মুক্তিপণ দিয়ে পেলেন ছেলের কঙ্কাল


নিখোঁজ হওয়ার চার দিন পর ছেলেকে অপহরণের কথা জানতে পারেন মা তসলিমা খাতুন। ছেলেকে ফেরত পেতে ১০ দিন পর অপহরণদের দুই লাখ টাকাও দিয়েছিলেন। এর পরও ছেলেকে ফেরত না পেয়ে সহায়-সম্পদ সব বিক্রি করে অপহরণকারীদের কথামতো বাকি ১০ লাখ টাকাও দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ছেলেকে ফেরত পাননি। সাড়ে চার মাস পর কারীএই মা পেয়েছেন ছেলের কঙ্কাল।


কুষ্টিয়া জিলা স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র মোতাসিম বিন মাজেদ ওরফে হৃদয়কে অপহরণ করা হয়েছিল গত ২৩ মে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে ভেড়ামারা উপজেলার দশমাইল এলাকা থেকে তার লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সে কুষ্টিয়া শহরতলির মোল্লাতেঘরিয়া গ্রামের সৌদিপ্রবাসী মাজেদুল ইসলামের ছেলে।
পুলিশ বলেছে, হৃদয় অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় কুষ্টিয়া শহরের হাউজিং এলাকার আজব আলীর ছেলে হেলালউদ্দীন ওরফে ড্যানি, কালিশংকরপুর এলাকার গফ্ফারের ছেলে সাবি্বর ও ভেড়ামারার দশমাইল এলাকার মোসলেম শেখের ছেলে আবদুর রহিম ওরফে ইপিআর নামের তিন ব্যক্তি জড়িত। এদের মধ্যে ড্যানিকে আটক করা হয়েছে। শহরের জেলখানা মোড়ে তার একটি কম্পিউটারের দোকান রয়েছে। ড্যানির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী হৃদয়ের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
সাবি্বর নারী নির্যাতন এবং রহিম হত্যা মামলার আসামি। তারা জামিনে রয়েছে।
হৃদয়ের পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় কাগজ কেনার জন্য বাড়ি থেকে বের হয় হৃদয়। এরপর সে আর ফিরে আসেনি। নিখোঁজের চার দিন পর জানা যায়, সে অপহরণের শিকার হয়েছে। অপহরণকারীরা ফোন করে হৃদয়ের মা তসলিমা খাতুনের কাছে ১২ লাখ টাকা মুক্তিপণ চায়। এ ঘটনায় তিনি ৩১ মে কুষ্টিয়া সদর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে একটি মামলা করেন। এর পরও হৃদয়কে না পেয়ে অপহরকারীদের সঙ্গে দুই লাখ টাকা দিতে রাজি হন। সে অনুযায়ী গত ২ জুন অপহরণকারীদের কথামতো নির্দিষ্ট স্থানে টাকাও পেঁৗছে দেওয়া হয়। কিন্তু হৃদয়কে ফেরত দেয়নি তারা।
পুলিশ জানায়, গত সোমবার রাতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কুষ্টিয়া গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক মঈনউদ্দীন আহম্মেদ শহরের হাউজিং এলাকার বাড়ি থেকে ড্যানিকে (২২) আটক করেন। জিজ্ঞাসাবাদে হৃদয়কে অপহরণ ও হত্যার কথা স্বীকার করে ড্যানি। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দশমাইল এলাকার ক্যানেলপাড়ার একটি ইটভাটার পাশের জমি থেকে মাটি খুঁড়ে হৃদয়ের লাশ উদ্ধার করা হয়।
গতকাল দুপুরে হৃদয়ের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। ছেলের শোকে তাসলিমা খাতুন কাঁদতে কাঁদতে মূর্ছা যাচ্ছেন বারবার। পরে কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে পুলিশ তাঁকে ফোন করে হৃদয়ের সন্ধান পাওয়ার কথা জানায় এবং তাকে বাড়ি থেকে নিয়ে যায়।
তসলিমা বলেন, 'আজ (মঙ্গলবার) সকালে মাটি খুঁড়ে একটি গলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরনের কালো প্যান্ট ও কোমরের বেল্ট দেখে আমি আমার হৃদয়কে শনাক্ত করি।' তিনি জানান, পুলিশ যখন হৃদয়কে উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয় তখন অপহরণকারীদের কথামতো তিনি মোল্লাতেঘরিয়া ব্রিজের নিচে অপহরণকারীদের কাছে দুই লাখ টাকা পেঁৗছে দেন। কিন্তু বিষয়টি তিনি পুলিশকে জানাননি। এর পরও অপহরণকারীরা হৃদয়কে ফেরত না দিয়ে টালবাহানা করতে থাকে এবং আরো টাকা চায়।
