বিদ্যার দেবী সরস্বতী :পূজা ও উৎসব by নিরঞ্জন অধিকারী

দেব-দেবীর পূজা যেমন প্রতিদিনের কাজ, দৈনন্দিন আনুষ্ঠানিকতা, আবার বিশেষ বিশেষ দিন ধার্য করে সেই বিশেষ বা সুনির্দিষ্ট দিনে বিশেষ বিশেষ দেব-দেবীর পূজা করা হয়। তখন পূজা পরিণত হয় উৎসবে। আর উৎসবের মধ্য দিয়ে ঘটে সংস্কৃতির প্রমূর্ত প্রকাশ। মাঘী শুক্লা পঞ্চমীতে দেবী সরস্বতীর পূজা করা হয় আনুষ্ঠানিকভাবে।


পূজায় পুষ্প-বিল্লপত্র-চন্দন-ধূপ-প্রদীপ প্রভৃতির মধ্য দিয়ে এক পবিত্র পরিবেশ সৃষ্টি হয়। মনে তৃপ্তি আসে, মনও হয় পবিত্র।
দেবী সরস্বতীর প্রতিমা নির্মাণের মধ্যে চারুকলার প্রতিভার প্রকাশ ঘটে।
পূজায় যখন সবাই মিলিত হয়, দেবী সরস্বতীর শ্রীচরণে অঞ্জলি দেয়, একসঙ্গে প্রসাদ গ্রহণ করে তখন তার মধ্য দিয়ে এক ঐক্যবদ্ধ চেতনা ও সংহতির সেতুবন্ধ ঘটে। পূজা উপলক্ষে দোকানপাট বসে, এর একটি অর্থনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। সব মিলিয়ে একটি উৎসব, 'আনন্দের ভোজ'।
প্রতিভা-জ্ঞান, মেধা-বিদ্যার দেবী সরস্বতী। তাই তাঁর রূপে জ্ঞানের মতোই পবিত্র শুভ্রতা। দেবী সরস্বতী শ্বেত পদ্মে আসীন। তাঁর এক হাতে উদ্যত লেখনী, অন্য হাতে শোভা পায় পুস্তক। তাঁর বাহনটিও শ্বেতহংস। একজন বিদুষীর মধ্যে যে সুরুচির প্রকাশ দেখি আমরা, দেবী সরস্বতীর রূপের আদলেই তা অনুকৃত, অনুসৃত। পবিত্রতা, উৎসব, আনন্দ মিলিয়ে একটি সাংস্কৃতিক মান তৈরি হয়, একটি সুকুমার পরিশীলিত রুচি ব্যক্তিকে গড়ে তোলে এবং সমাজকে প্রভাবিত করে, সংস্কৃতিকে সমুন্নত রাখে। সমাজকে উৎসবের মধ্য দিয়েও ঐক্যবদ্ধ রাখে। চেতনা হয় সংহত।
পূজার উৎসব-আনন্দের মধ্য দিয়ে আমরা বুকের সঙ্গে বুক মেলাই, একাত্ম হয়ে যাই উৎসবের মধ্য দিয়ে। সারাদেশে শিক্ষার্থী বা বিদ্যার্থীদের উদ্যোগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও প্রতি বছর উদযাপিত হয় দেবী সরস্বতীর পূজা। সেখানে পূজাটা পূজারিদের। কিন্তু উৎসব সবার। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে উৎসবে আপ্যায়িত হন, আলোচনা সভায় বক্তৃতা করেন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন, কেউ কেউ অংশগ্রহণও করেন। ধর্ম যার যার_ উৎসব সবার। এ চেতনা বাঙালি জাতিসত্তার ভিত্তিকেও মজবুত করে।
ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন মন্দিরে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাড়ম্বরে সরস্বতী দেবীর পূজা প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, রোকেয়া হল, শামসুন্নাহার হল, কুয়েত মৈত্রী হল, বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে দেবী সরস্বতীর পূজার আয়োজন করা হয়। পূজার সঙ্গে থাকে প্রসাদ বিতরণ ও আপ্যায়ন। থাকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেখানে বিশিষ্ট শিল্পীরা অংশগ্রহণ করেন। আলোচনা সভায় বিশিষ্ট ব্যক্তিরা আলোচনা করেন। অস্থায়ী দোকানপাট বসে। আলোকসজ্জায় সজ্জিত হয় পূজানুষ্ঠানের চত্বর ও হলগুলো। উৎসবের সাজে সজ্জিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
