হাজী শরীয়তুল্লাহ- বহুমাত্রিক সংস্কারের জনক by মাসুদ মজুমদা

বাংলাদেশের মানুষ স্বভাবগত ধর্মপ্রাণ। সব ধর্মের অনুসারীরাই জ্ঞান অনুযায়ী ও সাধ্যমতো নিজ নিজ ধর্ম মানে। ঐতিহাসিক কারণে এ দেশে আন্তঃধর্ম বোঝাপড়াও বেশি।
আবার প্রভাবিত হওয়ার মাত্রাও প্রবল। বিশেষত একত্ববাদ ও বহু ঈশ্বরতন্ত্র দীর্ঘ দিন পাশাপাশি চলার কারণে আচার-আচরণে প্রভাবিত হওয়ার ঘটনা স্বাভাবিক। এ স্বাভাবিকতা দীর্ঘ দিন মেনে নিলে বিচ্যুতি এসে ভর করে। সামাজিক সঙ্কট বাড়ে। ধর্মের নামে অনাচার বৃদ্ধি পায়Ñ তখন সংস্কার জরুরি হয়ে পড়ে। নয়তো নানামুখী আগ্রাসন ধর্মীয় জীবনকে আড়ষ্ট করে দেয়। কুসংস্কার নানা ধরনের অনাচার ও বিকৃতি ধর্মের নামে জায়গা করে নেয়Ñ তখন মূলে প্রত্যাবর্তনের তাগিদ বাড়ে।
নানা ধরনের কুসংস্কার যখন ধর্মের নামে চালু হয় তখন একত্ববাদী চিন্তায় বিচ্যুতির মাত্রা বেড়ে যায়। ইবাদতের নামেই শিরক ঢুকে পড়ে। বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের ধরনও ছিল সুফিবাদী ধরনের। তাতে মরমিবাদের নামে ঠাঁই করে নেয় ইবাদত-বন্দিগির ছদ্মাবরণে কিছু বিভ্রান্তি। সেই বিভ্রান্তি স্থান করে দেয় দেবত্ববাদী বহু ঈশ্বরতন্ত্রের ধারণাকে। এর ফলে একত্ববাদের ধারণায় শিরক ও কুসংস্কার ঠাঁই পেতে থাকে। বাংলাদেশে এ প্রবণতা প্রবল। আবার সংস্কারের ধারাও কম জোরদার নয়। আঠারো শতকে হাজী শরীয়তুল্লাহর সংস্কার আন্দোলন সেই ধারাবাহিকতারই অংশ।
হাজী শরীয়তুল্লাহ বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত সংস্কারক। তার নামানুসারেই শরীয়তপুর জেলার নামকরণ করা হয়েছে। এটি বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার অংশ। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৭৮১ সালে। মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি মক্কা গমন করেন। ফিরে আসেন ১৮১৮ সালে। দেশে ফিরে আরবের সংস্কারক আবদুল ওয়াহাব নজদির মতো ইসলামি সংস্কার আন্দোলন শুরু করেন। তার শুরু করা আন্দোলনই পরে ফরায়েজী আন্দোলন নামে পরিচিতি পায়। আরব ও মক্কায় শরীয়তুল্লাহ আবদুল ওয়াহাব নজদির একত্ববাদী সংস্কার আন্দোলনের সাথে পরিচিত হন, তার জীবনে এর প্রভাবও ছিল অপরিসীম।
প্রথম দিকে শরীয়তুল্লাহর সংস্কার আন্দোলন ছিল মূলত ধর্মীয়। পরে সমাজের অন্য বেশ কিছু দিকও এ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। ফলে হাজী শরীয়তুল্লাহকে একই সাথে ইসলামি পুনর্জাগরণের রাহবার, সমাজসংস্কারক ও কৃষক নেতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সময়টা ছিল আমাদের স্বাধীনতা হারানোর প্রেক্ষাপটে নানামুখী শোষণ-বঞ্চনায় অতিষ্ঠ হওয়ার কাল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কুশাসন, দুঃশাসন, শোষণ ও অত্যাচারে তখন সারা বাংলার জনগণের নাভিশ্বাস উঠেছিল। ক্ষমতার পালাবদলে মুসলমান হয়ে পড়েছিল নিঃস্ব ও দিশেহারা।
