মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার-১৮ বুদ্ধিজীবীর খুনি আশরাফ ও মাঈন-গ্রেপ্তারে আবেদন হচ্ছে

আমেরিকাপ্রবাসী আশরাফুজ্জামান খান ও লন্ডনপ্রবাসী চৌধুরী মাঈনুদ্দিনকে গ্রেপ্তারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ট্রাইব্যুনালে আবেদন জানাতে যাচ্ছে। বর্তমানে প্রবাসী এ দুই বাঙালির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯ জন শিক্ষক, ছয়জন সাংবাদিক ও তিনজন চিকিৎসক হত্যার অভিযোগ এনে তদন্ত সংস্থা গ্রেপ্তারের আবেদন করছে।


ইতিমধ্যে তদন্ত সংস্থা এই দুজনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে। আজ বুধবার এ প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালে দাখিলের জন্য প্রসিকিউশনের কাছে দাখিল করা হবে।
গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার বেইলি রোডে তদন্ত সংস্থার কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত সংস্থার সমন্বয়কারী হান্নান খান এ তথ্য জানান। সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত সংস্থার জ্যেষ্ঠ সদস্য সানাউল হকসহ তদন্ত সংস্থার অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
হান্নান খান বলেন, দুজনকে গ্রেপ্তারের জন্য এরই মধ্যে ইন্টারপোলের সঙ্গে যোগাযোগও শুরু হয়েছে। ইন্টারপোল ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। এর পরও যদি গ্রেপ্তার না করা যায় তাহলে তাঁদের অনুপস্থিতেই বিচারকার্য শুরু হবে। চৌধুরী মাঈনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে মোট এক হাজার ১৫৮ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
তদন্ত সংস্থার সমন্বয়কারী আরো বলেন, আলবদর বাহিনীর ঘাতক চৌধুরী মাঈন উদ্দিন এবং মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্টের ৩(২) ধারা অনুযায়ী ১৮ জন বুদ্ধিজীবীকে অপহরণ, হত্যা ও গণহত্যার অভিযোগে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আশরাফুজ্জামান খান এবং চৌধুরী মাঈন উদ্দিনের নেতৃত্বে আলবদরের একটি সশস্ত্র দল পরিকল্পিতভাবে ঢাকার বুদ্ধিজীবীদের অপহরণ করে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে। সাংবাদিক শহীদুল্লা কায়সারকে সন্ধান করতে গিয়ে বাহাত্তর সালের ৩০ জানুয়ারি মিরপুর বিহারি ক্যাম্পে গিয়ে নিখোঁজ হন তাঁর ভাই প্রখ্যাত সাহিত্যিক জহির রায়হান। স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে সারা দেশে মোট ৯৬৮ জন শিক্ষাবিদ, ২১ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং ৪১ জন আইনজীবীসহ ১০২০ জন বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এ দেশকে মেধাশূন্য করার জন্য বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরাসরি জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের সদস্যরা হাইকমান্ডের নির্দেশে আলবদর বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়ে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে। আলবদর বাহিনীর অপারেশন ইনচার্জ চৌধুরী মাঈনুদ্দিন এবং চিফ এক্সিকিউটর মো. আশরাফুজ্জামান খানের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে ঢাকায় বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। তাঁরা উভয়েই ছাত্রজীবন থেকে ইসলামী ছাত্র সংঘের সক্রিয় সদস্য হিসেবে এবং পরবর্তী সময়ে হাইকমান্ডের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নেন।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, একাত্তর সালের ১০ ডিসেম্বর রাতে দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সিরাজ উদ্দিন হোসেন এবং পিপিআইয়ের চিফ রিপোর্টার সৈয়দ নাজমুল হককে তাঁদের বাসা থেকে অপহরণ করা হয়। ১১ ডিসেম্বর ভোর রাতে দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার চিফ রিপোর্টার আ ন ম গোলাম মোস্তফা, ১২ ডিসেম্বর বিবিসির সংবাদদাতা ও সাবেক পিপিআইয়ের জেনারেল ম্যানেজার নিজাম উদ্দিন আহমদ, ১৩ ডিসেম্বর তারিখে দৈনিক শিলালিপি পত্রিকার সম্পাদিকা সেলিনা পারভীন এবং ১৪ ডিসেম্বর দৈনিক সংবাদের যুগ্ম সম্পাদক ও বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক শহীদুল্লা কায়সারকে অপহরণ করা হয়। একই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক রাশিদুল হাসান, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, ড. আবুল খায়ের, ড. সন্তোষ ভট্টাচার্য, ড. সিরাজুল হক খান, অধ্যাপক ফয়জুল মহি, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, মুনীর চৌধুরী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ মর্তুজাকে অপহরণ করা হয়। ১৫ ডিসেম্বর বিশিষ্ট চক্ষু চিকিৎসক ডা. আলিম চৌধুরী এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বিশিষ্ট কার্ডিওলজিস্ট ডা. ফজলে রাব্বীকে অপহরণ এবং নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। অপহৃত সাংবাদিকদের মধ্যে সেলিনা পারভীনের অর্ধগলিত লাশ রায়েরবাজার বধ্যভূমি থেকে একাত্তর সালের ১৮ ডিসেম্বর পাওয়া যায়। অন্য সাংবাদিকদের লাশের হদিস পাওয়া যায়নি।
হান্নান খান বলেন, মাঈনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে তাঁদের নিজ এলাকা যথাক্রমে ফেনী ও গোপালগঞ্জে তদন্ত করা হয়। একই সঙ্গে এলাকায় তাঁদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির খোঁজ নেওয়া হয়। তাঁদের সম্পদের প্রাথমিক একটি তথ্য তদন্ত সংস্থা সংগ্রহ করেছে।
তদন্ত সংস্থার সূত্র মতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য এবং সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সার ও সিরাজুদ্দীন হোসেনসহ অনেক বুদ্ধিজীবী হত্যায় মাঈনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামানের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

No comments

Powered by Blogger.