একাত্তর এবং এখন-বেঁচে থাকার জন্য আগুনের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছেন বাদল by শফিউল আলম

৭ বছরের বাদল নন্দী উত্তাল একাত্তরে দশম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। সেই বয়সেই তিনি দেশের টানে চলে যান মুক্তিযুদ্ধে। মাতৃভূমি স্বাধীন করে বাড়ি ফিরে ফের পড়ালেখা শুরু করেন। এরপর এসএসসি পাস করে খুঁজতে থাকেন চাকরি। দেশের জন্য এত বড় ত্যাগ স্বীকার করার পরও তার ভাগ্যে জোটেনি একটি ছোট্ট চাকরিও। বেঁচে থাকার জন্য তাই আগুনের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেন তিনি। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় বাদল নন্দী রাউজান আরআরএসসি


উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীতে পড়তেন। দেশকে পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত করতে কয়েকজন সঙ্গীসহ যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। রামগড়ে নাগরাজ বাড়ির পাশে খান সেনাদের সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর যে যুদ্ধ হয়েছিল তাতে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। ১০ ডিসেম্বর রাউজানের হলদিয়া ও আমিরহাট এলাকায় হায়েনাদের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ করেন বাদল ও তার সঙ্গীরা। সেই যুদ্ধে শহীদ হন তার তিন সঙ্গী শামসুল আলম, আবদুল মান্নান ও পঙ্কজ বড়ূয়া। এমন অনেক বন্ধুকে হারানোর পর যখন দেশ স্বাধীন হয় তখন নিজ গ্রামে ফিরে আসেন বাদল। স্বাধীন দেশে ফের শুরু করেন পড়ালেখা। ১৯৭২ সালে তিনি এসএসসি পাস করেন। এরপর জীবিকার তাগিদে একটি চাকরির জন্য তিনি ধরনা দিতে থাকেন বিভিন্ন স্থানে। অসংখ্য প্রতিষ্ঠানে চাকরির আবেদন করেও একটি ছোট্ট চাকরিও জোটেনি তার ভাগ্যে। তাই বেঁচে থাকার জন্য তিনি বন্ধুত্ব করেন আগুনের সঙ্গে। রাউজানের জলিল নগর বাসস্টেশনে শুরু হয় কর্মকার বাদলের নতুন যুদ্ধ।
রাউজান পৌর এলাকার ৯নং ওয়ার্ডের বাইন্যা পুকুর এলাকার মৃত শিবু দাশ নন্দীর ছেলে বাদলের কোনো সম্পত্তি নেই। গত তিন যুগ ধরে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে তিনি পরিবার নিয়ে কোনোভাবে বেঁচে আছেন। এ পেশায় থেকেই তিনি বিয়ে দিয়েছেন তিন মেয়ে শিউলী, টিঙ্কু ও রিঙ্কুকে। ছেলে খোকন নন্দী এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে বর্তমানে বেকার। তাই এ বয়সেও প্রতিদিন আগুনের আঁচের সঙ্গে সখ্য করে তাকে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। তবে ২০০১ সাল থেকে পাওয়া মুক্তিযোদ্ধা ভাতা অনেক কাজ দিয়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি।
মুক্তিযোদ্ধা বাদল জানান, মাটি ভরাট করে এবং বাঁশের বেড়া দিয়ে তিনি প্রথম জলিলনগর বাসস্টেশনের দোকানে কর্মকারের কাজ শুরু করেন। ৭০ হাজার টাকা সালামি দিলে জমিদার বিপুল দে দোকানটি পাকা করে দেন। তবে গত আট মাস আগে মার্কেট করার কথা বলে জমিদার তাকে দোকান থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা চালাতে থাকেন। এ জন্য তিনি ব্যবহার করেন স্থানীয় সন্ত্রাসীদের। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করেও উচ্ছেদ চেষ্টা চালানো হয়। তবে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আবু জাফর চৌধুরীসহ স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের হস্তক্ষেপে জমিদারের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপর বাদল নন্দী তাকে দোকান থেকে উচ্ছেদ না করার আবেদন জানিয়ে রাউজান সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে মামলা করেন। সেই থেকে জমিদার বিপুল দে'র প্রতি মাসের দোকান ভাড়ার ৮শ' টাকা তিনি আদালতে জমা দিচ্ছেন।
মুক্তিযোদ্ধা বাদল নন্দী কান্নাজড়িত কণ্ঠে সমকালকে বলেন, 'দোকানটি হাতছাড়া হলে পরিবার-পরিজন নিয়ে আমাকে না খেয়ে মরতে হবে।'
এ ব্যাপারে রাউজান পৌরসভার কাউন্সিলর জমির উদ্দিন পারভেজ সমকালকে বলেন, 'একজন তরুণ দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। চাকরি না পেয়ে করছেন কামারের কাজ। সেই বীরের একমাত্র অবলম্ব দোকানটুকুও যদি হাতছাড়া হয়ে যায় তাহলে তাকে পথে নামতে হবে। স্বাধীন দেশের মানুষের জন্য এর চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে।'

No comments

Powered by Blogger.