এখানে জগন্নাথ হলের সরস্বতী পূজার কথা বিশেষভাবে বলতে হয়। আগে জগন্নাথ হলে একটি কেন্দ্রীয় পূজা অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু কয়েক বছর ধরে এক অভূতপূর্ব বিষয় সংযুক্ত হয়েছে। জগন্নাথ হলের বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের পূজারি শিক্ষার্থীরা পৃথকভাবে অস্থায়ী মন্দির নির্মাণ করে আলোকসজ্জায় সজ্জিত করে দেবী সরস্বতীর পূজা করে আসছে। জগন্নাথ হলে এ রকম অর্ধশতাধিক পূজামণ্ডপ তৈরি হয়। মন্দির ও প্রতিমা নির্মাণে ঘটে সৃষ্টিশীলতার অপূর্ব প্রকাশ। আবার বিভাগের বৈশিষ্ট্যের (যেমন_ পদার্থবিজ্ঞান তার পদার্থবিদ্যা, সংস্কৃত বিভাগ তার সংস্কৃত সাহিত্যাশ্রিত কোনো বিষয় ইত্যাদি) প্রকাশ ঘটিয়ে আরও নান্দনিক ও বৈচিত্র্যমণ্ডিত করে তোলা হয়।
চারুকলা অনুষদের পূজার্থীরা জগন্নাথ হলের সরোবরে দেবী সরস্বতীর প্রতিমা নির্মাণ করে তাদের শিল্পচেতনার যে অভূতপূর্ব প্রকাশ ঘটিয়ে আসছে, তা উল্লেখের দাবি রাখে।
প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীরা আসেন। তারা সহযোগিতাও করেন। তবে অসুবিধা হয় যে বিভাগে পূজার্থীর সংখ্যা কম, তাদের বেলায়। তারাও সাড়ম্বরেই দেবী সরস্বতীর পূজা করতে চায়, কিন্তু ব্যয়ভার গ্রহণ করা তাদের সামর্থ্যের বাইরে। এ ক্ষেত্রে সরকারের ধর্ম মন্ত্রণালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুদান প্রদানের অনুরোধ জানাই। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে দুর্গাপূজার সময় মন্দিরগুলোয় পূজার জন্য অনুদান প্রদান করা হয়। তেমনি সরস্বতী পূজার সময় বিশেষ করে জগন্নাথ হলের এই সরস্বতী পূজা উপলক্ষে অনুদানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বিত্তবানদেরও উদার হাতে এগিয়ে আসতে বলি। 'স্মরণিকা' প্রকাশে চাই বিজ্ঞাপনদাতাদের সহযোগিতা। জগন্নাথ হলের সরস্বতী পূজা উৎসবের মতো এত বেশি সংখ্যক পূজামণ্ডপ গড়ে সরস্বতী পূজা বাংলাদেশের আর কোথাও অনুষ্ঠিত হয় বলে আমার জানা নেই।
প্রতিভা-প্রজ্ঞা-জ্ঞান-মেধা-বিদ্যা আমাদের চিত্তকে প্রস্তুত করুক। আমাদের বাঙালি জাতিসত্তা উৎসবের মধ্য দিয়ে সংহত হোক। আমাদের সংস্কৃতি থাকুক উদারতায় সি্নগ্ধ, একতায় দৃঢ়। জয়তু দেবী সরস্বতী।

নিরঞ্জন অধিকারী : অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; ট্রাস্টি, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট
niranjanadhikary@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.