চিত্র-বিচিত্র by আশীষ-উর-রহমান

রুক্ষ শহর অনেক দিন থেকে বৃষ্টি পড়ে না শহরে। সবশেষ বৃষ্টি হয়েছিল গত বছরের ১৮ নভেম্বর। সে-ও না হওয়ার মতোই। আবহাওয়া বিভাগের রেকর্ডে আছে, বৃষ্টির পরিমাণ ছিল মাত্র এক মিলিমিটার। পুরো শহরে নয়, খাপছাড়াভাবে এখানে-ওখানে বর্ষণ হয়েছিল সেদিন। খুব শিগগির বৃষ্টি নামবে এমন সম্ভাবনাও নেই।


এখন অবশ্য বৃষ্টির সময়ও নয়, শিশিরের মৌসুম। রাতের শিশিরে ঘাসের ডগা, গাছের পাতা হয়তো ভিজে, কিন্তু প্রকৃতির রুক্ষতা তাতে ঘোচে না। নিরস শক্ত মাটি। মলিন ধুলায় পথের পাশে লাগানো নাগরিক বৃক্ষ-লতা-গুল্মগুলো বিবর্ণ। শোভাবর্ধনের জন্য লাগানো হলেও এখন বড়ই দীনহীন দেখায় তাদের। কবে বৃষ্টি নামবে, প্রকৃতির সেই কৃপা লাভের প্রতীক্ষায় ধুঁকছে হতশ্রী গাছপালাগুলো। শহর তার নিজস্ব চরিত্রেই কৃত্রিম। তাতে যেটুকু লাবণ্যের স্পর্শ, স্নিগ্ধতার ছোঁয়া, তা ওই মাথার ওপরে শাখা-প্রশাখা মেলে দেওয়া ছায়াময় সবুজ হিতৈষীর জন্যই। শীত তাদের রিক্ত নিষ্পত্র করে তুলেছে। এমনিতেই এ শহরে সবুজ অত্যন্ত সীমিত। ফলে নিষ্প্রাণ, রুক্ষ মনে হয় এখন অগণিত দালানকোঠায় ঘিঞ্জি হয়ে পড়া এ রাজধানী শহর।