প্রভুসুলভ আচরণকারী নীলকরদের নির্যাতন ও অত্যাচারে নির্যাতিত মানুষ ছিল অসহায়। সেই নির্বাক, মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণায় কিষ্ট অসহায় জনগণকে তিনি স্বপ্ন, আশা ও ভরসা জোগাতে চেয়েছেন। সেই সময়টিতে নীলকরদের পাশাপাশি সঙ্ঘবদ্ধ মাড়োয়ারি সম্প্রদায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তব্যবস্থার সুফলভোগী হতে চাইল। উল্লেখ্য, ১৭৯৩ সালে প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অধীনে তারা বড় বড় জমিদারি ক্রয় করে শোষণ-বঞ্চনা বাড়িয়ে তুলেছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসায় নিয়োজিত গোমস্তারাও ছিল মধ্যস্থতাকারী ও মধ্যস্বত্বভোগী। এরা ছিল প্রধানত মাড়োয়ারিদের বাঙালি সহযোগী। এই গোমস্তাদের ছিল সারা দেশের হাটবাজার ও নদীবন্দরের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। তাদের যৌথভাবে পরিচালিত শোষণ, হিংস্রতা ও অত্যাচার সাধারণ মানুষ ও কৃষকদের অবস্থা ইউরোপের ক্রীতদাসদের পর্যায়ে উপনীত করেছিল। এই ভয়াবহ সামাজিক পরিবর্তন ছিল অসহনীয়। বিশেষত মুসলমান ক্ষমতা হারিয়ে হয়ে পড়েছিল অসহায়। এর বিপরীতে নব্য দালাল হিসেবে অন্য ধর্মাবলম্বীরা শাসক পাল্টানোর আমোদে ছিল আত্মহারা।
শরীয়তুল্লাহ মক্কায় অবস্থানকালে তৎকালীন বিখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদদের তত্ত্বাবধানে প্রায় দুই দশক ধরে ধর্মশিক্ষা ও আরবি সাহিত্য অধ্যয়ন করার সুযোগ পেয়েছিলেন। আরবে তার অবস্থানকালে শাসক শক্তির উত্থান-পতন ও ‘মাওয়াহিদুন’ বিপ্লবের চূড়ান্ত বিকাশ ঘটেছিল। তখনই ইবরাহিম পাশার নেতৃত্বে মিসরীয় অভিযান ঘটে। সে সময় পুনরুজ্জীবনের বিপ্লবী চেতনা ও একত্ববাদের উদ্দীপনা আরবদের হৃদয়কে স্পন্দিত ও সজীব করে তুলেছিল। এ পুনরুজ্জীবনের শিক্ষা শরীয়তুল্লাহর জীবনকেও আলোড়িত ও উজ্জীবিত করেছিল।
আগেই উল্লেখ করেছি, বহু ঈশ্বরবাদের একটি বাতাবরণে সুফিদের ধর্ম প্রচারের মাধ্যমে বাংলাদেশে ইসলাম বিস্তার লাভ করেছে। সুফিরা সাধারণত ঈমান বা বিশ্বাস স্থাপনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। এর ফলে নিখাদ জীবনবোধ ও কর্মময় জীবন কিছুটা উপেক্ষিত হয়। তাদের উপস্থাপনায় এবং মানুষের নির্ভেজাল তৌহিদি বোধের সাথে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি ও বিবাদের একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। সেটাই সেই সময়ে বাংলাদেশে চালু ছিল। এটা ছিল নির্ভেজাল তৌহিদি ভাবনা ও শরীয়তুল্লাহর শিক্ষার সাথে অনেকটা সাংঘর্ষিক। এ অবস্থায় তিনি দ্বিতীয়বার মক্কায় গমন করেন। ফিরে এসে শরীয়তুল্লাহ অধ্যাত্মবাদী চেতনা, সুফিবাদ ও ফরজ চিন্তার সমন্বয় ঘটানোর উদ্যোগ নেন, যা জনগণ ব্যাপকভাবে গ্রহণ করেন। হাজী শরীয়তুল্লাহ ইসলামের মৌলিক নীতি ফরজের ওপর অত্যধিক গুরুত্বারোপ করতেন। ধর্মের নামে কুসংস্কার বর্জন করতেন। এ কারণে তার পরিচিতিটাও এভাবে গড়ে উঠেছিল। এ পর্যায়ে তিনি ও তার আন্দোলন ‘ফরায়েজী’ নামে পরিচিতি পায়। তার এ সংস্কার আন্দোলন দূর-দূরান্তে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ফরিদপুর ছাড়াও বৃহত্তর ঢাকা, বরিশাল ও কুমিল্লা জেলায় তার ভাবধারা ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
