নির্যাতিত সাংবাদিকরা অজানা আতঙ্কে by রাব্বী রহমান

ভালো নেই পুলিশের নির্যাতনের শিকার সাংবাদিকরা। তাঁরা চিকিৎসাধীন; বিছানায় শুয়ে যতটা না শারীরিক যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন, তার চেয়ে বেশি ভুগছেন মানসিক যন্ত্রণায়। বিক্ষোভ সমাবেশে বা কোনো মিছিলে সংঘর্ষের ছবি তুলতে গিয়ে গণলাঠিপেটার শিকার হলেও না হয় নিজেদের সান্ত্বনা দিতে পারতেন এই বলে, তাঁরা পরিস্থিতির শিকার।


কিন্তু তাঁদের ওপর যেটা ঘটেছে সেটা ভিন্ন। উদ্দেশ্যমূলক আর পরিকল্পিতভাবে ধরে ধরে পেটানো হয়েছে তাঁদের। আর পিটিয়েছে সেই সব চেনা মুখের পুলিশ, যারা রাজপথে তাঁদের পথের সঙ্গী। কেন, কার নির্দেশে তারা এই বর্বর আচরণ করল- এটাই এখন তাঁদের কাছে বড় প্রশ্ন। গতকাল বুধবার আহত কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বললে তাঁরা তাঁদের এই মানসিক যন্ত্রণার কথা জানান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ফটো সাংবাদিক গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু বলেছেন, তাঁদের নিরাপদ দূরত্বে থেকে কাজ করতে। তাঁরা বিস্মিত এই কথায়। মাঠপর্যায়ে যাঁরা কাজ করেন, তাঁরা নিরাপদ দূরত্বে থেকে কাজ করবেন কিভাবে? এতে করে দুটি জিনিস স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এক, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী চান পুলিশ রাজপথে যা-ই করুক না কেন, তা যেন সাংবাদিকদের নজরে না আসে। আরেকটি বিষয় পুলিশের জন্যও লজ্জার। পুলিশ জনগণের বন্ধু। পুলিশ নিরাপত্তা দেয়। আর নিরাপত্তার জন্য সাংবাদিকদের সেই পুলিশ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে বলেছেন খোদ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী!
গত মঙ্গলবার আদালত এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের লাঠিপেটার শিকার কালের কণ্ঠের আদালত প্রতিবেদক এম এ জলিল উজ্জ্বল বলেন, তাঁর শরীরে এখনো প্রচণ্ড ব্যথা। আঘাতের জায়গা ফুলে-ফেঁপে আছে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তিনি ওষুধ সেবন করছেন।
এম এ জলিল পুলিশের মারমুখী আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পুলিশের পিআরবি-তে স্পষ্ট করে লেখা আছে, 'পুলিশ হবে জনগণের বন্ধু।' সেই বন্ধুই এখন সাংবাদিক, আইনজীবী ও জনগণের প্রতিপক্ষ হিসেবে কাজ করছে। রক্ষকই এখন ভক্ষকের ভূমিকায় অবিতীর্ণ।
উজ্জ্বল আরো বলেন, তিনি এখন আতঙ্কে আছেন। সরকার আর পুলিশের এই মারমুখী অবস্থান নিয়ে তিনি শঙ্কিত। এরপর মাঠে কাজ করতে নামলে পুলিশ তাঁদেরকে কিভাবে নেবে, এটাই তাঁর শঙ্কা।
একই ঘটনায় নির্যাতিত প্রথম আলোর কোর্ট প্রতিবেদক প্রশান্ত কর্মকার গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, তিনি চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করছেন। শরীরে এখনো প্রচণ্ড ব্যথা। পুলিশের অনেক সদস্য তদন্তের নামে তাঁদের কাছে আসছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের কাছে জিজ্ঞাসাবাদের কোনো কাগজপত্র আছে কি না জানতে চাইলে তাঁরা উঠে চলে গেছেন। এসব কারণে তাঁরা নতুন করে এক অজানা আশঙ্কায় পড়েছেন। না জানি কোথায় কী পরিকল্পনা হচ্ছে!
প্রশান্ত কর্মকার আরো বলেন, তদন্তের নামে তাঁদেরকে যেন হেনস্তা করা না হয়। আর এ কারণে কোর্ট রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, আহত আদালত প্রতিবেদকদের যদি কেউ জিজ্ঞাসাবাদ করতে চান, তবে তাঁরা যেন তাঁদের অ্যাসোসিয়েশনের কক্ষে এসে বা অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে হাজির হয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।
গত শনিবার আগারগাঁওয়ে ঢাকা মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধের সময় দায়িত্ব পালনকালে প্রথম আলোর তিন ফটোসাংবাদিককে মারধর করেন পুলিশ সদস্যরা। এই বর্বর হামলার শিকার হন ফটোসাংবাদিক জাহেদুল করিম, সাজিদ হোসেন এবং খালেদ সরকার। তাঁরা এই কদিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। এখন কিছুটা সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেছেন।
জাহেদুল করিম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, তিনি হাসপাতাল থেকে গত মঙ্গলবার বাসায় ফিরেছেন। তিনি মেরুদণ্ডে আঘাত পেয়েছেন। চিকিৎসকরা সাত দিনের ওষুধ দিয়েছেন। ব্যথানাশক ও হাই অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ সেবনের কারণে শরীর এখনো দুর্বল। তবে এর চেয়ে মানসিক আঘাত তাঁকে বেশি কষ্ট দিচ্ছে। নানা অজানা আশঙ্কায় দিন কাটছে তাঁর। তবে তাঁদের পক্ষে বিভিন্ন গণমাধ্যম যে ভূমিকা রেখেছে, এতে তাঁরা সন্তুষ্ট এবং এই ঐক্য দেখে তাঁরা আশাবাদী।
হামলার শিকার প্রথম আলোর আরেক ফটোসাংবাদিক সাজিদ হোসেন বলেন, তিনি হাসপাতাল থেকে মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে বাসায় ফিরেছেন। হাসপাতালকে তিনি নিরাপদ মনে করেননি। শরীরের অবস্থা আগের চেয়ে কিছুটা ভালো। তবে এখনো প্রচণ্ড ব্যথা। চিকিৎসক সাত দিন পর আবার যেতে বলেছেন। এ ছাড়া ১০ দিন পর পর নিয়মিত চিকিৎসা নিতে হবে। চিকিৎসকরা এভাবে এক মাসের একটি চিকিৎসাপত্র দিয়েছেন তাঁকে।
এদিকে বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম কার্যালয়ে গত সোমবারের সন্ত্রাসী হামলায় আহত সাংবাদিক নেওয়াজ মোহাম্মদ রিফাত, সালাউদ্দিন ওয়াহেদ প্রীতম এবং অফিসকর্মী রুহুল আমিন রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁদের শারীরিক অবস্থা কিছুটা উন্নতির দিকে। এই হামলার ঘটনায় পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করলেও তাঁরা এখনো আশঙ্কাগ্রস্ত বলে তিনি জানান।
বিডিনিউজের চিফ রিপোর্টার মর্তুজা হায়দার লিটন গতকাল কালের কণ্ঠকে জানান, এই ঘটনায় আহতরা একটু সুস্থ হলেও তাঁরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন আদালত এলাকায় তাঁদের সহকর্মীদের পুলিশের হাতে মারধরের খবর জেনে।

No comments

Powered by Blogger.