এল ক্ল্যাসিকোর লড়াই আর ক্ল্যাসিক নয়! by রাকিবুল হাসান

সার্বিক পরিসংখ্যান এখনও কথা বলছে রিয়াল মাদ্রিদের পক্ষে। কিন্তু সাম্প্রতিক রেকর্ড পুরোপুরি ঝুঁকে আছে বার্সেলোনার দিকে। নন্দনতত্ত্ব বিচারেও রিয়াল-বার্সা দ্বৈরথ ইদানীং ফুটবলপ্রেমীদের মন ছুঁয়ে যাচ্ছে না। কারণ প্রতিবারই একপেশেভাবে জিতে চলেছে কাতালানরা। বিশ্বের সেরা দুটি ক্লাব মুখোমুখি হলে তখন সেটা আর শুধু মাঠের লড়াই থাকে না। খেলা হয় স্নায়ুর ওপর দখল নিয়েও। সেখানে বার্সার কাছে পাত্তাই পাচ্ছে না রিয়াল।


সে কারণে এ নিয়ে তিন মৌসুম লা লীগায় কি নিজের মাঠ, আর কি প্রতিপক্ষের, বার্সেলোনার বিপক্ষে জয় নেই হোসে মরিনহোর রিয়ালের। ভাগ্যিস গত মৌসুমে কোপা ডেল রে ফাইনালে পেপ গার্দিওলার শিষ্যদের ১-০ গোলে পেছনে ফেলেছিলেন রোনালদো-হিগুয়াইনরা। নইলে তো ২০০৭ সালের পর এল ক্ল্যাসিকো মানেই মেসি-জাভিদের জয়জয়কার। নিয়মিতভাবে বার্সার চেয়ে বেশি বাজেটের দল গড়েও কেন ব্যর্থ হচ্ছে রিয়াল? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিশ্লেষকরা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অঘটনটি ছিল ২০১০ সালের ২৯ নভেম্বর। নিজের মাঠ বার্নাব্যুতে ৫-০ গোলে এল ক্ল্যাসিকো হারবে রিয়াল এটা কীভাবে মেনে নেওয়া যায়? ১০ মিনিটে গোলবন্যার শুরুটা হয় জাভির পায়ে চেপে। এরপর ১৮ মিনিটে পেদ্রো গোল করার পরের দুই গোল করেন ডেভিড ভিয়া (৫৫ ও ৫৮ মিনিট)। সবশেষে খেলার শেষ মিনিটে জেফরেন করেন পঞ্চম গোলটি। ২০০৯ সালের ২ মে'তেও একই ধরনের অবিশ্বাস্য ফলের জন্ম দিয়েছিল বার্সা। সেবার বার্সার জালে দু'বার বল প্রবেশ করালেও নিজেরা হজম করে অর্ধডজন গোল। মেসি আর অঁরির দুই গোলের পাশে একটি করে গোল করেছিলেন পিকে আর পুওল।
আর রিয়ালের হয়ে দুটি গোল করেছিলেন হিগুয়াইন ও রামোস। তবে আগের বছর অর্থাৎ ২০০৮ সালের ৭ মে রিয়াল একটা বড় জয় পেয়েছিল এল ক্ল্যাসিকোতে। ৪-১ গোলে বার্সেলোনাকে হারাতে রাউল, রোবেন, হিগুয়াইন ও নিস্টেলরয় গোল করেছিলেন, আর অঁরি এক গোল শোধ দিয়েছিলেন। এর পর থেকেই গ্যালাকটিকোদের ছন্দপতন শুরু। সেই সঙ্গে শুরু কাতালানদের আকাশে ওড়ার দিন। লা লীগার একের পর এক শিরোপা, সঙ্গে চ্যাম্পিয়ন্স লীগেও অপ্রতিরোধ্য বার্সা। কোনো মৌসুমে ডাবল, তো পরের মৌসুমে ট্রেবল। অথচ এখন পর্যন্ত ১৬৩ দেখায় বার্সার ৬৪ জয়ের বিপরীতে রিয়ালের জয়সংখ্যা ৬৮। অন্য ৩১টি ম্যাচ ড্র হয়। ডি স্টেফানো-রাউলদের ক্লাব গোলও করেছে বেশি। ২৬৪ বার বার্সার জালে বল পাঠিয়েছে তারা। অন্যদিকে কাতালানরা প্রতিপক্ষের লক্ষ্যভেদ করেছে ২৫৫ বার। কিন্তু এল ক্ল্যাসিকোর ইদানীং যা অবস্থা, তাতে রিয়ালকে টপকে যেতে আর বেশি সময় মনে হয় লাগবে না বার্সেলোনার! এই যেমনটা হলো এবারের এল ক্ল্যাসিকোতে। লীগের প্রথম লেগ ম্যাচ ছিল রিয়ালের মাঠ বার্নাব্যুতে। এক ম্যাচ হাতে রেখে ৩ পয়েন্ট এগিয়েও ছিল মরিনহোর শিষ্যরা। রিয়ালের ফুটবলাররা যখন ফর্মের তুঙ্গে তখন বার্সা তারকারা নিজেদের খুঁজে ফিরছেন। কিন্তু সবকিছু পক্ষে নিয়েও শেষরক্ষা হলো না। ম্যাচ শুরু হতে না হতে এগিয়েও গিয়েছিল গ্যালাকটিকোরা। অথচ শেষ ফলাফল বার্সার পক্ষে ৩-১। আর এই ম্যাচ দিয়েই মেসি-জাভি-ইনিয়েস্তারা ফিরলেন ফর্মে। পরের এল ক্ল্যাসিকো যেহেতু ন্যু ক্যাম্পে, তাই আর চিন্তা কিসের? রিয়াল আজকাল নিজের মাঠেই পারে না, সেখানে প্রতিপক্ষের মাঠে গিয়ে মাথায় তো মান বাঁচানোর চিন্তা ঘুরবে। আর ওই সুবিধা নিতে জুড়ি নেই পেপ গার্দিওলার!
রিয়াল মাদ্রিদ ক্লাবটি ১৯০২ সালে যাত্রা শুরুর পর স্পেনের সবচেয়ে সফল ক্লাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। রেকর্ড ৩১ বার লা লীগা শিরোপাই শুধু নয়, চ্যাম্পিয়ন্স লীগে সর্বোচ্চ ৯ বারের চ্যাম্পিয়নও তারা। অন্য হাজারো ট্রফি শোভা পাচ্ছে ক্লাব শোকেসে। সময়ের সেরা তারকাকে নিতে রিয়াল থাকে মরিয়া। এ কারণে ওদের ডাকা হয় গ্যালাকটিকো নামে। জিদান, ফিগো, বেকহাম, ব্রাজিলিয়ান রোনালদো থেকে হালের রোনালদো_ রিয়াল শিবির আলো করেছেন এসব তারকা ফুটবলার। কোচ হিসেবে স্পেশাল ওয়ান মরিনহোকেও আনা হয়েছে। অথচ বার্সেলোনা চক্র কাটছে না কোনোভাবেই।
দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে তুলনায় একচুলও পিছিয়ে থাকবে না রিয়াল, কিছুটা বরং এগিয়েই থাকবে। অথচ মাঠে নামলে পাল্টে যায় দৃশ্যপট। তাদের মূলমন্ত্র 'মোর দ্যান অ্যা ক্লাব'ই বরাবর এগিয়ে দিচ্ছে বার্সাকে। সে চাপটা নিতে পারছে না রিয়াল। দেখা যাক পরের এল ক্ল্যাসিকোতে রিয়ালের ভাগ্য বদলায় কি-না?

No comments

Powered by Blogger.