কালের পুরাণ- বিরোধী দল কেন সংসদে যায় না? by সোহরাব হাসান

গণতন্ত্রের মূল কথা হলো আস্থা ও সমঝোতা। প্রতিনিধিদের প্রতি জনগণের আস্থা আছে কি না, তা প্রমাণিত হয় নির্বাচনে এবং জনগণের সেই আস্থার মর্যাদা তাঁরা কতটা রাখছেন, পরবর্তী পাঁচ বছর ধরে তার পরীক্ষা হয়। সেই পরীক্ষায় বর্তমান ও অতীতের সাংসদদের মধ্যে খুব কমই উত্তীর্ণ হয়েছেন।
আস্থার চেয়ে অনাস্থা এবং সমঝোতার চেয়ে সংঘাতের প্রতি আমাদের রাজনীতিকদের আসক্তি বেশি। দুই দশক ধরে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র বহাল আছে (মাঝখানে দুই বছর সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহাল ছিল)। কিন্তু জাতীয় সংসদ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হতে পারেনি। রাজনীতি পরিচালিত হচ্ছে রাজপথে শক্তি প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে। সরকার শক্তির বলে বিরোধী দলকে দমন করতে সচেষ্ট থাকে, আর বিরোধী দল মেয়াদের প্রথম দিন থেকে সরকারকে উৎখাত করতে তৎপর।
হরতালের প্রসঙ্গ এলে বিএনপির নেতারা নিজেদের অহিংস আন্দোলনের প্রবক্তা বলে দাবি করেন। তাঁদের দাবি, আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকতে অনেক বেশি হরতাল করত। হতে পারে। তবে বিএনপিও পিছিয়ে নেই। বিএনপি ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সালে বিরোধী দলে থাকতে ২৪৪ দিন হরতাল পালন করেছে। (সূত্র: ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ, কনফ্লিক্টিং ইস্যুজ অ্যান্ড কনফ্লিক্ট রেজ্যুলেশন, জালাল ফিরোজ, বাংলা একাডেমী, ঢাকা)।
আমাদের জনদরদি গণতান্ত্রিক দলগুলো ক্ষমতায় থাকতে সংসদ ভালোবাসে এবং বিরোধী দলে গেলে রাজপথের প্রেমে পড়ে। তাদের এই প্রেম এতটাই ভয়ংকর যে দেশ ও মানুষকে মহাবিপর্যয়ের মধ্যে ঠেলে দেয়।
গত দুই দশকে আমরা চারটি জাতীয় সংসদ পেয়েছি। ধারাবাহিকভাবে আগের সংসদের চেয়ে পরের সংসদের কার্যকারিতা কম। পঞ্চম জাতীয় সংসদে কার্যদিবস ছিল ৩৯৫ দিন, এর মধ্যে সংসদনেতা (খালেদা জিয়া) উপস্থিত ছিলেন ২৫৬ দিন এবং বিরোধী দলের নেতা (শেখ হাসিনা) ১১৯ দিন। সপ্তম সংসদে মোট কার্যদিবস ছিল ৩৮৫ দিন। এর মধ্যে সংসদনেতা (শেখ হাসিনা) উপস্থিত ছিলেন ২৯৮ দিন (৭৭ দশমিক ৮১ শতাংশ), বিরোধী দলের নেতা (খালেদা জিয়া) উপস্থিত ছিলেন মাত্র ২৮ দিন (৭ দশমিক ৩১ শতাংশ)। ষষ্ঠ সংসদের হিসাব এখানে দেওয়া যৌক্তিক হবে না। বিরোধী দলহীন সেই সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র নয় দিন এবং একমাত্র দায়িত্ব ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন। পঞ্চম সংসদে বিরোধী দল (আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য) বর্জন করেছে ১৩৫ দিন (৩৪ দশমিক ১৮ শতাংশ), সপ্তম সংসদ বিরোধী দল (বিএনপি ও অন্যান্য) বর্জন করেছে ১৬৩ দিন (৪২ দশমিক ৫৬ শতাংশ)।
চলতি সংসদের চার বছরে মোট ৩৩৭ কার্যদিবসের মধ্যে বিরোধী দল উপস্থিত ছিল মাত্র ৫৪ দিন। অনুপস্থিত ছিল ২৮৩ কার্যদিবস। আর অষ্টম সংসদের পুরো মেয়াদে ৩৭৩ কার্যদিবসের মধ্যে আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত ছিল ২২৩ দিন, উপস্থিত ছিল ১৫০ দিন। বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া চলতি সংসদে উপস্থিত ছিলেন মাত্র আট কার্যদিবস। অষ্টম সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন ৪৫ কার্যদিবস। (সূত্র: প্রথম আলো, ২৭ জানুয়ারি, ২০১৩)