‘তওহিদ’ বা আল্লাহর একত্বের ওপর বিশ্বাস স্থাপন এবং একত্ববাদকে নির্ভেজাল রূপের ওপর প্রতিষ্ঠাই ছিল তার লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা:-এর প্রবর্তিত নয় এমন সব স্থানীয় আচার-অনুষ্ঠানকে তিনি ‘শিরক’ বলে প্রত্যাখ্যান করার আহ্বান জানালেন। তা ছাড়া ইসলামের অবশ্য পালনীয় ধর্মীয় কর্তব্য বা ‘ফরজ’ পালনের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দিলেন। দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া, দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য ধর্মীয় কর বা ‘জাকাত’ প্রদান করা, রমজান মাসে ‘রোজা’ রাখা, ‘হজ’ পালন করার মতো মৌলিক ইবাদতে তার প্রেরণা ছিল বেশি। এ থেকেই হাজী শরীয়তুল্লাহর আন্দোলন ‘ফরায়েজী আন্দোলন’ নামে খ্যাতি পায়। সাধারণভাবে তিনি সব মুসলমানের ভ্রাতৃত্ববোধ, একতা ও সব মানুষের সমতার ওপর জোর দিতেন। তিনি সমাজ দূষণকারী বর্ণপ্রথা ও শ্রেণিবিদ্বেষ ও বৈষম্যের নিন্দা করতেন। অমুসলিম প্রতিবেশীদের প্রথা-পদ্ধতির প্রভাবে মুসলিম সমাজে ধীরে ধীরে প্রচুর অনৈসলামিক রীতিনীতি, আচার-ব্যবহার ও বহু ঈশ্বরবাদী ধ্যানধারণার প্রভাব বিস্তার করেছিল। তিনি সেগুলোরও তীব্র নিন্দা করতেন। আবদুল ওয়াহাব নজদির সংস্কার অনুসরণে তিনি উপমহাদেশের মুসলমানদের কাছে অধিকতর পরিচিত সামাজিক রীতিনীতি হিসেবে আজো বিদ্যমান ‘ফাতিহা’, ‘কবরপূজা’, ‘ওরস’ ও প্রচলিত ‘মিলাদ মাহফিল’ আয়োজনেরও নিন্দা করতেন। তিনি এগুলোতে ‘বিদআত’ বা বাহুল্য হিসেবে চিহ্নিত করে দূর করার চেষ্টা করেছেন। তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন একশ্রেণীর মানুষ ধর্মের আসল শিক্ষা কর্মময় জীবন ও মৌলিক আবেদন বাদ দিয়ে এসব নিয়ে বাড়াবাড়িতে মেতে উঠেছিল। তারা ভাবত এসবই আসল ধর্মকর্ম। তাই এসব আচার বর্জনের ডাক দেয়াকে তিনি কর্তব্যজ্ঞান করেছেন।
‘হেদায়া’তে উল্লিখিত মুসলিম আলেমদের শরিয়া অনুসারে তিনি ব্রিটিশ ভারতকে ‘দার-উল-হারব’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন। একই ফতোয়া দিয়েছিলেন শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি র: -এর পুত্র শাহ আববদুল আজীজ দেহলাভর। দখলদার শক্তির বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার সাময়িক অপ্রস্তুত অবস্থা ও অক্ষমতা থেকে তিনি ফতোয়া প্রদান করেছিলেন বলে গবেষকেরা মনে করেন। তিনি মনে করতেন, মুসলিম শাসনের অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের মুসলমানরা সমবেতভাবে জুমা ও ঈদের নামাজ আদায় থেকে বঞ্চিত। স্বাধীনতা অর্জন ছাড়া এ বঞ্চনা থেকে মুক্তির কোনো বিকল্প নেই। তাই স্বাধীনতার লড়াইকেও তিনি অন্যতম কর্তব্য ভেবেছিলেন। সে লক্ষ্যে আন্দোলন পরিচালনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন।
