যাত্রা তব শুরু হোক-মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠনকে আমরা নীতিগতভাবে স্বাগত জানাই। যদিও আগের মতোই জনমত যাচাই করার সুযোগ সৃষ্টি না করেই একতরফাভাবে এই কমিশন পুনর্গঠিত হলো। কিন্তু আমরা আশাবাদী। কমিশনের কিছু মুখ আমাদের নিশ্চয় ভরসা দিচ্ছে। তবে অন্তত একজন বিতর্কিত ব্যক্তির নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।


কিন্তু বিদ্যমান আইনের কাঠামোর মধ্যে তাঁরা কতটা কী করতে পারবেন, সেটা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
নির্বাচিত সরকার দেড় বছর পার করতে চলল। ২২ জুন পুনর্গঠিত হওয়া সত্ত্বেও সার্বিক বিচারে মানবাধিকার কমিশন এখনো অর্ধেক কল্পনার বস্তু। অথচ সরকার দেশের জনগণকে ও সারা বিশ্বকে বলার চেষ্টা করে যে তারা মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতি তাদের রয়েছে দৃঢ় অঙ্গীকার।
মানবাধিকার কমিশন নিয়ে বর্তমান সরকার এ পর্যন্ত যা যা করেছে, তা আশাব্যঞ্জক নয়। দুদক ও তথ্য অধিকার কমিশনের প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি যদি একটি সংকেত হয়, তাহলে সরকার মানবাধিকার কমিশনকে কার্যকর করতে চায় কি না, সেটা প্রশ্ন হয়ে থাকবে। পুনর্গঠিত কমিশন কাজের মধ্য দিয়ে আস্থা সৃষ্টির পরিস্থিতি সৃষ্টি না করা পর্যন্ত এই সংশয় ঘুচবে না। সরকার একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠান হিসেবে এর একটা অস্তিত্ব বজায় রাখতে চায় কি না, সেই দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকবে। মানবাধিকার কমিশন আগে ছিল তিন সদস্যের একটি স্থায়ী কমিশন। সেই কমিশনকে তারা সাত সদস্যে পরিণত করেছে। কিন্তু এখানে একটা ফাঁক আছে। আগে তিন সদস্য ছাড়া পূর্ণাঙ্গ কমিশন গঠনের কোনো প্রশ্ন ছিল না। সংশোধিত আইনে ন্যূনতম সদস্যসংখ্যা নির্দিষ্ট করা হয়নি। এখন চেয়ারম্যানসহ আর একজন সদস্য পূর্ণকালীন। অন্য পাঁচজনই খণ্ডকালীন ও অবৈতনিক। আইনে এ রকম একটা ভঙ্গুর অবস্থা রাখার যুক্তি আমরা পাই না। এটা কি কমিশনকে অন্তর্গতভাবে দুর্বল রাখার জন্যই নয়?
দেশে জনপ্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিচ্যুতি, পদোন্নতিবঞ্চনা কিংবা অন্যবিধ উপায়ে চাকরিক্ষেত্রে বৈষম্য সৃষ্টির প্রবণতা বাড়ছে। সুতরাং চাকরিক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ একটি বড় বিষয়। অথচ মানবাধিকার কমিশন তা যাতে কোনোক্রমেই না দেখতে পারে, তা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিদায়ী চেয়ারম্যান বিচারপতি আমীরুল কবির চৌধুরীর এই বিধান সংশোধনে যে সুপারিশ রেখেছিলেন, তা যথার্থ।
মানবাধিকার কমিশন নিয়ে এসব সংশয় ও বিভ্রান্তি দূর হবে যদি কমিশনের অর্গানোগ্রাম ও বিধি দ্রুত চূড়ান্ত করা হয়। লোকবল, বিধি ইত্যাদির অভাবে এত দিন কমিশন খুঁড়িয়ে চলছিল। ওই বিধির খসড়া অবশ্য প্রায় ১১ মাস আগে চূড়ান্ত করে সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। আমরা আশা করব, এই বিধি যেন নাটকীয়ভাবে পাস না করা হয়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে এই বিধি করা হলে তাতে নির্বাচিত সরকারের মর্যাদা বাড়বে।
মানবাধিকারের প্রতি সরকারের অগ্রাধিকার সর্বোচ্চ হওয়া কাম্য। দেশে সরকারের প্রতি নির্ভরতাহীন একটি স্বাধীন মানবাধিকার কমিশনের সার্থক ও অর্থবহ অগ্রযাত্রা দেখা জনগণের প্রত্যাশা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও সেটা দেখতে উন্মুখ।

No comments

Powered by Blogger.