সমাজ-মধ্য আয়মুখী দেশে হতদরিদ্র দলিতরা by আলতাফ পারভেজ

বাংলাদেশে 'আদিবাসী' আছে কি নেই_ এ রকম একটি হাস্যকর এবং অপ্রাসঙ্গিক বিতর্ক হচ্ছে এখন একাডেমিক মহলে; যার ছাপ পড়েছে মিডিয়ায়ও। এই বিতর্কের সূচনা অবশ্য আমলাতন্ত্র থেকে। কে আদিবাসী এবং কে নয় সে নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও বাংলাদেশে কেউ না কেউ তো আদিবাসী ছিল এবং আছে_ এ সত্য কি অবজ্ঞা করা যায়?


পূর্ববঙ্গ স্মরণাতীতকাল থেকে উর্বর ভূভাগ, কোনো জনমানবহীন মরুভূমি নয়। সুতরাং কাউকে না কাউকে এর আদি বাসিন্দা বলতেই হবে। তারা হয়তো কৈবর্ত, তারা হয়তো রাজবংশী, তারা হয়তো মালো কিংবা অন্য কেউ।
কিন্তু 'বাংলাদেশে আদিবাসী আছে' এটা স্বীকার করতে প্রস্তুত নয় সরকার। যদিও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন শুমারি দলিল এটা স্বীকার করে যে, এ দেশে ঋষি, কানপুরি, তেলেগু, রাজবংশী, কৈবর্ত ইত্যাদি সম্প্রদায় রয়েছে। এ রকম জনগোষ্ঠী রয়েছে দেশে অন্তত ৮০ থেকে ১০০। এরা মূলধারার বাঙালি মুসলমানদের মতো নয়। পেশাগত কারণে, ভাষাগত বৈশিষ্ট্যে কিংবা শারীরিক বা বংশগত বিবেচনায় এসব মানুষ মূল জনগোষ্ঠী থেকে পৃথক। এরা যে পৃথক তা বোঝার জন্য দেশের আনাচকানাচে ঘোরাফেরাই যথেষ্ট। তার জন্য পিএইচডিধারী গবেষক হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। প্রতি জেলায় তারা আছে। এদের পৃথকত্বের ভয়ঙ্কর রূপ দেখা যায় বিশেষ করে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে। এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষ ভীষণভাবে হতদরিদ্র, ভূমিহীন, বিপন্ন। কেবল শ্রম বিক্রি এদের ভরসা। কিন্তু শ্রমের বাজারেও কোণঠাসা তারা। ময়লা পরিষ্কারের মতো কাজ, যেগুলো আগে হরিজনদের জন্য নির্দিষ্ট থাকত_ সেখানেও এখন বাঙালি মুসলমানদের অনুপ্রবেশ ঘটে গেছে। যে কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির যখন বছর বছর ৬ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি ঘটছে বলে তারকা অর্থনীতিবিদদের ল্যাপটপগুলো সাক্ষী দিচ্ছে, তখনও দলিত মানুষদের জীবনমান একটু একটু করে কমছে। কিন্তু নিম্নবর্গের অর্থনীতির সেই চিত্র আমাদের 'থিঙ্কট্যাঙ্ক'-এর নজরে আসে না।
কেবল অর্থনৈতিক নাজুকতাই নয়, দলিত মানুষদের অনেকেই আবার মূলধারার 'ভদ্র সমাজে' অচ্ছুত। এদের বাচ্চাদের সঙ্গে ভদ্রলোকের সন্তানরা স্কুলে এক বেঞ্চে বসতে চায় না_ তাই স্কুল ছাড়তে হয় তাদের। এদের প্রথাগত ভূমি অধিকারের পক্ষে 'কাগজপত্র' নেই তাই তারা ভূমিহীন। এদের ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা নেই_ তাই তাদের 'পরিচয়' বিলুপ্তপ্রায়। এদের কোনো সংগঠন বা দল নেই_ তাই নেই তাদের নাগরিক সুবিধা বা রাজনৈতিক উপস্থিতি। 'গণতান্ত্রিক' বাংলাদেশ যখন 'মধ্য আয়ের দেশ'-এ পরিণত হচ্ছে তখনও ঋষি, কাওরা, বর্মণরা নীরব এক বর্ণবাদ কাটিয়ে উঠতে ব্যর্থ। কমবেশি সব জেলায়, বাংলাদেশের ৩০-৪০ লাখ দলিতকে ঘিরেই বহুমাত্রিক এই বর্ণবাদ জারি আছে। চা বাগানসহ দেশের নানা 'পকেটে' দলিত জনগোষ্ঠীর জীবন অনেকাংশে ক্রীতদাসতুল্য। মধ্য আয়ের দেশের নাগরিকদের নূ্যনতম দৈনিক ২ ডলার আয় করার নিশ্চয়তা থাকে। আমাদের চা বাগানের দলিতদের দৈনিক মজুরি কত? সেই মজুরির কত শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি ঘটছে_ আমাদের অর্থনীতিবিদরা সেটা কি জানেন? কখনও কি এ নিয়ে তারা কথা বলেন?
লক্ষণীয় ব্যাপার, 'আদিবাসী' চাকমা-মারমা-ত্রিপুরাদের পক্ষে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে কথা বলার মানুষ আছেন, কিন্তু দলিতদের পক্ষে নেই উল্লেখযোগ্য কোনো কণ্ঠস্বর। মূলধারা থেকে প্রায় স্থায়ী বিচ্ছিন্নতা এবং সাংস্কৃতিক হীনমন্যতার শিকার দলিত জনগোষ্ঠী। তারা সংগঠিত নয়। তারা শিক্ষিত নয়। সচেতন নয়। তারা যে মূলধারার মতোই সমানাধিকারের দাবিদার সেই বোধও হারিয়ে গেছে দলিতদের অনেকের মধ্য থেকে।
