মুসলিম বিধবার অধিকার by আকরামুল ইসলাম

বিধবা মানেই যেন অবহেলিত ও অসহায় কোনো নারীর মুখ। সর্বদা স্বামী হারানোর যন্ত্রণায় মনের মাঝে একাকিত্বের দহন। নিরাভরণ দেহে সাদা শাড়ির আচলে মুখ ঢেকে নির্জনে একাকী বসবাস। কখনো অপবাদ বয়ে বেড়ানোর যন্ত্রণা কিংবা অপমান, লাঞ্ছনা আর বঞ্চনা সহ্য করার যাতনা।


বিধবা হলে দরিদ্র নারী হন আরও দরিদ্র কিংবা টাকা-পয়সার অভাব না থাকলেও আচার-আচরণ দ্বারা প্রতি মুহূর্তে মনে করিয়ে দেওয়া হয়, তিনি একজন বিধবা। সমাজের বক্র চোখের তীক্ষ চাহনির কারণে তাঁর সাধারণ হাসিও বাকা বলে গণ্য। আপন ঘর কিংবা আপন সন্তানের সংসার থেকে বিতাড়িত বিধবাদের মাথা গোঁজার শেষ ঠিকানা কখনো হয়ে উঠে বৃদ্ধাশ্রম। কুসংস্কার আর মিথ্যা অজুহাতের নিত্য বিধানের বেড়াজালে তাঁদের করা হয় আবদ্ধ, অজ্ঞতার অভাবে বঞ্চিত করা হয় ন্যায্য উত্তরাধিকার থেকে অথবা শেষ বয়সে ভরণপোষণের অভাবে দারিদ্র্যের কশাঘাতে পার করতে হয় বাকি জীবন। অথচ আমাদের প্রচলিত আইনে বিধবাদের প্রতি সমান সুযোগ-সুবিধার বিধান রাখা হয়েছে।

বাসস্থানের অধিকার
স্বামীর মৃত্যুর পর সদ্য বিধবার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বাসস্থানের। স্বামীগৃহ, যা তিনি বিয়ের পর থেকেই নিজ ঠিকানা হিসেবে ভাবতে শিখেছেন, স্বামীর মৃত্যুর পর রাতারাতি অচেনা হয়ে যান। শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাঁকে বোঝা হিসেবে গণ্য করে। আবার কখনো কোনো রকমে ঠাঁই হলেও তাঁর মর্যাদা চাকরের চাইতে বেশি হয় না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাঁকে কিছুদিনের মধ্যে বিতাড়িত হতে হয় অথবা অবস্থা এমন হয় যে সেখানে থাকতে মন চায় না। আবার বাবার বাড়িতে যে ফিরে যাবেন, তা-ও অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না।
জোরপূর্বক তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া যাবে না। তবে ইদ্দতকালীন সময় পার করার পর তিনি যদি অনত্র যেতে চান, সে ক্ষেত্রে কোনো বাধানিষেধ নেই। প্রাপ্ত সম্পত্তি নিয়ে তিনি সন্তানসহ বাবার বাড়িতে বা অন্য কোথাও থাকতে পারবেন। সন্তানদের তত্ত্বাবধানের ক্ষমতাও একজন বিধবার রয়েছে। একজন বিধবা অন্যত্র বিয়ে না করলে তার সন্তানদের তত্ত্বাবধান করার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন না।

সর্বাবস্থায় উত্তরাধিকারী
স্বামীর মৃত্যুর কারণে কোনো স্ত্রী পরিত্যক্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হন না। কিন্তু অনেকেই বলে থাকেন, বিধবার জন্য স্বামীর সহায়-সম্পত্তিতে কোনো অংশ রাখা হয়নি এবং আদালতের মাধ্যমেও বিধবার অধিকার আদায়ের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। আসলে এটি একটি ভুল ধারণা। মুসলিম আইনে স্ত্রীকে ওই সমস্ত উত্তরাধিকারদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাদের উত্তরাধিকার কোনো অবস্থাতেই বাতিল হয় না। স্ত্রীকে সর্বাবস্থায় (বিবাহকালীন বা বিধবা, যেকোনো সময়) স্বামীর সম্পত্তিতে সন্তান থাকা অবস্থায় ১/৮ এবং সন্তান না থাকলে ১/৪ অংশের উত্তরাধিকারী করেছে। তাই কেউ বিধবাকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করতে চাইলে কিংবা তাঁর সম্পত্তি দখল করে নিলে তিনি দেওয়ানি আদালতে কিংবা ফৌজদারি আদালতে মামলা করতে পারবেন।


