ব দ লে যা ও ব দ লে দা ও মি ছি ল-নিরাপদ সড়ক গড়া অবশ্যই সম্ভব by মীর আবদুল গণি

‘বদলে যাও বদলে দাও মিছিল’-এ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ও নির্বাচিত চারটি ইস্যু নিয়ে অব্যাহত আলোচনা হচ্ছে। আজ সড়ক দুর্ঘটনা বিষয়ে মীর আবদুল গণির নিরাপদ সড়ক তোলার বিশ্লেষণাত্মক অভিমতসহ আরও চারজন লেখকের নির্বাচিত মন্তব্য ছাপা হলো।


বাংলাদেশে প্রতিদিন মর্মান্তিক সড়কদুর্ঘটনার জন্য প্রথম প্রশ্নটি আসে, যানবাহন নিয়ন্ত্রণে আমরা সঠিক ব্যবস্থা বা পদ্ধতি অনুসরণ করছি কি? সঠিক ব্যবস্থা বা পদ্ধতি হচ্ছে সুনির্দিষ্ট কিছু নীতিমালা দ্বারা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণ। এমন ব্যবস্থা আমাদের আছে কি না? বা যেটা আছে সেটা সঠিক কি না, অবশ্যই যাচাই বা তুলনা করে দেখতে হবে। আর এরূপ যাচাই বা তুলনা করে দেখার সহজ উপায়ও আছে। কারণ, আধুনিক যানবাহন শুধু আমরাই ব্যবহার করি না, বিশ্বের সব দেশই কমবেশি ব্যবহার করছে। লক্ষ করলে দেখা যাবে, অনেক দেশ আমাদের চেয়ে অধিক নিরাপদেই যানবাহন ব্যবহার করছে। আমরাও তাদের ন্যায় নিরাপদ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে উদ্যোগী হলে এ ক্ষেত্রে সহজ উপায় হবে তারা কী পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে, সেসব জেনে নেওয়া এবং প্রয়োগে নিষ্ঠাবান হওয়া।
বর্তমানে উন্নত দেশগুলোয় যেসব নীতি-ব্যবস্থা বা পদ্ধতি-হাতিয়ার দ্বারা সফলভাবে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, তাদের মধ্যে জার্মানির চিত্রটি এমন, ১. বাধ্যতামূলক যানবাহন বিমা, ২. নিখুঁত ড্রাইভিং শিক্ষা, ৩. আইনি ব্যবস্থা ৪. আধুনিক প্রযুক্তি। এখন দেখতে হবে, আমাদের গৃহীত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় অনুরূপ নীতিমালা বা অবকাঠামো আছে কি না।
বাধ্যতামূলক যানবাহন বিমা: সব দেশেই মূলত এই বিমা কোম্পানি কর্তৃক প্রণীত কিছু নিয়মনীতি দ্বারা সমগ্র যানবাহনব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়। বিমাব্যবস্থার প্রক্রিয়ায় একাধিক প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার সম্পৃক্ততা রয়েছে। যেমন, বিমা কোম্পানি, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ সংস্থা, গাড়ির বিক্রেতা, ক্রেতা-মালিক বা চালক ও ড্রাইভিং স্কুল। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সমঝোতা ও সমন্বয়ে আরোপিত হয় বেশ কিছু দায়বদ্ধতা, মূলত আধুনিক যানবাহন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। ফলে ওই রকম ব্যবস্থার কারণে চালক-মালিক—সবাই সংযতভাবে রাস্তা ব্যবহার করতে বাধ্য হন। উন্নত দেশে দীর্ঘদিন গাড়ি ব্যবহার করেছে—এমন বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একাধিক ব্যক্তি ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে আমাদের যানবাহন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় সব নীতিমালা সংযোজন করতে হবে। কারণ, এসব নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত অনেক বিষয় আছে, যেগুলো একটির সঙ্গে অপরটি এতই সম্পর্কযুক্ত যে যার কোনো একটু ভুল হলে সম্পূর্ণ ব্যবস্থাই ভেঙে পড়বে।
বিমার ভালো দিক সম্পর্কে যানবাহনের মালিক ও চালককে সচেতন করে তুলতে হবে। উন্নত দেশের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য যানবাহনের সংখ্যাগত ও রাস্তার অবকাঠামোগত। রাস্তার অবকাঠামোগত কারণে গতি মন্থর হতে পারে, কিন্তু জননিরাপত্তার গুরুত্ব সর্বত্রই এক ও অভিন্ন। যতটুকু জানি, বাংলাদেশে জার্মানির ট্রাফিক আইন অনুসরণ করা হয়। কিন্তু দুর্ঘটনার ধরন-কারণ জেনে মনে হয় ওসব পুস্তকেই আবদ্ধ, কাউকে ওই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না বা কেউ শেখেও না। সব উন্নত দেশে প্রাইভেটকারের যে মালিক সে-ই চালক। ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে হলে তাঁকেই নির্ভুলভাবে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। ট্রাক বা ভারী বাহনের চালককে বাধ্যতামূলক অতিরিক্ত আরও কিছু প্রশিক্ষণ নিতে হয়। দায়বদ্ধতার আওতায় উপযুক্ত ড্রাইভিং স্কুল অবশ্যই গড়ে তুলতে হবে। উপযুক্ত শিক্ষা না দিয়ে শুধু আইন প্রয়োগ বা শাস্তি দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে সংশোধন বা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়।
ড্রাইভিং শিক্ষা: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট—মালিক একজন, চালক অন্যজন। সে জন্য চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স বৈধ কি না, গাড়ির মালিক অবশ্যই যাচাই করে নেবেন এবং চালকের অ্যাকসিডেন্ট ইন্স্যুরেন্সে মালিককে সম্পৃক্ত করতে হবে। কারণ, মালিকের অবহেলা বা অজ্ঞ চালক নিয়োগের কারণে অন্যজন ক্ষতিগ্রস্ত হবে—এটা মোটেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ক্ষতিপূরণের দায়দায়িত্ব মালিককে অথবা যৌথভাবে উভয়কেই বহন করতে হবে। ইন্স্যুরেন্সের কোম্পানির আইন দ্বারা মালিককে অনুরূপ বাধ্যবাধকতার আওতায় আনতে হবে। ফলে চালক নিয়োগে মালিক সতর্ক হবেন এবং যৌথভাবে ইন্স্যুরেন্সের আওতায় নিয়ে এলে দায়বদ্ধতার কারণে চালকও অধিক সতর্ক হতে বাধ্য হবে। ফলে দুর্ঘটনাও অনেকাংশে হ্রাস পাবে। দুর্ঘটনার পর চালক পালিয়ে গেলেও গাড়ির মালিককে পাওয়া যাবে। আর্থিক ক্ষতিপূরণ মালিকের ইন্স্যুরেন্স দ্বারা প্রদত্ত হবে।
উন্নত দেশে বাংলাদেশের প্রবাসী যাঁরা গাড়ি ব্যবহার করেন (চালক), তাঁরা ইচ্ছা করলে আমাদের দেশের গণপরিবহনের চালকদের সচেতন করে তোলার ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে হলেও বিশেষ অবদান রাখতে পারেন বলে আমার ধারণা। কারণ, আমরা দেখেছি, বাংলাদেশের চালকেরা কী ধরনের ভুল করেন। রাস্তার অবকাঠামগত কারণে কোথায় কী ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন, কোথায় কার অগ্রাধিকার এবং কেউ ভুল করে বিপদের সম্মুখীন হতে যাচ্ছে, এমন পরিস্থিতিতে অপরজনের কী করণীয়। এমন বহু বিষয়ে তাঁরা অজ্ঞ বা মানেন না। যেমন, দুটি যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষ বা গড়িয়ে গিয়ে খাদে পড়ে দুর্ঘটনার কারণ, বলা হয় রাস্তা খারাপ। রাস্তা খারাপ হলে গতি শ্লথ হবে, যন্ত্র বিকল হয়ে যেতে পারে, গাড়ির আয়ু কমে যাবে। কিন্তু মুখোমুখি সংঘর্ষ বা গড়িয়ে গিয়ে খাদে পড়তে পারে না।
এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন সরকার বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে প্রবাসীদের আহ্বান জানানো। কারণ, সেবামূলক হলেও যেহেতু জাতীয় পর্যায়ে সেহেতু রাষ্ট্রীয় বা সংস্থার আহ্বান ও স্বীকৃতি না থাকলে বা না পেলে মালিক ও চালক শুধু প্রবাসীদের আহ্বানে সাড়া দেবেন না। এ জন্য প্রবাসীদের কোনোরূপ সম্মানী দিতে হবে বলে আমি মনে করি না। দেশ-জাতির স্বার্থে প্রবাসীরা খুশি হয়েই হয়তো সেবামূলক এ কাজ করবেন। বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চল থেকেই কেউ না কেউ উন্নত দেশে আছেন এবং গাড়ি ব্যবহার করেন। প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য দেশে এলে তাঁদের শুধু থাকার মতো ব্যবস্থা করে দিলে বা তাঁর এলাকায় তেমন সুবিধামতো স্থানে হলেই অংশগ্রহণ করতে পারবেন।