কিছু আলেমের মধ্যে হাজী শরীয়তুল্লার এ দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। তারা এসব অনুষ্ঠান উদযাপন করা অব্যাহত রাখেন। তাদের শঙ্কা ছিল, এগুলো বিলুপ্ত হলে মুসলিম সমাজে অনৈক্য ও অমিল দেখা দেবে। সাময়িক বর্জন ও পরিহার অভ্যাসে পরিণত হবে। তার সমসাময়িক মাওলানা কেরামত আলী জৈনপুরী এ বিষয়ে শরীয়তুল্লাহর সাথে ভিন্ন মত পোষণ করেছিলেন।
হাজী শরীয়তুল্লাহ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষা অনুযায়ী কুরআনের নির্দেশ অনুসারে নিজস্ব সংগ্রামের ফল ছাড়া মানুষের আর কিছুই নেই। তাই যিনি জমি চাষ করেন তার উৎপাদিত ফসলের ওপর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অধীনে সৃষ্ট জমিদারদের কোনো অধিকার নেই। হাজী শরীয়তুল্লাহ তার অনুসারীদের নির্দেশ দেন তারা যেন ধর্মীয় সহিষ্ণুতা বজায় রেখে অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালন করেও হিন্দু প্রতিবেশীদের বহু ঈশ্বরবাদী পূজা উৎসবে অংশ না নেয়। তিনি জমিদার কর্তৃক তাদের ওপর আরোপিত যেকোনো ধরনের ফসলি-করও না দেয়ার নির্দেশ দেন। তার অভিমত ছিল সরকার কর্তৃক নির্ধারিত আইনানুগ রাজস্বই কেবল প্রদান করা যাবে। এই নীতি সদ্য সৃষ্ট হিন্দু ভূস্বামীদের স্বার্থের হানি ঘটায়। তারা শরীয়তুল্লাহর আন্দোলনের বিরোধীপক্ষ হিসেবে উদ্ভব হয়। হিন্দু ভূস্বামীরা ইংরেজ বেনিয়াদের সহায়তায় কৌশলে কিছু সুবিধাভোগী কৃষকসহ তাদের পৃষ্ঠপোষক শক্তিগুলোকে একত্র করেন এবং নীলকরদেরও তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। এমন পরিস্থিতি সাংঘর্ষিক অবস্থার জন্ম দেয়। এরই ফলে ১৮৪০ সালে উভয় পক্ষ ক্রমেই সংঘর্ষের দিকে এগিয়ে যায়। দুর্ভাগ্য ১৮৪০ সালেই হাজী শরীয়তুল্লাহ মারা যান।  সৌভাগ্যের বিষয় ছিল তার সুযোগ্য ছেলে দুদু মিয়া ফরায়েজীদের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ফরায়েজীদের এ আন্দোলন ছিল এক দিকে ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন। অন্য দিকে এটি ছিল সঙ্ঘবদ্ধ প্রজা আন্দোলন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, তাদের গোমস্তা, নীলকর ও নব্য জমিদারদের বিরুদ্ধে ফরায়েজীদের আন্দোলন শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা আন্দোলনে রূপ নেয়। বাংলার এই প্রজা ও কৃষক আন্দোলন একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের টনক নড়িয়ে দিয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় অনেক আন্দোলন সংগ্রামের ফসল হয়ে অধরা আজাদি ধরা দিয়েছিল।



No comments

Powered by Blogger.