যন্ত্রণার শেষ নেই by শিরিন আক্তার

পুরান ঢাকার নবাবপুর রোডে বাসা কাশফিয়ার। চাকরি করেন বনানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। অফিস শুরু সকাল ৭টায়। তাই ৬টায় বাসা থেকে বের হতে হয় তাকে। কাশফিয়া জানান, খুব কষ্টে একটি রিকশা জোগাড় করলেও, রিকশাওয়ালার সন্দেহের চাহনিতে তিনি অপমান বোধ করেন। অনেকে আবার সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, এত সকালে আপা কই যান? কাশফিয়া বলেন, একদিন সকালে ভাড়া দিতে গিয়ে রিকশাওয়ালাকে বিশ টাকার নোট


দিলাম। ভাড়া ঠিক করে উঠেছি ১০ টাকা। সে বাকি ১০ টাকা ফেরত দেবে না। টাকা ফেরত দিচ্ছেন না কেন বললে মুখে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে বলে, আপনারা এত সকালে কই যান, ক্যামনে টাকা কামাই করেন, আমরা জানি। আমাগো ১০, ২০ টাকা ভাগ দিলে কিছু হবে না। রাগে মাথায় আগুন ধরে যায়। ধমক দিয়ে বলি, এসব কী বলছেন! যে ভাড়া ঠিক হয়েছে তাই রাখেন। কে, কার কথা শোনে। আরও কিছু আজেবাজে কথা বলে রিকশাওয়ালা চলে যায়। অসহায় বোধ করি। অপমানে চোখ ভিজে ওঠে সহসাই। কাশফিয়া আরও জানান, যখন ইভনিং শিফটে ডিউটি থাকে তখন সমস্যাটা অন্য রকম হয়। খুব সহজে রাজি হয়ে যায় গুলিস্তান থেকে নবাবপুর যাওয়ার। যাওয়ার পথে কয়েকবার প্রশ্ন করবে, কোন জায়গায় নামবেন? এদিকে আপনাদের বাসা না হোটেলে যাবেন। আমি যতই বলি, আপনি এ ধরনের প্রশ্ন করছেন কেন? কোনো ভাবান্তর নেই। তার মুখের সাবলীল হাসি জানায়, এত রাতে ভালো মাইয়ারা বাইরে থাকে নাকি? কিছুই করার থাকে না। মেজাজ ভালো করে তাকে বোঝাতে হয় বনানী অনেক দূরে। জ্যাম ঠেলে পুরান ঢাকায় পেঁৗছতে রাত হয়ে যায়। যানবাহনের অপ্রতুলতা আর রিকশাওয়ালা_ মেয়েরা যেন দু'জায়গাতেই জিম্মি।
রাস্তা পার হওয়ার সময় এদিক-ওদিক তাকিয়ে সাবধানে পা বাড়ান সাদিয়া সাবা। তারপরও নানা সমস্যায় পড়তে হয়। সাবা জানান, ভয় দেখাতে চালকরা মজা পায়। সবচেয়ে বেশি ভয় দেখাতে চায় সিএনজি আর রিকশাওয়ালারা।
এতো গেল মুদ্রায় এক পিঠের গল্প। মুদ্রার অন্য পিঠে রয়েছে আরও বিড়ম্বনার কাহিনী। মুগদায় বাসা অনামিকার। অনামিকা জানায়, একদিন পল্টন থেকে বাসে উঠছি যাত্রাবাড়ী যাব। গেটের সামনে এক পুরুষযাত্রী, কনডাক্টর এবং আমি উঠছি। এরই মধ্যে কনডাক্টর তার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে আমার পুরো পিঠে হাত বুলিয়ে নিল। আমি উসখুস করায় সে হাত নামাল বটে। পরক্ষণে আবারও পিঠে হাত। রাগ সামলাতে না পেরে তখনই দুটি চড় বসালাম। তখন আরেক কনডাক্টর তেড়ে এসে প্রশ্ন শুরু করল, মারলেন কেন? আমার উত্তর ছিল, ওকেই জিজ্ঞেস করেন কেন মেরেছি। বাসের ড্রাইভার তখন আমাকে বলল, যে না চেহারা, হেরে আবার ছুঁইতে যাইব। বিশ্বাস করেন, তারপর আমি এক সপ্তাহ ক্লাসে যাইনি। পড়াশোনা করতে ইচ্ছা করেনি। মেয়েরা বাসে ওঠা-নামার সময় যদি কনডাক্টররা একটু সরে দাঁড়ায় তাহলে যৌন হায়রানি কমে আসবে অনেকটা।
