হাইকোর্টের রিট অধিক্ষেত্র ও ডিসিসি by এ এম এম শওকত আলী

ত্তর-দক্ষিণ নিয়ে ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) বিভক্তি নিয়ে শেষ পর্যন্ত আইনি যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এর চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে তা এ মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়। নির্বাহী বিভাগের বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধে হাইকোর্টের রিট অধিক্ষেত্র বা ক্ষমতা বিশ্বের কিছু দেশের মতো আমাদের দেশেও সংবিধানসম্মত। সংবিধানে এ ক্ষমতার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। এর মাধ্যমে কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি নির্বাহী স্বেচ্ছাচারিতামূলক আদেশ বা সিদ্ধান্ত বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে


আইন প্রয়োগ না করলে হাইকোর্টের কাছে প্রয়োজনীয় প্রতিকার চাইতে পারে। হাইকোর্টের এ ক্ষমতাই রিট ক্ষমতা হিসেবে প্রচলিত। সাধারণত বেআইনিভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ বা উপযুক্ত ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগ আইন প্রয়োগ না করলে বা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করলে হাইকোর্ট এ বিষয়ে যথাযথ নির্দেশ প্রদান করতে পারে। অর্থাৎ নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্ত বেআইনি ঘোষণা বা যে ক্ষেত্রে ক্ষমতা প্রয়োগ করা আইনসিদ্ধ ছিল, তা প্রয়োগ করারও নির্দেশ প্রদানে হাইকোর্ট ক্ষমতাবান। এ ছাড়া কোনো কোনো ব্যক্তিকে যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেআইনিভাবে আটক করে, সে ব্যক্তিকে হাইকোর্ট সশরীরে উপস্থিত করার জন্য উপযুক্ত নির্বাহী দপ্তরকে নির্দেশ প্রদান করতে পারেন। একে বলা হয় রিট অব হেবিয়াস কর্পাস। বাংলায় সশরীরে হাজির করার আদেশ। রিট অধিক্ষেত্রের মাধ্যমে হাইকোর্ট নির্বাহী বিভাগের বেআইনি কার্যকলাপ বন্ধ করে থাকে। প্রয়োজন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদন। পক্ষান্তরে হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়েও এ ধরনের নির্দেশ দিতে পারেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিই আবেদন করে থাকে।
সম্ভবত ১৯৯৯ সালে সুপ্রিম কোর্ট রিট ক্ষমতার সম্প্রসারিত ব্যাখ্যার মাধ্যমে একটি সিদ্ধান্ত প্রদান করে। এ সিদ্ধান্তবলে জনস্বার্থবিষয়ক রিট ক্ষমতা প্রয়োগও এখন আইনসম্মত। এর ফলে রিট আবেদনে যেকোনো ব্যক্তি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ চাইতে পারে। এ ধরনের রিটের উদাহরণের মধ্যে রয়েছে পরিবেশ সংরক্ষণসংক্রান্ত বিষয়সহ ফতোয়া জারি। বর্তমানে বাংলাদেশে পরিবেশ সংরক্ষণসংক্রান্ত রিট অনেক হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। রিট ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে হাইকোর্ট সুশাসন নিশ্চিত করে থাকেন। কয়েক বছর ধরে পরিবেশসহ সুশীল সমাজের অন্যান্য সংগঠন বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলনের সূচনা করেছিল, এর জন্য একপর্যায়ে হাইকোর্টও নির্বাহী বিভাগকে আদেশ দেন। আদেশটি ছিল নদীদূষণ বন্ধসহ নদীতীরবর্তী রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জমি থেকে অবৈধ দখলদারদের স্থাপনা ভেঙে দেওয়া। নির্বাহী বিভাগ এ বিষয়ে পদক্ষেপও গ্রহণ করেছিল। এ আদেশের অন্য একটি বিষয় ছিল নদীতীরবর্তী এলাকা চিহ্নিতকরণ। কিন্তু বাস্তব অগ্রগতি আশানুরূপ হয়নি। এ ক্ষেত্রে যে বিষয়টি স্পষ্ট তা হলো, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তেমন কোনো সচেতনতা নেই। প্রাথমিক পর্যায়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠী অবৈধ স্থাপনার বিষয়টি প্রতিরোধ করলে অনেক বেশি সুফল অর্জন সম্ভব ছিল।
এ বিষয়ে অন্য একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হলো, নির্বাহী বিভাগ কেন অর্পিত বা বিধিবদ্ধ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়। এ ব্যর্থতা কি অদক্ষতা বা অনীহার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এ দুয়ের বাইরেও কিছু সমস্যা রয়েছে। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে_এক. নির্বাহী বিভাগের জনবলসহ স্থাপনা ভাঙার সরঞ্জামেরও অভাব রয়েছে, দুই. একাধিক সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, তিন. সমন্বিত কার্যক্রম ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের জোগান দেওয়ার জন্য সময়ের স্বল্পতা। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, নদীতীরবর্তী এলাকা সংরক্ষণের দায়িত্ব অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার। কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, একই কর্তৃপক্ষ এ ধরনের জমি লিজ দিয়েছে। এর অর্থ লিজের আওতাভুক্ত জমির ওপর লিজ-গ্রহীতার অধিকার সুরক্ষিত। একে উচ্ছেদ করতে হলে লিজের শর্তসহ আইনানুগ কার্যক্রম অনুসরণ করতে হবে। অন্যথায় আবার মামলা ও অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা। উচ্ছেদের বিষয়ে এ ধরনের ঘটনাও বিরল নয়। পক্ষান্তরে এ যুক্তিও প্রদর্শন করা যায় যে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সময়মতো কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে না। ঘটনা ঘটার পর এ নিয়ে হৈচৈ হলে বা হাইকোর্টের নির্দেশ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কর্মতৎপরতা শুরু করে।
