামলা। বাকিটা ভোটাররাই বিবেচনা করবেন।’ তিনি মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও শিক্ষিত হিসেবে মানুষ তাঁকেই ভোট দেবেন।
সম্মিলিত নাগরিক কমিটির প্রার্থী মনিরুল হক বলেন, ‘আমি প্রয়াত মন্ত্রী আকবর হোসেনের মামাতো ভাই। কুমিল্লায় তাঁর রাজনৈতিক বিষয়গুলো আমি দেখাশোনা করতাম। তাই তাঁকে রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করার জন্য আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় মামলা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাজনীতি করতে গেলে ভালো-মন্দ দুই ধরনের কথাই থাকে। আমি ভালো করলে ভোটাররা ভোট দেবেন, আর না করলে দেবেন না!’
জাতীয় পার্টি-সমর্থিত প্রার্থী এয়ার আহমেদ সেলিম দাবি করেন, ‘আমি অবশ্যই স্বচ্ছ ভাবমূর্তির প্রার্থী। আমার গায়ে কোনো রক্তের দাগ নেই। আমি কুমিল্লা থেকে কখনো পালাইনি। কেউ যদি আমাকে অস্বচ্ছ ভাবমূর্তির প্রার্থী বলে থাকেন, তাহলে না জেনে বলছেন।’
আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী নূর-উর রহমান মাহমুদ বলেন, ‘ভিক্টোরিয়া কলেজে রাজনীতি করতে গিয়ে আমাকে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীকে সামলাতে হয়েছে। তখন নানা ধরনের মামলা হয়। এসব মামলা থেকে আদালতের মাধ্যমে খালাস পেয়েছি।’ তাঁর দাবি, তিনি স্বচ্ছ ও যোগ্য প্রার্থী।
আরেক বিদ্রোহী প্রার্থী আনিসুর রহমান বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে কারও কোনো অভিযোগ থাকার কথা নয়। আমি কখনোই দাঙ্গা-হাঙ্গামায় জড়িত ছিলাম না।’

No comments

Powered by Blogger.