গণপরিবহনে যাতায়াতকারী যাত্রী তাসনিম বললেন পুরুষের নোংরা মানসিকতার হাত থেকে বাঁচার জন্য এখন অনেক মেয়ে বোরকা পরে চলাচল করছে।
বাসের সংরক্ষিত আসন আর সাধারণ আসন নিয়ে সমস্যার কথা জানালেন লোপা হায়দার। লোপা জানান, বাসে উঠে দেখি মহিলা সিটে একজন পুরুষ বসা। তাকে উঠতে বললেই তিনি অগি্নশর্মা হয়ে উঠলেন। আমাদের সিটে ওই মহিলা বসছে কেন। ওই মহিলাকে ওখান থেকে ওঠান। তবেই বসতে পারবেন। যতই তাকে বোঝাই না কেন, একটি সাধারণ সিটে নারী-পুরুষ সবাই বসতে পারবে কিন্তু সংরক্ষিত সিটে শুধু মহিলারাই বসবে। তিনি বুঝতে নারাজ। পাশ থেকে আরেকজন ফোড়ন কাটলেন, নারী-পুরুষ সমান অধিকার চান। পুরুষদের মতো ঝুলে যাওয়ারও চেষ্টা করুন। আমরা অবশ্যই ঝুলে যাব, দাঁড়িয়ে যাব, ধাক্কা খাব সবই ঠিক আছে কিন্তু আপনারা মেয়েদের ওপর ইচ্ছাকৃতভাবে পড়ে যাওয়া, নানা রকম যৌন হয়রানি বন্ধ করুন তাহলে কোনো সমস্যা হবে না_ উত্তর দিলাম।
একজন নারী যখন ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে বাসে যাবেন তাকে অবশ্যই একটা এক্সট্রা টেনশন মাথায় রাখতে হয়_ জানালেন নাবিলা নাহিদ। তিনি জানান, কর্মসূত্রে আমাকে প্রায়ই চট্টগ্রাম যেতে হয়। বাসে ওঠার আগেই মনে নানা প্রশ্ন উঁকি মারে। পাশের সিটের সহযাত্রীটি কেমন হবে। সারা রাত কথা বলতে চাবে কি-না। টিকিট কাটার সময়ই অনুরোধ করতে হয় যেন আমার পাশের সিটে একজন মহিলার ব্যবস্থা করা হয়। এসব উটকো ঝামেলা হবে কেন। নাবিলা জানান, একবার বাসে মাত্র লাইট অফ হয়েছে। এর কিছুক্ষণ পরই একটি মেয়ে চিৎকার করে উঠল। সে শুধু সুপারভাইজারকে বলল, আমাকে অন্য সিটে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিন। আমি যতই জিজ্ঞেস করি কি হয়েছে বলো। কোনো কথাই সে বলল না। দেখলাম পাশের লোকটি চুপচাপ বসে আছে। এই যে মেয়েটি অভিযোগ তুলল না, প্রতিবাদ করল না, এতে যারা অন্যায় করে তারা সাহস পেয়ে যাচ্ছে।
এভাবেই নানা অন্যায়, অশ্লীলতা আমাদের সমাজে জায়গা করে নিচ্ছে। নারীর উচিত তাদের পথের সমস্ত ঝঞ্ঝাল দু'পায়ে ঠেলে সামনে এগিয়ে যাওয়া। অন্যায় আচরণ করলে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করা এবং সমুচিত জবাব দিয়ে দেওয়া। তাতে অপরাধীর চেহারা সবার সামনে উন্মোচিত হবে। একবার হলেও লজ্জাবোধ করবে। প্রতিবাদ করতে করতে এক সময় অন্যায় কিছুটা কমবে।

No comments

Powered by Blogger.