সময় থাকতে ঘাটতি মেটান, পুষ্টি জোগান- খাদ্যনিরাপত্তায় অশনিসংকেত

যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ। বাংলাদেশের খাদ্য-পরিস্থিতিতে অশনিসংকেত দেখা যাচ্ছে। বৈশ্বিক খাদ্যবাজারে আবার ২০০৮ সালের মতো সংকটের আভাস দেখা যাচ্ছে। দেশে চালের মজুদ মোটামুটি ভালো হলেও বৃষ্টি কম হওয়ায় এ বছর আমনের উৎপাদন কমতে পারে।


বৈশ্বিক দাম বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ ঘাটতি মিলিয়ে তাই নিশ্চিন্ত থাকার কারণ নেই।
বাংলাদেশ খাদ্যের জোগানে মোটামুটি ভালো করলেও পুষ্টির ঘাটতি হতাশাজনক অবস্থায়। এরই প্রতিফলন ঘটেছে যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সাময়িকী দি ইকোনমিস্ট-এর খাদ্যনিরাপত্তা প্রতিবেদনে। এ প্রতিবেদন অনুসারে, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করায় দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থানই সবার নিচে। এমনকি উগান্ডা, কেনিয়া, নেপাল ও মিয়ানমারের চেয়েও নাজুক। দি ইকোনমিস্ট-এর গবেষণা শাখা ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ১০৫টি দেশের খাদ্য ক্রয়ক্ষমতা, সহজপ্রাপ্যতা ও গুণগত মান এবং নিরাপদ খাদ্যের জোগানের সাপেক্ষে খাদ্যনিরাপত্তার পরিমাপ করে থাকে। এ তিনটি সূচকেই বাংলাদেশের অবনতি ঘটেছে।
খাদ্যনিরাপত্তার জরুরি অঙ্গ হলো, খাদ্যের পুষ্টি ও গুণগত মান। বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যের ৬০ শতাংশই হচ্ছে ভাত। অধিকাংশ মানুষের খাদ্যের তালিকায় মাছ-মাংস, শাকসবজি, দুধ-ডিম বিরল। এই অপুষ্ট জনগোষ্ঠীর শারীরিক-মানসিক বিকাশ দুর্বল এবং তারা রোগব্যাধির সহজ শিকার। লক্ষ করলে দেখা যাবে, এসব কারণে বাংলাদেশের মানুষের ওজন ও উচ্চতা—দুটোই বাড়তে পারছে না। অন্যদিকে, ভেজাল, রাসায়নিকের ব্যবহার এবং উচ্চফলনশীল প্রযুক্তির কারণেও স্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় ঘটে চলেছে; বাড়ছে নতুন-পুরোনো বিভিন্ন রোগের প্রকোপ।
অতীতে বাড়ির সামনে-পেছনে শাকসবজি চাষ, হাঁস-মুরগিসহ গবাদিপশু পালন এবং উন্মুক্ত খাল-বিল-জলাশয়ের মাছ দিয়ে গরিব মানুষ আমিষের চাহিদা মেটাত। কিন্তু এখন সেই সুযোগ সীমিত। সবজি বা ডিম বা মাছ-মুরগির জন্য বাজারের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার ক্রয়ক্ষমতা অধিকাংশেরই নেই। খাদ্যব্যবস্থা পুরোপুরি বাজারের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এবং সেই বাজার খাদ্য উৎপাদক ও দরিদ্রদের জন্য প্রতিকূল হওয়ায় সাধারণ মানুষ অসহায় হয়ে পড়ছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপটে কৃষক উপযুক্ত মূল্য না পেলেও খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। সরকারও কেবল চালের ওপর জোর দিয়ে অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাবারের বিষয়ে উদাসীন। এসব কারণের যোগফলই হলো জাতীয়ভাবে পুষ্টিবিপর্যয়।
বিশ্বের খাদ্যপরাশক্তি আমেরিকায় এ বছর খরার জন্য গমের ফলন মার খেয়েছে। ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার অবস্থাও ভালো নয়। বন্যার জন্য ব্রাজিলের আখের ফলনের ক্ষতি হয়েছে। রাশিয়ার অবস্থাও তথৈবচ। এসবের প্রভাবে বিশ্ববাজারে খাদ্যের দামও বাড়ছে। এর অর্থ হচ্ছে, বাংলাদেশকে আগামী দিনে বেশি দামে খাদ্য কিনতে হবে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশকে গম কেনায় টনপ্রতি ৫৫ ডলার বেশি ব্যয় করতে হয়েছে।
এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসায় ধান-চালের উৎপাদন বজায় রাখার পাশাপাশি বণ্টনে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে হবে। সবজি, মাছ, ডিমসহ আমিষের উৎপাদন বাড়াতে হবে। সর্বোপরি খাদ্যপ্রাপ্তিকে সুযোগ হিসেবে না দেখে অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম—এমন একটি জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা নীতি প্রণয়ন করতে হবে।

No comments

Powered by Blogger.