আইনি প্রক্রিয়া: উন্নত দেশে কেউ ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করলে বা দুর্ঘটনা ঘটালে আর্থিক জরিমানা, পয়েন্ট কেটে নেওয়া বা উভয় জরিমানাসহ সাময়িকভাবে তার ড্রাইভিং লাইসেন্স সাসপেন্ড বা বাতিল করে দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে পুনরায় পরীক্ষা দিয়ে লাইসেন্স করতে হয়। আমাদেরও কঠোরভাবে তেমন আইনি ব্যবস্থা রাখতে হবে। প্রথমে সুশৃঙ্খল নীতিমালার ওপর আমাদের যানবাহন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এরপর কোথাও কোনো ব্যত্যয় ঘটলে সেই ব্যত্যয়টুকু সংশোধনের জন্যই হতে পারে আইনি ব্যবস্থা, যেটা উন্নত দেশগুলো করে থাকে।
আমাদের দেশে অধিকাংশ চালক যেভাবে লাইসেন্স পেয়ে থাকেন, এটা বড়ই অবাক, বিস্ময়কর ও ভয়ংকর ব্যবস্থা। ওই ব্যবস্থায় ট্রাফিক আইন সম্পর্কে চালক সম্পূর্ণ অজ্ঞ থেকে যান। তিনি শুধু শিখে থাকেন, গ্যাস, প্যাডেলে চাপ দিতে এবং স্টিয়ারিং ঘোরাতে। এমন শিক্ষাকে ড্রাইভিং শিক্ষা বলা যায় না। যাঁদের গাড়ি আছে, তাঁদের নিজের জীবনের নিরাপত্তার জন্য হলেও বিষয়টি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। আমার ড্রাইভার দীর্ঘ দিন ধরে গাড়ি চালায়, কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি—এমন মনে করে আত্মতৃপ্তি পাওয়ার কোনোই যুক্তি নেই। কারণ, দুর্ঘটনা যেকোনো একজনের ভুলেই ঘটে থাকে।
আমাদের দেশে চালকের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থায় গাড়ির মালিকপক্ষকেও সম্পৃক্ত হতে হবে। ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণ সংস্থার যৌথ সম্পৃক্তায় প্রশিক্ষণে সতর্ক তদারকের ব্যবস্থা রাখত হবে, যাতে সেখানে কোনো দুর্বলতা স্থান না পায়। কারণ, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি কখনোই চাইবে না ভুয়া লাইসেন্সধারী চালকের কারণে কোম্পানি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হোক। ব্যক্তিমালিকানা বা সংস্থার অধীনে, দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে যুগোপযোগী ড্রাইভিং স্কুল গড়ে তুলতে হবে। উন্নত দেশে এই দায়বদ্ধতা বিশেষ উপায়ে আরোপ করে থাকে। গুরুত্ব দিতে হবে চালকদের মানবিক সক্ষমতাকে। একজন দূরপাল্লার চালক সাত-আট ঘণ্টা গাড়ি চালানোর পর তাঁর যথেষ্ট পরিমাণ বিশ্রামের প্রয়োজন হয়।
কী ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে আমরা আছি, সেই ধারণা পাওয়ার জন্য সংক্ষিপ্ত আকারে বাংলাদেশ ও জার্মানির যানবাহন ও দুর্ঘটনার সংখ্যা তুলনা উল্লেখ করছি: জার্মানির লোকসংখ্যা সাত কোটি ৭০ লাখ। প্রাইভেটকার চার কোটি ২০ লাখ, অন্যান্য যানবাহন এক কোটি ৪০ লাখ। মোট যানবাহনের সংখ্যা পাঁচ কোটি ৬০ লাখ। বছরে দুর্ঘটনার সংখ্যা ১২ হাজার, মৃত্যুর সংখ্যা তিন হাজার ৪০০। এ সংখ্যাও তারা কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে এবং প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য হারে কমেও আসছে।
বিভিন্ন গণমাধ্যম ও আলাপচারিতা সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের লোকসংখ্যা ১৪ বা ১৬ কোটি। তবে জার্মানির প্রায় দ্বিগুণ। বাংলাদেশে যানবাহনের সংখ্যা ৭০ বা ৮০ লাখ (জার্মানির এক সপ্তমাংশ)। বছরে দুর্ঘটনার সংখ্যা অজানা। মৃত্যুসংখ্যা ১২ হাজার, আহত ৩৬ হাজার। বাংলাদেশে আহত-নিহত মোট ৪৮ হাজার। আলাপচারিতায় প্রাপ্ত সংখ্যা যদি সঠিক হয়, তবে প্রতিবছর ৪৮ হাজার পরিবার তার উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে বা তাদের পঙ্গুতের কারণে নিদারুণ মানবেতর জীবনে পতিত হচ্ছে। প্রতিনিয়ত যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছেই, বাড়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ যেকোনো একটি উন্নত দেশের যানবাহন নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি না নীতিমালা অনুসরণ করলে তবেই জনগণের নিরাপদ সড়কের নিশ্চয়তা বিধান করা সম্ভব হবে; যার কোনো বিকল্প নেই।
মীর আবদুল গণি, জার্মানি প্রবাসী, বদলে যাও বদলে দাও মিছিল ব্লগের নিয়মিত লেখক।
ghani@t-online.de

