রাজনীতি-অভিযোগের খাতায় আ. লীগের ৩০ এমপির নাম by পাভেল হায়দার চৌধুরী

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অন্তত ৩০ জন সংসদ সদস্য এখন অভিযোগের কাঠগড়ায়। এই সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে সুপারিশও করেছেন বিভাগগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত সাত সাংগঠনিক সম্পাদক।


গত ১৫ সেপ্টেম্বর কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে সাংগঠনিক সম্পাদকরা সারা দেশের সাংগঠনিক অবস্থা ও রাজনৈতিক চিত্র তুলে ধরে শেখ হাসিনার কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দেন। সেখানে দলীয় সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের কথা তুলে ধরা হয়।
ঢাকা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদ হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগ বড় রাজনৈতিক সংগঠন। এখানে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা আছে। কোথাও কোথাও এমপি, মন্ত্রী এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টির খবর পেয়েছি। সেগুলো রিপোর্টে উঠে এসেছে।
যে কারণে অভিযুক্ত
এলাকার সঙ্গে সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে জনবিচ্ছিন্নতা, নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক না থাকা, গ্রুপিং ও কোন্দল জিইয়ে রাখা, বিতর্কিত কার্যকলাপ করে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা, এলাকায় না যাওয়া এবং দলীয় কার্যালয়ে সময় না দেওয়াসহ বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়েছে সাংগঠনিক সম্পাদকদের রিপোর্টে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ত্বরিত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছেন তাঁরা। দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা তাঁদের বলেছেন, সংসদীয় দলের আগামী সভায় এই সংসদ সদস্যদের ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা হবে। একাধিক সাংগঠনিক সম্পাদকও কালের কণ্ঠের কাছে এ কথা স্বীকার করেন।
একজন সাংগঠনিক সম্পাদকের অভিমত, এত দিন বিভিন্ন মহল থেকে এই এমপিদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ এসেছে। এই প্রথম দলের নেতারাই দলীয় প্রধানকে অবহিত করেন সংসদ সদস্যদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে। রিপোর্টে তাঁরা বলেন, সারা দেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ব্যক্তিগত স্বার্থ, আধিপত্য বিস্তার, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিভক্তির মধ্যে পড়ে রাজনীতিতে দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে ঐতিহ্যবাহী এই রাজনৈতিক দলটি।
সাংগঠনিক সম্পাদকদের রিপোর্টে অভিযুক্তরা : গোলাম মাওলা রনি (পটুয়াখালী-৩), আবদুর রহমান বদি (কক্সবাজার-৪), এম আবদুল লতিফ (চট্টগ্রাম-১০), আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু (চট্টগ্রাম-১২), গিয়াসউদ্দিন আহমেদ (ময়মনসিংহ-১০), গোলাম ফারুক খন্দকার প্রিন্স (পাবনা-৫), সারাহ বেগম কবরী (নারায়ণগঞ্জ-৪), ডা. আনোয়ার হোসেন (পিরোজপুর-৩), আবদুল ওদুদ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩), জাকির হোসেন (কুড়িগ্রাম-৪), সোলায়মান হক জোয়ার্দার সেলুন (চুয়াডাঙ্গা-১), জয়নাল আবেদীন (মেহেরপুর-১), শাহরিয়ার আলম (রাজশাহী-৬), ইসহাক হোসেন তালুকদার (সিরাজগঞ্জ-৩), শেখ আফিল উদ্দিন (যশোর-১), কবিরুল হক (নড়াইল-১), মিজানুর রহমান খান দীপু (ঢাকা-৩), মোজহারুল হক প্রধান (পঞ্চগড়-১), মোয়াজ্জেম হোসেন রতন (সুনামগঞ্জ-১) ও সানজিদা খানমসহ (ঢাকা-৪) ঢাকা মহানগরীর বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য এই তালিকাভুক্ত হয়েছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
ঢাকা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদ হোসেন কালের কণ্ঠকে জানান, সাংগঠনিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্তরে যেসব সমস্যা রয়েছে এবং যেসব কারণে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে সেসব বিষয়ও রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছে। ঢাকা বিভাগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ বিভাগের সমস্যা সমাধান করে দলকে গতিশীল করাই মূলত এই রিপোর্ট ও সুপারিশের লক্ষ্য। তিনি বলেন, বড় দল হওয়ায় আওয়ামী লীগে মন্ত্রী, এমপি, স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা রয়েছে। এসব বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছে। রিপোর্ট ও সুপারিশ আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর আলোকে তিনি কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। জটিলতা দেখা দিলে তিনি ব্যবস্থা নেবেন। ঢাকা বিভাগে ১৮টি জেলা রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি জেলায় অনেক রকম সমস্যা রয়েছে।
সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ বলেন, সব বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদকরা নিজ নিজ বিভাগের সাংগঠনিক অবস্থা তুলে ধরে একটি রিপোর্ট দিয়েছেন। সাংগঠনিক জেলাগুলোতে কিছু নেতিবাচক দিক রয়েছে। যেমন- নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা, নেতা-কর্মীদের প্রতি কারো কারো অসহযোগিতামূলক আচরণ ইত্যাদি বিষয় উঠে এসেছে।
রংপুর বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী জানান, সব বিভাগের ওপর জমা দেওয়া রিপোর্টের ভিত্তিতে দলীয় সভাপতি সাংগঠনিক সম্পাদকদের কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। এখন সে অনুযায়ী সাংগঠনিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে দলকে ঢেলে সাজানোর কথা জানিয়ে তিনি বলেন, সাংগঠনিক সব সমস্যা দূর করে দলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সাংগঠনিক সম্পাদকদের রিপোর্টে সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠে আসার কথা স্বীকার করে চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক বীর বাহাদুর বলেন, আমি দায়িত্ব নিয়েছি খুব বেশি দিন হয়নি। তবু বিভিন্ন জেলা ঘুরে সাংগঠনিক যে চিত্র দেখেছি তা রিপোর্টে তুলে ধরেছি। বিভিন্ন জায়গায় দলাদলি ও কোন্দল রয়েছে। এগুলো নিরসন জরুরি বলে জানিয়েছি। চট্টগ্রাম মহানগরে যে রাজনৈতিক অবস্থা চলছে তা তুলে ধরে শেখ হাসিনাকে আমি বলেছি, মহানগরীর সমস্যা সমাধানে কাউকে দায়িত্ব না দিয়ে আপনি নিজে এর সমাধান করুন। শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের রাজনীতি নিজে দেখভাল করবেন বলেও জানিয়েছেন।
রাজশাহী বিভাগের দায়িত্বে থাকা সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, সংসদ সদস্য আর দলের নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করতে কাজ করছি। দলীয় সভাপতির কাছে দেওয়া রিপোর্টে সংসদ সদস্য এবং দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করার কথা বলেছি। তিনি জানান, তাঁর বিভাগে বগুড়া জেলায় কোন্দল বেশি। অন্য জেলাগুলোর সমস্যা সমাধানযোগ্য। প্রসঙ্গক্রমে তিনি আরো জানান, দলীয় ফোরামের বাইরেও এমপিদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে একটি রিপোর্ট তৈরি করছে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

No comments

Powered by Blogger.