পুরো সরস্বতীপুর কাঁদছে, সান্ত¡না দেয়ার ভাষা নেই কারও- বজ্রপাতে ১৩ জনের মৃত্যু

নেত্রকোনা/ মোহনগঞ্জ, ১১ আগস্ট ॥ একসঙ্গে এত মানুষের মৃত্যু কোনদিন দেখেনি সরস্বতীপুর গ্রামের মানুষ। পিতার সঙ্গে পুত্র, ভাইয়ের সঙ্গে ভাইসহ এক গ্রামের মোট ১৩ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুতে হাওড় জনপদের পুরো গ্রামই যেন কাঁদছে। বাড়িতে বাড়িতে শোকের মাতম। লাশের ওপর পড়ে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে স্বজনহারা মানুষ।


কেউ কাউকে সান্ত¡না দেয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। আর্তনাদে ভারি হয়ে উঠেছে গ্রামের আকাশ-বাতাস। শনিবার সারাদিন এমন দৃশ্যই দেখা গেছে ওই গ্রামে।
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার জয়শ্রী ইউনিয়নের একটি গ্রাম সরস্বতীপুর। শুক্রবার রাতে প্রতিদিনের মতো অর্ধশত মুসল্লি তারাবির নামাজ পড়ছিলেন ওই গ্রামের দক্ষিণপাড়ার বেলগাছিয়া বাড়িতে স্থাপিত একটি অস্থায়ী টিনশেড মসজিদে। রাত পৌনেন’টার দিকে নামাজ শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ আগে ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়। এরপর হঠাৎ একটি ‘বজ্রপাত’ হয় মসজিদের ওপর। আকস্মিক এ ঘটনায় একসঙ্গে লাশ হয়ে যান মসজিদের ইমামসহ ১৩ জন। যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকেন আরও অনেকে। তাঁদের চিৎকারে ছুটে আসেন গ্রামবাসী। মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে প্রথমে কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে পড়েন তাঁরা। পরে হতাহতদের ধরাধরি করে ট্রলারে উঠিয়ে রওনা দেন ধর্মপাশা সদরে। প্রায় দু’ঘণ্টা হাওড় পারি দিয়ে ট্রলারগুলো এসে থামে ধর্মপাশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কাছে। এরপর নিহতদের চিহ্নিত করে রাতেই তাদের গ্রামে পাঠিয়ে দেয়া হয়। আহতদের ভর্তি করা হয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
শনিবার ভোর থেকে ধর্মপাশা উপজেলা সদরসহ আশপাশের গ্রামের হাজার হাজার মানুষ এসে জড়ো হতে থাকে ওই গ্রামে। দুপুরে হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে সরস্বতীপুর গ্রামের মাদ্রাসা মাঠে এবং স্থানীয় জামে মসজিদে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাদের লাশ স্থানীয় গোরস্তানে দাফন করা হয়। দুপুরে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা মোয়াজ্জেম হোসেন রতন, সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোঃ ইয়ামিন চৌধুরী, সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মকবুল হোসেন, পুলিশ সুপার নূরে আলম মিনা, ইউএনও শহীদুল ইসলাম এবং প্রশাসনের উর্ধতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং নিহতদের স্বজনদের সান্ত¡না দেন।
ইউএনও শহীদুল ইসলাম জানান, শনিবার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে পাঁচ হাজার টাকা করে নগদ দেয়া হয়েছে। এছাড়া রবিবার প্রত্যেককে আরও ১৫ হাজার টাকা করে দেয়া হবে। আহতদের চিকিৎসার জন্যও সহযোগিতার করা হচ্ছে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে।
এদিকে বাবার জন্য ছেলে-মেয়ের, ছেলের জন্য বাবা-মায়ের, স্বামীর জন্য স্ত্রীর, ভাইয়ের জন্য ভাই-বোনদের এবং পাড়া-প্রতিবেশীদের সম্মিলিত কান্নায় সরস্বতীপুর গ্রামে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা ঘটে।
একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলে হযরতকে (৩০) হারিয়ে বিলাপ করতে করতে বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন তার মা কল্পনা আক্তার ও বাবা কাছম আলী। হযরতের আয়েই চলত তাঁদের সংসার। একই বাড়ির আপন দুই ভাই (হযরতের চাচা) তাহের মিয়া (৫০) ও মানিক মিয়াও (৫২) মারা গেছেন ওই মর্মান্তিক ঘটনায়। একসঙ্গে তিনজনের মৃত্যুতে শোকে পাথর হয়ে গেছে বাড়িটি। জাল বেয়ে সংসার চালাত মজম্মিল আলী (২৫)। তাঁর সঙ্গে মারা গেছেন তাঁর বাবা আব্দুল গফুরও (৬০)। স্বামী ও ছেলেকে রীতিমতো পাগল হয়ে গেছেন রাবেয়া আক্তার। তাঁকে কোনভাবেই সামলাতে পারছেন না কেউ। একই দৃশ্য নিহতদের প্রত্যেকটি বাড়িতে। কান্নার শব্দে ভারি করে তুলেছে গোটা এলাকার পরিবেশ।
নিহতদের নাম ॥ মসজিদের ইমাম হাফেজ শাহাব উদ্দিন, নূরুল ইসলাম, রিপন মিয়া, তাহের মিয়া, মানিক মিয়া, হযরত আলী, নজরুল ইসলাম, আব্দুল গফুর, মজম্মিল আলী, নূর ইসলাম, আনোয়ার হোসেন, বাদশা ও আব্দুস সালাম। এঁদের মধ্যে ইমাম হাফেজ শাহাব উদ্দিনের বাড়ি নেত্রকোনার শ্যামগঞ্জে এবং বাকি প্রত্যেকের বাড়ি সরস্বতীপুর গ্রামে।
আহতদের নাম ॥ বজ্রপাতের ঘটনায় প্রায় ১৭ জন আহত হয়েছে। এর মধ্যে শফিক মিয়া নামে একজনকে শনিবার ধর্মপাশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক। এছাড়া নয়ন মিয়া, রূপচান, জিয়াউর রহমান, জয়নাল আবেদীন, আব্দুল আজিদ, করিম, শুক্কুর আলী, আব্দুল মজিদ, আবু সামা ও আঙ্গুরা খাতুনকে ধর্মপাশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। বাকিরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়িতে চলে গেছেন।

No comments

Powered by Blogger.