দুই বড় দলের সহযোগী সংগঠন-ভুঁইফোঁড়দের ঠেকাতে হবে জাতীয় স্বার্থেই

বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে অনেক বিবর্ণ চিত্র পরিলক্ষিত হয়। কখনো কখনো এর প্রত্যক্ষ শিকার হন দেশের সাধারণ মানুষ। ভুঁইফোঁড় সংগঠনের কারো কারো কার্যকলাপ জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে তো বটেই, দেশের সামগ্রিক অবয়বেও কালো দাগ ফেলে। ২৪ সেপ্টেম্বর কালের কণ্ঠে 'বড় দুই দলের সহযোগী' শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সেই চিত্রই চিত্রিত হয়েছে।


রাজনীতি যদি হয় গণমানুষের, তথা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন-অগ্রগতির অন্যতম প্রধান মাধ্যম, তাহলে এর অবসান ঘটানোর লক্ষে প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলকেই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। এর লাগাম টেনে ধরতে হবে। প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে ক্ষমতাসীন জোটের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং তাদের সহযোগী সংগঠনের বাইরে কিংবা ছায়াতলে এমন কিছু ভুঁইফোঁড় সংগঠন গড়ে উঠেছে, যা জাতীয় রাজনীতির ওপর কিভাবে অপছায়া ফেলছে, তা তুলে ধরা হয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে মূল দলের সহযোগী সংগঠন থাকেই। কিন্তু বিপত্তিটা দেখা যাচ্ছে অন্যত্র। এই সংগঠনগুলোর বাইরে কিংবা পাশাপাশি এমন কিছু সংগঠন গড়ে উঠেছে, যার পেছনে রয়েছে হীনস্বার্থ চরিতার্থকরণের উদ্দেশ্য। এমন চিত্র গণতান্ত্রিক রাজনীতির ক্ষেত্রে একেবারেই অনভিপ্রেত, অনাকাঙ্ক্ষিত এবং উদ্বেগজনকও বটে। এসব ভুঁইফোঁড় সংগঠনের প্যাড বা তথাকথিত নেতা-কর্মীদের ভিজিটিং কার্ডে দলের শীর্ষ নেতা কিংবা প্রতিষ্ঠাতার ছবিসহ দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ঠিকানা ব্যবহার করা হচ্ছে। কারো কারো বিরুদ্ধে এসব ব্যবহার করে সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সরকারি কিংবা ব্যক্তিবিশেষের জায়গা-জমি দখল করে দখলকৃত জায়গা-জমিতে ওইসব সংগঠনের সাইনবোর্ড পর্যন্ত টাঙিয়ে দেওয়া হচ্ছে_এমন প্রমাণও মিলেছে। বাস্তবে এসব সংগঠনের কোনো অস্তিত্বই নেই। নামসর্বস্ব ও সাইনবোর্ডসর্বস্ব এসব সংগঠনের মৌসুমি রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের কর্মকাণ্ড সরকার এবং দলের জন্যও বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, অনুমোদনহীন এসব সংগঠনের তথাকথিত নেতা-কর্মীরা সাধারণ মানুষের মনে ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এমন চিত্র শুধু একটি সুস্থ ও বিকাশমান সমাজের জন্য প্রতিবন্ধকই নয়, গণতন্ত্রের জন্যও হুমকি। এসব সংগঠনের তথাকথিত নেতা-কর্মীরা খোলস পাল্টে যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তাদেরই হন। সরকার ও দলের বোঝাসম এসব নেতা-কর্মীকে চিহ্নিত করে যথাযথ প্রতিকারমূলক কঠোর-কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ নানা মহল থেকে বারবার উত্থাপিত হলেও বিষয়টি থেকে যাচ্ছে প্রতিকারহীন। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাটা এ জন্য আরো বেশি। জনসমর্থিত কোনো গণতান্ত্রিক দলের কাছেই বাহুবল, অস্ত্রবল ও স্বার্থান্বেষীদের গুরুত্ব থাকতে পারে না। দলের প্রকৃত নেতা-কর্মী ও জনসমর্থনই তাদের বড় শক্তি।
অতীতে কয়েকবার উভয় দলের শীর্ষ মহল থেকে এসব সংগঠন সম্পর্কে সতর্কবার্তা উচ্চারিত হয়েছে বটে কিন্তু ভুঁইফোঁড় সংগঠন গজানোর অপক্রিয়া এখনো অব্যাহত রয়েছে। দলের পরিচয়ে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, তদবিরবাজিসহ নানাবিধ দুষ্কর্মে যারা লিপ্ত তারা শুধু জনশত্রুই নয়, দলেরও শত্রু। ভুঁইফোঁড় কোনো সংগঠন মূল রাজনৈতিক দলের অলংকার হতে পারে না। এদের নিবৃত্ত করার জোরদার উদ্যোগ নেওয়া সার্বিক স্বার্থেই জরুরি। রাজনীতি রাজনীতির স্বাভাবিক পথে চলুক এবং গণমানুষের কল্যাণের রাজনীতি যাতে বিকশিত হয় তা নিশ্চিত করার দায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের। আমরা আশা করব, উভয় দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এ বিষয়ে দৃষ্টি দেবেন এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন।

No comments

Powered by Blogger.