পুনর্বিবাহের অধিকার
মুসলিম আইনে কোথাও কোনো নারীকে বিধবা হিসেবে একাকী জীবন কাটানোর বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়নি। বিধবা তাঁর স্বামীর মৃত্যুর পর ইদ্দতকালীন (চার মাস ১০ দিন) সময় পার করার পর নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী অন্য সাধারণ নারীর মতো স্বাভাবিক স্বাধীন জীবন যাপন করতে পারবেন। তাঁর জীবন কীভাবে নির্বাহ হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং প্রয়োজন মনে করলে পছন্দ অনুযায়ী আবার বিয়ে করে নতুন জীবন শুরু করতে পারবেন। তিনি যদি বিয়ে না করতে চান, সে ক্ষেত্রেও জোরজবরদস্তি করা যাবে না।

দেনমোহরের অধিকার
বিয়ের সময় স্বামীর পক্ষ থেকে যে দেনমোহর প্রদান করা হয়, তার ওপর কেবল স্ত্রীর অধিকার রয়েছে। স্বামীর মৃত্যু হলে বিধবা বিলম্বিত দেনমোহর আদায় করার জন্য আদালতে মামলা করতে পারবেন। এমনকি তা পরিশোধ না করা পর্যন্ত তিনি স্বামীর পরিত্যক্ত সম্পত্তি দখল করে রাখতে পারবেন। বিলম্বিত দেনমোহর ঋণের মতো, মৃতের উত্তরাধিকারীরা তা পরিশোধ করতে বাধ্য। পরিশোধ না করা হলে স্বামীর মৃত্যুর তিন বছরের মধ্যে মামলা করে তিনি তা আদায় করতে পারবেন। দেনমোহরের জন্য মামলা পারিবারিক আদালতে দায়ের করতে হয়।

ভরণপোষণের অধিকার
স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত অংশ একজন বিধবা স্বাধীনভাবে ব্যবহার করতে পারবেন। আইনে বিধবার ভরণপোষণের ব্যাপারে কারও ওপর বাধ্যবাধকতা আরোপ না করা হলেও তা অবধারিতভাবেই সন্তানদের ওপর বর্তায়। সন্তানেরা তাদের সাধ্যমতো ভরণপোষণ করার ব্যাপারে নীতিগতভাবে বাধ্য। সন্তান-সন্ততি না থাকলে আবার পিতা-মাতাকেও তাঁদের বিধবা মেয়ের ভরণপোষণ প্রদান করা নৈতিক দায়িত্ব।

স্বাভাবিক জীবন যাপনের অধিকার
আমাদের দেশে শিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত সব পরিবারেই বিধবাদের আলাদা নজরে দেখা হয়। খাওয়া-দাওয়া, চলাফেরাসহ জীবন যাপনে আরোপ করা হয় বিভিন্ন বিধিনিষেধ। অথচ আইনের বিধিবিধান সধবা, বিধবা কিংবা কুমারী—সব নারীর প্রতিই সমানভাবে প্রযোজ্য। মূলত আদিকাল থেকে প্রচলিত বিভিন্ন কুসংস্কারের কারণেই বিধবারা এ রকম বৈষম্যের শিকার হয়ে থাকেন। স্বামীর মৃত্যুর কারণে বিধবাদের নিরামিষ খাওয়া কিংবা সাদা শাড়িতে জীবন কাটানোর মতো আলাদা বিধিবিধান কখনোই আইন সমর্থন করে না। একজন বিধবাকে আলাদাভাবে না দেখে তাঁর সঙ্গে সৌহার্দমূলক ও সদ্ভাব বজায় রাখা উচিত, যাতে করে তিনি একজন সাধারণ নারী হিসেবেই জীবন যাপন করতে পারেন।

No comments

Powered by Blogger.