ভুলে যাওয়ার সমস্যা :স্মৃতিভ্রংশতা

স্মৃতিভ্রংশতা মূলত বৃদ্ধদের অসুস্থতা। ৬৫ বছর বয়সের পর এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রতি পাঁচ বছরে দ্বিগুণ বাড়ে। ৮০ বছর বয়সের বেশি জনসংখ্যার প্রতি পাঁচজনে ১ জন স্মৃতিভ্রংশতায় আক্রান্ত হন (৫ জনে ৪ জন স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত নন, এটাই বা কম সুখের কী?)। স্মৃতিভ্রংশতার অনেক কারণ আছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কারণ আলঝেইমার ডিজিজ। এ অসুস্থতায় ভুলে যাওয়ার পাশাপাশি আরও কিছু সমস্যা পাওয়া যায়।


ঠিক শব্দটি বেছে নিজে না পারা : এর ফলে ব্যক্তি ঠিকভাবে ভাব প্রকাশ করতে পারে না। অসুস্থতা যখন তীব্র হয় ব্যক্তির উচ্চারিত শব্দ সমষ্টি থেকে আসল অর্থই বের করা যায় না। এ সময় রোগীও অন্যের কথার অর্থ বুঝতে পারে না।
পারদর্শিতা কমে যাওয়া : শার্ট-লুঙ্গি পরার মতো সাধারণ কাজ বা ভাত খাওয়ার মতো বহুল অভ্যস্ত কাজের পারদর্শিতাও নষ্ট হয়ে যায়।
বুদ্ধিমত্তা, বিচার বিবেচনা লোপ পাওয়া : যেমন_ আপনার বয়স কত? রোগী : ৭০। আপনার মায়ের বয়স_ রোগী : ৭০। রোগীর নিজের বয়স ও তার মায়ের বয়স একই হওয়া সম্ভব নয়। এ বিবেচনা তার মধ্যে কাজ করছে না। এ ক্ষেত্রে রোগী ফুল স্পিড ফ্যানের বাতাসে বসে থেকেও বলতে পারে এটা শীতকাল।
ব্যক্তিত্বে পরিবর্তন : খিটখিটে মেজাজ, নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, দয়াহীন, অপরিচ্ছন্ন থাকা, অলস, আশ্বাস, সবকিছুতে অনাগ্রহ।
সন্দেহপ্রবণ।
ষঅতি দুশ্চিন্তা ও বিষণ্নতাগ্রস্ত।
নিজের অবস্থা সম্পর্কে বোধহীনতা। ফলে নিজেকে অসুস্থ মনে করে না, চিকিৎসা সাহায্য গ্রহণ করতে চায় না।
আচার-আচরণে পরিবর্তন : মুখ হাত ধোয়া, ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও কাপড় পাল্টানোর প্রতি উদাসীন। কখনো কখনো কাপড়েই প্রস্রাব-পায়খানা করে দেয়, রোগীর মধ্যে উগ্র ভাব দেখা দিতে পারে, পরিবারের লোক অসতর্ক থাকলে এ সময় রোগী রাস্তায় বের হয়ে এদিক-ওদিক চলে যেতে পারে।
স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তিকে নতুন কোনো জায়গায় নিয়ে গেলে সে সহজেই হারিয়ে যেতে পারে। সে দিন মাস ক্ষণের কথা বলতে পারে না। কোথায় থাকে, এখন কোথায় আছে তাও বলতে পারে না। প্রায়ই জিনিস হারিয়ে ফেলে। মাঝে মাঝে মনে করে, কেউ তার জিনিস চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। অবস্থা যখন আরো খারাপের দিকে যায়, সে তার অতি পরিচিত জায়গায় (যেমন নিজ বাসা) দিক হারিয়ে ফেলে। সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার দাঁড়ায়, সে তার অতি ঘনিষ্ঠ প্রিয়জনদেরও চিনতে পারে না। প্রায় সব ক্ষেত্রেই স্মৃতিভ্রংশ রোগটি ধীরে ধীরে খারাপের দিকে যায়। এ অবনতি কখনও কখনও কয়েক মাসের মধ্যে হয়। কখনও কখনও মস্তিষ্কে একের পর এক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রক্তক্ষরণ স্মৃতিভ্রংশের কারণ হতে পারে। প্রতিবার রক্তক্ষরণের ফলে স্মৃতির সামান্য অবনতি ঘটে। এ ধরনের স্মৃতিভ্রংশতা বংশানুক্রমিক ঘটতে পারে।
কোনো কোনো ব্যক্তি তার স্মৃতির ঘাটতির অবস্থাটা বুঝতে পারেন এবং এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেন। যারা বোঝেন না তাদের নিয়ে খুব মুশকিল। কারণ তারা তো নিজেকে অসুস্থই মনে করেন না।
স্মৃতিভ্রংশতার কারণ :ঠিক ঠিক কারণটি এখনও জানা যায়নি। তবে কিছু ক্লু পাওয়া গেছে। যেমন-স্মৃতিভ্রংশ রোগটি বংশানুক্রমিক হয় যেমন_ আলঝেইমার ডিজিজ। যারা ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত তাদের স্মৃতিভ্রংশ বেশি হয়, জীবনও কখনও মাথায় আঘাত পেলে স্মৃতিভ্রংশ হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। এ ছাড়া উচ্চ রক্তচাপ এবং রক্তে অতিমাত্রায় কোলেস্টরল, ডায়াবেটিস, সিগারেট, মদ, অতিরিক্ত ওজন স্মৃতিভ্রংশের কারণ হতে পারে। কারণ এসব অসুস্থতা মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহে সমস্যা করে। পারকিনসন্স ডিজিজে স্মৃতিভ্রংশ হতে পারে। যুবক বয়সে, বিশেষত যারা অ্যালকোহল পান করে, তাদের হতে পারে করসাকফ'স সিনড্রোম। ভিটামিন বি-১ এর অভাবে এই অসুস্থতা হয়। সব শেষে আছে ইনফেকশন, যেমন : ক্লুজফেল্ড জেকব সিনড্রোম ও এইডস

ডো. জিল্লুর কামাল, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ

No comments

Powered by Blogger.