বহুল বিতর্কিত ঢাকা সিটি করপোরেশনের বিভক্তি নিয়েও হাইকোর্টে দুটি রিট কেন বর্তমানে চলমান। একটি জনস্বার্থবিষয়ক। অন্যটি চিরাচরিত রিট। প্রথম মামলাটি কয়েকজন আইনজীবী শুরু করেন। সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে দাখিল করা আবেদনে তাঁরা নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্তে গৃহীত কার্যক্রম সংবিধান পরিপন্থী দাবি করেছেন। এদের প্রধান যুক্তি হলো, কোনো অনির্বাচিত ব্যক্তি নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনা করলে তা সংবিধানসম্মত হবে না। এ কারণেই সরকার কর্তৃক নিযুক্ত অন্তর্বর্তীকালের জন্য দুই প্রশাসকের নিয়োগ অবৈধ হবে। উল্লেখ্য, ঢাকা সিটি করপোরেশনের বিভক্তির বিষয়ে সম্প্রতি সংসদে একটি আইন অনুমোদিত হয়। যে কয়েকজন আইনজীবী 'সংক্ষুব্ধ' হয়ে এ মামলাটি করেছেন তাঁরা সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নন। এ কারণেই হয়তো মিডিয়া মামলাটিকে জনস্বার্থবিষয়ক রিট হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। অন্যদিকে এ যুক্তিও প্রদর্শন করা সম্ভব যে সরকারের গৃহীত কার্যক্রম যেহেতু সংবিধানের একাধিক অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করেছে, সেহেতু এটাও হবে চিরাচরিত রিট।
দ্বিতীয় মামলাটি করেছেন ঢাকার সাবেক মেয়র। তিনি প্রত্যক্ষভাবে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এ মামলায় সরকারি কার্যক্রমের স্থগিতাদেশ প্রার্থনা করা হয়। দুই বিচারকের মধ্যে এ নিয়ে মতভেদ হয়েছে। একজন ষাট দিনের জন্য স্থগিত করার আদেশের পক্ষে, অন্যজন এ বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন। ফলে মামলাটি নিষ্পত্তি হবে একটি তৃতীয় বেঞ্চে। এ মামলায় সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত সিটি করপোরেশনের বিভক্তির আইনকে অবৈধ ঘোষণার আর্জি রয়েছে।
এর মধ্যে এসেছে নতুন জটিলতা। নির্বাচন কমিশন ৯০ দিনের মধ্যে দুই নতুন করপোরেশনের নির্বাচন করা সম্ভব নয় বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। কমিশনের প্রধান যুক্তি হলো, আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্য দুজন কমিশনারের মেয়াদ উত্তীর্ণ হবে। অতএব নতুন কমিশনকেই এ কাজটি করতে হবে। বর্তমান কমিশনের মতে, ১৮০ দিনের মধ্যে দুই নির্বাচন করা সম্ভব। প্রাসঙ্গিক যে ১৮০ দিনের বিষয়টিতে কিছু তাৎপর্য রয়েছে। একসময় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত ব্যক্তিরাই এ দাবি করেছিলেন। মূল কারণ কোনো অনির্বাচিত ব্যক্তি যেন পরবর্তী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত সময়ে প্রশাসকের নিযুক্তি লাভ না করতে পারে। অর্থাৎ একজন নির্বাচিত মেয়রসহ অন্য নির্বাচিত ব্যক্তিদের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যেই নির্বাচন করতে হবে। এ ধারণা যদি সত্যি হয়, তাহলে দুটি ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের সময়সীমা ৯০ দিন কেন করা হলো।
সরকারি নীতিনির্ধারকসহ অন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কেন জানার চেষ্টা করেননি যে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে বর্তমান কমিশনারদের পদের মেয়াদ শেষ হবে। অন্যদিকে একটি রাজনৈতিক দলসহ অন্যরা যেভাবে সংশ্লিষ্ট নতুন আইনটি সংসদে অনুমোদিত হয়েছে, তা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন। এর সঙ্গে যোগ করা যায় প্রধান বিরোধী দলের দৃষ্টিভঙ্গি। তারা বিভক্তির দারুণ বিরোধী। বৃহত্তর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেও রয়েছে জটিলতা। অধুনা বিলুপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রথা পুনর্বহাল না করলে দলটি আগামী নির্বাচন বর্জন করবে। সার্বিকভাবে ঢাকা সিটি করপোরেশনের বিভক্তি বৃহত্তর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অধিকতর কলহের সৃষ্টি করেছে।
হাইকোর্টের রিট মামলার চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে তা বলা দুষ্কর। শেষ পর্যন্ত নবসৃষ্ট দুই ঢাকা সিটি করপোরেশন জন্মের আগেই মৃত হবে কি না তা হবে দেখার বিষয়।
লেখক : সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও কলামিস্ট

No comments

Powered by Blogger.