যোগ দিন ফেসবুক পেজে : www.facebook.com/bjbdmichil

জনমত জরিপের ফলাফল
বদলে যাও বদলে দাও মিছিলের ওয়েবসাইটে নতুন তিনটি জনমত শুরু হয়েছে চলতি সপ্তাহে। আপনিও অংশ নিন জরিপে।

সড়ক দুর্ঘটনায় সাধারণ মানুষ নিহত ও আহত হলে ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারি সাহায্য দেওয়া উচিত বলেমনে করেন কি?

 হ্যাঁ ৮৭%  না ৬%
 মন্তব্য নেই ৭%
৩০ মে, ২০১২ পর্যন্ত
আপনি কি মনে করেন, সামাজিক সচেতনতা ও পারিবারিক শিক্ষা ইভ টিজিং কমিয়েআনতে পারে?
 হ্যাঁ ৮৬%  না ৮%
 মন্তব্য নেই ৬%
৩০ মে, ২০১২ পর্যন্ত
বাংলাদেশের কোন টিভি চ্যানেল ভারতে দেখাচ্ছে না। এটা কি সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা বলে মনে করেন?
 হ্যাঁ ৮৭%  না ৮%
 মন্তব্য নেই ৫%
৩০ মে, ২০১২ পর্যন্ত
www.bodlejaobodledao.com

No comments

Powered by Blogger.