একাত্তরের ভাবনায় এখনও! by শামা আরজু

প্রতিটি ডিসেম্বরই আমার রক্তক্ষরণের অস্তিত্ব টের পাই নতুন করে। '৭১-এ আমি ৪/৫ বছর বয়সী। বাকিরা আমার ছোট। বাবার কোনো ভাই নেই। মায়ের ভাইদের পাকিস্তানপ্রীতি ছিল। মাতামহ শিক্ষক ছিলেন বলেই হয়তো মামারা হানাদারদের বিরোধিতা না করলেও দোসর হিসেবে কাজ করেননি। মার পিতার এতে অপরাধবোধ কাজ করত কি-না জানি না, তবে এটা খুব জানি_ মামারা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেননি ভাবতেই নিজেকে খুব ছোট মনে হয়।


বাবা তখনও সিরিয়াস অ্যাজমায় ভুগতেন। কেবল বইয়ের ট্রাংক লুকাতেন বাবা। মার কাছে শুনি, আমাদের ঘরে মুক্তিযোদ্ধাদের মিটিং হতো। মা বাইরে দাঁড়িয়ে পাহারা দিতেন। আমার আনস্মার্ট মা, আমার রাঁধুনি মা মুক্তিযোদ্ধাদের পাহারা দিয়ে আমার বুকের ভার হালকা করেন। বাবাকে নিয়ে আমার গর্বের শেষ নেই। চে গুয়েভারার লেখা গেরিলা যুদ্ধের ওপর লেখা বাবার বইটি ঢাকায় যায়। '৭১-এ বাবার বইটি ছিল। না, বাবার মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট নেই বলে আমার লজ্জা করে না মোটেও, সংসারে বড় সন্তান হিসেবে আমি খুব জানি, একাত্তরে তো বটেই, স্বাধীন দেশেও বাবা মরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধরতই ছিলেন।
একাত্তরের পরপর বাবা ছিলেন রিলিফ অ্যাকাউনট্যান্ট। সেই বাবার ঘর নেই, ভূমি নেই, কম্বল নেই। বাবার সংসারে বই ছড়া আর কোনো সম্পদ নেই। বাবা যুদ্ধ করেন সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে, বাবা যুদ্ধ করেন কূপমন্ডূকতা আর অশিক্ষার বিরুদ্ধে। বাবা রাজনীতি করেন। ২/৩ দিন বাবা বাড়ি ফেরেন না। যখন ফেরেন তখনও রাজনীতি বাবাকে ছাড়ে না। বড় নেতারা বাবার মশারির নিচে লুকিয়ে থাকতেন। নেটের মশারি তখনও বাংলাদেশে বোধ করি ছিলই না। মনে নেই ওসব নেতার নাম। মার কাছে শুনি তাদের নাম। আমার ওসব মনে থাকে না। আমার মনে থাকে আগুন! আমার মনে থাকে রক্তের স্রোত। আমার মনে থাকে ঘরবাড়ি ছেড়ে দৌড়ে পালিয়ে ডোবার ভেতর লুকিয়ে থাকা। কচুরিপানা ঘিরে থাকা হিম পানির শীতলতা আমি এখনও টের পাই। আমার মনে থাকে গুলির শব্দ। আমার মাথায় গেঁথে যায় গুলির শব্দ। আমি ঘুমাতে পারি না। বাবাকে বলি, আমার মাথা চেপে ধরেন, আমার মাথায় গুলি পড়ছে। আমি দুঃস্বপ্নে ঘুমাই, দুঃস্বপ্নে জাগি। স্বাধীন দেশে বড় হই। আমি তখন তের কি চৌদ্দ। আমাকে নিয়ে বাবার স্বপ্নরা বড় হয় স্বাধীন দেশে। আমাদের মূল্যবোধগুলো মুক্ত নয় অনাচার থেকে। ভুল মানুষকে তাই ভালোবেসে সংসার নামের অনাচারে জড়িয়ে যাই। বাবার স্বপ্নগুলো খুন করি আমি। নষ্ট সমাজের নষ্টামিতে ভাইও জড়ায়। স্বাধীন দেশে বাবার অর্থনৈতিক মুক্তি নেই। সামাজিক অনাচার থেকে মুক্তি পায় না আমার ভাই। নারী নির্যাতনের অনাচার থেকে মুক্তি পাই না আমি। মৃত্যু মুক্তি দেয় বাবাকে। আমি মুক্ত হই স্বামীর অত্যাচার থেকে। হাজারটা অনাচার আমার পায়ে শেকল পরায়। আমি প্রতিনিয়ত শেকল ভাঙার যুদ্ধ করি। বাবার সংসারে জ্বলে '৭১। বোনে বোনে, ভাইয়ে ভাইয়ে। এক বোন অশিক্ষায় ভুগে অন্য বোন কুশিক্ষায়। এক ভাই দিনমজুর, গাঁজা খায়। অন্য ভাই অফিসার। টাকা গোনার চাকরি। টাকা গুনে গুনে ম্যালা টাকা বেতন পায়। বিশ্বাস করে_ জগতের সব সমস্যার কারণ টাকা, সমাধানও টাকায়। ভাই গাঁজা খায় না। যা খায় তার গন্ধ নেই। এক ভাইয়ের বন্ধুরা অশিক্ষিত বা কম শিক্ষিত। অন্য ভাইয়ের বন্ধুদের সার্টিফিকেটের ওজন ভালোই, তবে ওদের ভেতরকার অন্ধকারটা আমার বাবার সংসারকেও প্রভাবিত করে। আমি গুলির শব্দ শুনি। বাবা পান-সিগারেট পর্যন্ত খেতেন না। বাবার ছেলেরা কত কী খায়! বাবার সংসারে এখনও '৭১-এর বিভীষিকা। পিঁড়িতে বসে মসলিনের মতো স্বচ্ছ মসুর ডাল আর রসুনে মরিচ বাটা ভাতে যে স্বাদ ছিল, এখন নেই। মা আছেন, মৃত্যুর অপেক্ষায়। মার মৃত্যুর পর বাবার সংসারটা বধ্যভূমি হয়ে যাবে। আমি ভাবতেই শিউরে উঠি! আমি আমার মাথার ভেতর গুলির শব্দ শুনি। আমি ঘুমের ঘোরে রক্তের স্রোত দেখি। এ রক্ত আমার ভাইয়ের, আমার বোনের। অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্নীতির নৈরাজ্য, শিক্ষার নামে মিথ্যা, দলাদলি, বিকৃতি, সংস্কৃতির অবমাননা একটা স্বাধীন দেশের মানুষকে মুক্তি দেয় না সংকীর্ণতা-হীনন্মন্যতা থেকে, নেশা থেকে, হিংসা থেকে।
যে দুঃস্বপ্ন আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়, যে রক্তস্রোত আমি এখনও মাড়াই, যে গুলির শব্দে আমি এখনও জেগে উঠে মাথা চেপে ধরি, বুকের ধড়ফড় করা নদীর ভাঙন শুনি, সেই আমি আসলে কেউ না। প্রতীক মাত্র। উহ! আমার এমন প্রতীক হতে ইচ্ছা করে না আর। আমার ইচ্ছাগুলো স্বাধীন নয়। স্বাধীন দেশে পরাধীনতায় ভুগছে মাটিঘেঁষা মানুষ, নারী, শিশু, বৃদ্ধ। আর স্বাধীনতার সুফল ভোগ করছে স্বাধীনতাবিরোধী, পাকিস্তানের দালালরা। ছি!

No comments

Powered by Blogger.