তসলিমা জানান, টাকা দেওয়ার আগে হৃদয়ের সঙ্গে কথা বলতে দিতে হবে বলে শর্ত দেন তিনি। অপহরণকারীরা অন্য একটি ছেলে দিয়ে তাঁকে ফোন করায়। কথা শুনে তিনি বুঝতে পারেন এটা তাঁর ছেলে নয়। কারণ হৃদয় তাঁকে আম্মু ডাকত না। তিনি বলেন, 'সন্দেহের কথা জানালে অপহরণকারীরা আমাকে বলে তোর এই ছেলেকেও শেষ করব অন্য ছেলেকে ধরে এনে শেষ করব। এরপর আর তারা আমার সাথে যোগাযোগ করেনি। আজ আমি ফিরে পেলাম আমার ছেলের কঙ্কাল।'
কুষ্টিয়া পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ওসি আশরাকুল বারী কালের কণ্ঠকে জানান, গতকাল ভোর ৪টা থেকে হৃদয়ের লাশ উদ্ধারে অভিযান শুরু করেন তারা। সকাল ৭টার দিকে প্রায় তিন ফুট মাটির নিচ থেকে তার গলিত লাশ উদ্ধার করা হয়।
এ সময় কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মফিজউদ্দীন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুভাষ চন্দ্র সাহা, ভেড়ামারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাজিবুল ইসলাম, সহকারী পুলিশ সুপার সি এ হালিম, কুষ্টিয়া সদর থানার সহকারী পুলিশ সুপার সরোয়ার জাহান, সদর থানার ওসি আনোয়ার হোসেন, ভেড়ামারা থানার ওসি আজম খাঁন উপস্থিত ছিলেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কুষ্টিয়া ডিবির পরিদর্শক মঈনউদ্দীন আহম্মেদ জানান, হৃদয়কে উদ্ধারে জন্য এর আগে শহরের হাউজিং এলাকার বাকের, আরমান ও মোল্লাতেঘরিয়া এলাকার শফিকুলসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদও (রিমান্ড) করা হয়। কিন্তু তাদের কাছ থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ডিবি কর্মকর্তা জানান, যে মোবাইল ফোনের সিম ব্যবহার করে অপহরণকারীরা মুক্তিপণ চেয়েছিল সেই সিমসহ ভেড়ামারার এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু তার নাম জানাতে পারেননি তিনি। পরে জানা যায়, অপহরণকারীরা মুক্তিপণ চেয়ে ফোন করার পরপরই সিমটি ফেলে দেয়। সেটা কুড়িয়ে পেয়ে ওই ব্যক্তি ব্যবহার করছিলেন। গ্রেপ্তার করা চারজন বর্তমানে কারাগারে। তাদের আরেকটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে বলে পুলিশ কর্মকর্তা জানান।
এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, কয়েকদিন তসলিমা খাতুনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হৃদয় মাঝেমধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়ত। ওই সময় হৃদয় একবার বলেছিল কুষ্টিয়া শহরের জেলখানা মোড়ের জুজু কম্পিউটার দোকানের মালিক ড্যানি তাকে কোমলপানীয় খাইয়েছে। এর সূত্র ধরেই ড্যানিকে আটক করা হয়।
ড্যানির দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা মঈনউদ্দীন আরো জানান, হৃদয় মোবাইল ফোনে গান লোড করতে আসত তার দোকানে। সাবি্বরও ড্যানির দোকানে আসত। একপর্যায়ে সাবি্বর হৃদয়কে অপহরণের পরিকল্পনা করে। সে অনুযায়ী তারা হৃদয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে এবং তাকে বিভিন্ন সময় মাদক খাইয়ে আসক্ত করে ফেলে। ঘটনার দিন সন্ধ্যার একটু আগে হৃদয় দোকানে এলে তারা তাকে নিয়ে ভেড়ামারার দশমাইল এলাকার আবদুর রহিমের বাড়ির পাশের বাগানে যায়।
ড্যানি জানায়, তারা তিনজন মিলে হৃদয়কে চাপ দেয় সে তার মাকে বলুক তাকে অপহরণ করা হয়েছে। তাকে ছাড়িয়ে নিতে অপহরণকারীদের কথামতো টাকা নিয়ে আসতে হবে। হৃদয়ের এই কথা তারা মোবাইল ফোনে ধারণ করে রাখে। এরপর তাকে মাদক খাইয়ে বেহুঁস করে গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করে। পরে রহিম বাড়ি থেকে কোদাল এনে মিজানুর রহমান নামের এক ব্যক্তির জমিতে গর্ত করে লাশ মাটিচাপা দেয়। এর আগে লাশের ওপর কেরোসিন তেল ছিটিয়ে দেওয়া হয়।

No comments

Powered by Blogger.