বিরোধী দলের অভিযোগ, তাদের কথা বলতে দেওয়া হয় না বলে তারা সংসদে যায় না। এটি অত্যন্ত খোঁড়া যুক্তি। সংসদে কথা বলতে না দিলে তারা সেখানে গিয়ে অবস্থান ধর্মঘট করুক। প্রয়োজনে সাংসদেরা অনশন করুন। সংসদ তো শুধু সরকারি দলের নয়। কথা বলতে না দেওয়ার জন্য যদি বিএনপি সংসদ বর্জন করে, তাহলে রাজপথও বর্জন করা উচিত। কেননা, সেখানেও সরকারের পুলিশ বাহিনী তাদের বাধা দিচ্ছে, পেটাচ্ছে। মামলা দিয়ে নেতাদের হয়রানি করছে, জেলে পুরছে। সরকারের অত্যাচার-নির্যাতনের প্রতিবাদ জানাতেও তো বিরোধী দলের সংসদে যাওয়া উচিত। কিন্তু তারা যাচ্ছে না, যাবে না। আসলে বিরোধী দল সরকারের ‘পরম বন্ধু’ হিসেবেই তাদের একতরফা সংসদ ও দেশ চালানোর সুযোগ করে দিচ্ছে। বিএনপির আমলে আওয়ামী লীগও একই কাজ করত।
পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক দেশে এভাবে সংসদ বর্জনের উদাহরণ নেই। এমনকি যে পাকিস্তানে গণতন্ত্র নেই বলে অনেকে দাবি করেন, সেখানেও বিরোধী দল সংসদ বর্জনের মতো আত্মঘাতী কাজে লিপ্ত হয় না। আমরা সংসদীয় গণতন্ত্র চাই, অথচ সংসদ কার্যকর হোক, তা চাই না; জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সেখানে আলোচনা হোক, তা আশা করি না। বিরোধী দল বলেছে, জনগুরুত্বপূর্ণ শত শত বিষয়ে তারা স্পিকারকে নোটিশ দিয়েছে, কিন্তু একটি নোটিশ নিয়েও আলোচনা করা হয়নি। স্পিকার বলেছেন, নোটিশ দিয়ে নোটিশদাতা সংসদে অনুপস্থিত থাকলে আলোচনা সম্ভব নয়। গত শুক্রবার বিরোধী দলের চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক এক অনুষ্ঠানে চলমান রাজনৈতিক সংকট মোচনে স্পিকারের সহায়তা চেয়েছেন। জবাবে স্পিকার আবদুল হামিদ বলেছেন, সংসদের বাইরে তাঁর কিছু করার নেই। বিরোধী দল সংসদে আসুক, তাদের যা কথা আছে বলুক, কেউ বাধা দেবে না। কিন্তু ফারুক সাহেবেরা এতে সন্তুষ্ট নন। তাঁরা চাইছেন আগে তত্ত্বাধায়ক সরকারের বিল আনা হোক, তারপর তাঁরা সংসদে যাওয়ার চিন্তা করবেন। অদ্ভুত আবদার! গতকাল জাতীয় সংসদে বছর শুরুর অধিবেশন বসেছে যথারীতি বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে। এই অধিবেশনে তারা যাবে, তার নিশ্চয়তা নেই। তারা তখনই সংসদে যাবে, যখন না গেলে সদস্যপদ হারাতে হয়। সংসদীয় গণতন্ত্রের নামে বিরোধী দলের এই কানামাছি খেলা কত দিন চলবে?
গণতন্ত্রের মূল কথা যেখানে আলোচনা ও যক্তি-তর্ক, সেখানে আমাদের সরকারি ও বিরোধী দল উভয়ে তর্ক এড়িয়ে চলে, আলোচনা করতে তাদের সীমাহীন অনীহা। কোনো পক্ষই এখন আর ‘বর্তমান সংসদ’ নিয়ে ভাবছে না। ভবিষ্যৎ সংসদে কীভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া যায়, তার হিসাব কষছে। সংসদের পেশাদার রাজনীতিকদের সংখ্যা যত কমে যাচ্ছে, ততই বাড়ছে ব্যবসায়ী-শিল্পপতি ও সাবেক সামরিক-বেসামরিক আমলাদের সংখ্যা। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমান সংসদের সাধারণ আসনের ৩০০ সদস্যের মধ্যে ১৫৬ জনই ব্যবসায়ী (সূত্র: নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের তথ্যাবলি, প্রথমা, সুজন)। স্বভাবতই এই ব্যবসায়ী কাম সাংসদেরা সংসদের চেয়ে সচিবালয়ে কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তদবির করতে ব্যস্ত থাকেন।
প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী প্রতিভা বসু লিখেছিলেন, ‘স্মৃতি সতত সুখের।’ আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্রেও অতীতকে অধিক মধুর ও স্বপ্নময় মনে হয়। স্বাধীনতার পর গণপরিষদে সংবিধান ও জাতীয়তা নিয়ে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার যুক্তি ও তথ্যনির্ভর বক্তৃতা ইতিহাসের অনন্য দলিল হয়ে আছে। এমনকি জিয়া ও এরশাদের ক্ষমতাহীন দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংসদেও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উত্তপ্ত আলোচনা হতো। দ্বিতীয় জাতীয় সংসদে ৩৯ জন সাংসদ নিয়ে আওয়ামী লীগ তৎকালীন সরকারকে ব্যতিব্যস্ত রাখত। এরশাদ বিরোধী দলকে মোকাবিলা করতে না পেরে দেড় বছরের মাথায় তৃতীয় জাতীয় সংসদ ভেঙে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। আর এখন বিরোধী দল সংসদে যাওয়াকেই কবিরা গুনাহ মনে করে।
খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের আমলে বিরোধী দলের সাংসদদের পদত্যাগের আগ পর্যন্ত প্রাণবন্ত বিতর্কে সংসদ তপ্ত থাকত। ১৯৯২ সালের এপ্রিলে গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে বিরোধী দল লাগাতার সংসদ বর্জন করে। এ অবস্থায় তাদের সংসদে ফিরিয়ে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং সংসদকে কার্যকর করতে ৩০ জুন দুই পক্ষ একটি যৌথ ঘোষণায় সই করে। এখন বিএনপির নেতারা যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলছেন। অথচ সেদিন তাঁরা দেশের প্রচলিত আইনে গোলাম আযমের বিচার এবং গণ-আদালতের উদ্যোক্তা ২৪ জন বিশিষ্ট নাগরিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের লিখিত অঙ্গীকার করেছিলেন। পরবর্তীকালে অবশ্য বিএনপি সেই অঙ্গীকার রাখেনি। গেলবার আওয়ামী লীগ সংসদ কার্যকর করতে ১৯৯৭ সালের ১৪ জানুয়ারি এবং ১৯৯৮ সালের ২ মার্চ দুই দফায় বিরোধী দলের সঙ্গে চুক্তি সই করেছিল। পঞ্চম ও সপ্তম সংসদে বিরোধী দলের উল্লেখযোগ্য আসন ছিল। কিন্তু অষ্টম ও নবম সংসদে ক্ষমতাসীনদের ভূমিধস বিজয়ে সংসদেও ভূমিধস অবস্থার সৃষ্টি হয়। সরকারি দল ভাবতে থাকে, সংসদে যেহেতু বিরোধী দলের মুষ্টিমেয় সদস্য আছেন, সেহেতু তাঁদের ছাড়াই সংসদ চলতে পারে। আর বিরোধী দলের ভাবনা হলো, সংসদে নয়, রাজপথেই সব প্রশ্নের মীমাংসা করা হবে।
জাতীয় সংসদে না গিয়েও বিরোধী দলের সাংসদেরা কত টাকা বেতন-ভাতা নিয়েছেন, কী কী সুবিধা ভোগ করছেন, সে নিয়ে গতকাল প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলোয়। এমনকি তাঁরা একে অন্যায় মনে করেন না। ভাবখানা এমন যে সরকারি দলের সাংসদদের মতো তাঁদের রেন্টাল, কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, বেসরকারি ব্যাংক-বিমা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুযোগ নেই। অতএব, নগদ যা পাও, হাত পেতে নাও। জনগণের করের অর্থে তাঁদেরও হিস্যা আছে। কেবল নেই সাংসদ হিসেবে জনগণের প্রতি ন্যূনতম দায়িত্ববোধ। প্রধান দুই দলের ঝগড়ার মাঝে সাবেক স্বৈরশাসক এরশাদ নিজের দাম বাড়াতে মাঝেমধ্যেই মহাজোট ত্যাগের হুংকার ছাড়েন। কিন্তু তিনি মহাজোট ছাড়তে পারবেন না। মামলার ভয় যেমন আছে, তেমনি আছে নতুন ব্যাংক ও ব্যবসা-বাণিজ্যের লোভও।
সংসদ বর্জন করলেও বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ঠিকই হাতিয়ে নিচ্ছেন বিরোধী দলের সাংসদেরা। এমনকি সংসদে না গিয়ে দৈনন্দিন যাতায়াত ভাতা পর্যন্ত তুলে নিচ্ছেন। এটি কেবল অনৈতিক নয়, বেআইনিও। সংসদের ছাপানো ফরমে সই দিয়েই তাঁদের বেতন-ভাতা নিতে হয়। একজন অনুপস্থিত সাংসদ কী করে সেই ফরমে সই দেন?
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪৮ মাসে বিরোধী দলের সাংসদেরা বেতন বাবদ ১৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকা পেয়েছেন। সংসদে অনুপস্থিত থেকেও তাঁরা ভাতা তুলেছেন ৪১ লাখ ১২ হাজার টাকা। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকের দাবি, বিএনপি অতিরিক্ত বা অনৈতিক সুবিধা নিচ্ছে না। সংবিধান অনুযায়ী যা প্রাপ্য, সেটাই নেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু বিরোধীদলীয় চিফ হুইপকে সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করতে চাই, যে ভোটাররা ভোট দিয়ে তাঁদের সংসদে পাঠিয়েছেন, তাঁদের প্রতি কি তাঁরা সুবিচার করছেন? যদি না করে থাকেন, তাহলে তাঁদের উচিত হবে সংসদে অনুপস্থিত থেকে সাংসদ হিসেবে যে অর্থ তাঁরা জনগণের কাছ থেকে নিয়েছেন, তা অবিলম্বে ফেরত দেওয়া।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

No comments

Powered by Blogger.