দশকের পর দশক কোণঠাসা বৈষম্যদশায় থেকে মালো, মানতা, বাঁশফোর, বাগদিরা ধরে নিয়েছে, এটাই তাদের নিয়তি। কারণ তারা 'নীচ জাতি'। নিশ্চিতভাবেই একবিংশ শতাব্দীর এক বিস্ময় এই মনোজাগতিক বিকার। কিন্তু এই দাসত্ববোধের দায় সেই জাতির ওপর বর্তায় যারা নিজেরা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গর্ববোধ করে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের কথিত চেতনা কি শহরে শহরে থাকা হরিজন পল্লীগুলোতে কিংবা শ্রীমঙ্গলের লেবার কলোনিতে পেঁৗছেছে? পেঁৗছানোর চেষ্টা কি হয়েছে বাম-ডান কোনো তরফ থেকে? যে জাতি ফেব্রুয়ারি এলে ভাষার সংগ্রাম নিয়ে উদ্বেল হয়ে ওঠে, তার কাছে কি মর্যাদা পেয়েছে সাদ্রী, তেলেগু, কানপুরি ভাষা?
মূলধারার সমাজ আর দলিত জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক এসব ব্যবধান ঘোচাতে কিছু উদ্যোগ গড়ে উঠেছে অতি সম্প্রতি। কিন্তু অনেকটাই তা দাতা সংস্থানির্ভর। একজনের সংগ্রাম অপরে করে দিতে পারে না। তাতে কেবল জটিলতাই বাড়ে। বস্তুত দলিত জনগোষ্ঠীর মুক্তি কেবল নীতিনির্ধারকদের সচেতনতায়নের ওপর নির্ভর করে না। এটা কেবল কেন্দ্রীয় পরিসরে প্রশাসন বা রাজনীতিবিদদের সেনসেটাইজেশনের ব্যাপার নয়, কেবল স্রেফ কিছু অধিকার আদায়ের ব্যাপার নয়। এর সমস্যার নিগড় অনেক গভীরে প্রোথিত। দলিতদের যে অচ্ছুত জ্ঞান করা হয় এর বিরুদ্ধে অনেক অ্যাডভোকেসি হয়েছে। কিন্তু দলিতরা নিজেরাই এখনও এরূপ প্রথায় আচ্ছন্ন। কেন 'অচ্ছুত' বা বর্ণের ধারণা মানবতাবিরোধী সে সম্পর্কে নিজেদের পরিমণ্ডলে স্পষ্ট সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে অনেক নিপীড়িত মানুষের মধ্যেই। সুতরাং সমাজ থেকে ভুল ধারণার ঐতিহাসিক সেই শিকড় উপড়ে না ফেলা পর্যন্ত এ ক্ষেত্রে জাতীয় সংগ্রাম সফল হবে না। সুতরাং কাজটি কেবল সেমিনার বা মানববন্ধনে হবে না। এই জনগোষ্ঠীকে ঘিরে থাকা সমস্যাগুলো বহুমাত্রিক। যেমন_ অশিক্ষা, অস্পৃশ্যতা, মাদকাসক্তি ইত্যাদি কেবল কমিউনিটিভিত্তিক উপায়েই মোকাবেলা করা সম্ভব। আবার আবাসন সংকট, স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা ইত্যাদির সুরাহা সম্ভব কেবল জেলা-উপজেলা-পৌরসভা পর্যায়ে স্থানীয় সরকারের সঙ্গে দরকষাকষি করে। কেবল নীতিগত বিষয়গুলো, যেমন_ সাংবিধানিক স্বীকৃতি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে কোটা ইত্যাদি বিষয়ে ঢাকাভিত্তিক নীতিনির্ধারকদের কাছে লবিং কার্যকর উপায় হতে পারে। তবে সেটা স্রেফ এনজিও লবিং হলে রাজনৈতিক সরকার কখনোই তাতে গুরুত্ব দেবে বলে মনে হয় না_ যদি না তার পেছনে পর্যাপ্ত সমাবেশ শক্তি জমায়েত করা যায়। আর এ কাজটি করতে হলে আন্দোলনটি গড়ে তুলতে হবে নিচ থেকে। দাতাদের অর্থে বেতনভুক্ত কর্মচারীদের দিয়ে এ কাজটি করা কঠিন বরং সেটা মনে হবে আরোপিত ও আনুষ্ঠানিক। একদল সংগঠক, যাদের দলিত আইডলজিতে পূর্ণাঙ্গ ও দ্বিধাহীন আনুগত্য এবং বিশ্বাস আছে_ তারাই কেবল পারে এ খাতে মুক্তির সংগ্রাম গড়ে তুলতে। সে কাজের জন্য দাতাদের সহায়তার চেয়েও প্রাথমিকভাবে জরুরি হলো দেশের নানা প্রান্তের রাজনীতিসচেতন দলিত তরুণদের একটি শিক্ষাশিবির। দক্ষিণ এশিয়ার অসমাপ্ত গণতান্ত্রিক বিপল্গবে দলিত তরুণদের কাঁধে যে ঐতিহাসিক দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে এর উপলব্ধি ও সে অনুযায়ী বৃহত্তর দায়িত্ব গ্রহণ ছাড়া কেবল দাতাদের পেছনে ছুটে বাংলাদেশের দলিত মুক্তি আন্দোলনের বর্তমান বন্ধ্যাদশার অবসান ঘটানো যাবে না। এ সত্যটি বুঝতে পারলেই কেবল দলিত সংগ্রাম তার প্রথম ধাপ পেরোবে।

আলতাফ পারভেজ : লেখক, গবেষক
altafparvez@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.