মুক্তিযুদ্ধের নির্দলীয় ইতিহাস নেই
দেশে এসেছেন তিন সপ্তাহের বেশি হয়ে গেল। এবার একটু লম্বা সময়ই থাকবেন লন্ডনপ্রবাসী প্রাবন্ধিক, গবেষক গোলাম মুরশিদ। ফেব্রুয়ারির পুরোটা হয়তো থাকা হবে না, তবে বইমেলার শুরুটা দেখে যাওয়ার ইচ্ছা আছে বলে জানালেন তিনি। সেই সূত্রে জানা গেল, এবার একুশের বইমেলায় প্রথমা প্রকাশনী থেকে আসবে তাঁর নতুন বই মুক্তিযুদ্ধ এবং তারপর: একটি নির্দলীয় ইতিহাস। বইটির প্রকাশনার কাজ চলছে। বিগত বছরটি এ বইয়ের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, গবেষণা ও রচনার কাজেই কেটে গেছে। বইটি সম্পর্কে বললেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রায় ৪০ বছর পর আমি এর ইতিহাস লিখেছি, আমাদের দেশে ইতিহাস দখলের যে পালা চলছে, তা যাতে বন্ধ হয়, সে জন্য। আমি কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলাম না। সে কারণে দলীয় তোষণের গরজ আমার নেই। সত্যি যা ঘটেছিল, যুদ্ধটা কোন প্রেক্ষাপটে হলো, কীভাবে বিজয় হলো—এসব নিরপেক্ষভাবে তুলে আনার চেষ্টা করেছি। পাশাপাশি মানুষের প্রত্যাশা, স্বপ্ন ও বাস্তবতার বিষয়গুলো কেমন করে বদলে গেছে, সেটাও আছে।’ এই ইতিহাসের প্রেক্ষাপট ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যা পর্যন্ত বিস্তৃত বলে জানালেন তিনি। গোলাম মুরশিদের মতে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কোনো নিরপেক্ষ ইতিহাস রচিত হয়নি। সবাই যে যার দলীয় রাজনৈতিক বিশ্বাসের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখার চেষ্টা করেছে। তাতে নতুন প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস জানতে পারেনি। মূলত এই নতুন প্রজন্ম যেন সঠিক ইতিহাস জানতে পারে, সে জন্যই তাঁর এই ইতিহাস রচনার উদ্যোগ। এর আগে বাংলা সাহিত্যের এই গবেষক হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি ও বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাস নামের গবেষণাগ্রন্থ রচনা করে দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছেন। বাঙালি চরিত্রের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে বললেন, ‘বাঙালি মধ্যপন্থী। চূড়ান্ত কোনো কিছুকে মেনে নিতে পারে না। এ কারণে এখানে ধর্মীয় মৌলবাদীরা কখনো চূড়ান্ত বিজয় লাভ করতে পারবে না বলেই আমার বিশ্বাস।’ তবে গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্ও এখানে ওই বাঙালির স্বভাবের কারণেই খুব সুবিধাজনক বলে তিনি মনে করেন না। বললেন, ‘বাঙালি চরিত্রে পরমতসহিষ্ণুতা বলে কিছু নেই। ও কিচ্ছু জানে না—এটা হলো বাঙালির প্রধান ধুয়া। পরমতসহিষ্ণু নয় বলেই গণতন্ত্রের মূল চেতনাটি তার অন্তরে সুদৃঢ় হয়নি। সে কারণেই এখানে গণতন্ত্র আসেনি। গণতন্ত্র হচ্ছে না, হচ্ছে দলতন্ত্র।’ একটি বড় কাজ শেষ করে আরও একটি বড় কাজে হাত দিয়েছেন তিনি। এ বছর লিখবেন কাজী নজরুল ইসলামের জীবনী। লোকমুখে শুনে জীবনী লেখা নয়, তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে নির্লিপ্ত মনোভাব নিয়ে একটি প্রমাণসিদ্ধ জীবনী লিখতে যাচ্ছেন তিনি, যার অভাব রয়ে গেছে এখনো। গোলাম মুরশিদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন ১৯৬৮ থেকে ৮৩ সাল পর্যন্ত। তার পর থেকে লন্ডনপ্রবাসী। সেখানে লন্ডন ইউনিভার্সিটির অধীনে ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ বিভাগে গবেষণার কাজই করছেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া বিদ্যাসাগর বক্তৃতামালা ভিত্তি করে রচিত রবীন্দ্র বিশ্বে পূর্ববঙ্গ: পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রনাথ এবং আশার ছলনে ভুলি নামের মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবনীসহ প্রাচীন বাংলাগদ্যের ইতিহাস, নাটক ও নারী স্বাধীনতা নিয়ে তাঁর গ্রন্থ বিদগ্ধ মহলে উচ্চ প্রশংসিত। পেয়েছেন বাংলা একাডেমী, প্রথম আলোর বর্ষসেরা বই, জেবুন্নেসা-মাহবুবউল্লা স্বর্ণপদকসহ বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা।

একবিংশের ২৫
কবিতা ও নন্দন ভাবনার পত্রিকা একবিংশ-এর ২৫ বছর অতিক্রান্ত হলো। প্রতিশ্রুতিশীল তারুণ্যের প্রাণশক্তিতে বলীয়ান হয়ে যে পত্রিকাটি ১৯৮৫-তে আত্মপ্রকাশ করেছিল, কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেনের সম্পাদনায় তার আড়াই দশক পূর্তির অনুষ্ঠান হলো গত বুধবার জাতীয় জাদুঘরের সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে। অলাভজনক একটি পত্রিকার এতদিন প্রকাশনা অব্যাহত রাখা যে সহজ কাজ নয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। একবিংশ প্রকাশের প্রথম থেকেই তারুণ্যের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছিল। ২৫ বছর পরও সেই ভূমিকা অব্যাহত থাকবে বলেই বর্ষপূর্তিতে জানালেন এর উদ্যোক্তারা।

এই বাংলায়
ভ্রমণকাহিনি বললে সাধারণত আমরা ভাবি, বিদেশে গিয়ে তাক লাগানো সব দালানকোঠা, পাহাড়-পর্বত, জলপ্রপাত, বরফঢাকা উপত্যকা বা ইতিহাসখ্যাত সব প্রাচীন স্থাপত্য দেখে আসার পর সেসবের উচ্ছ্বসিত বয়ান। তাতে থাকবে ভ্রমণকারীর রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার বর্ণনা, কিংবা নিদেনপক্ষে সাতসমুদ্দুর তের নদী পার হয়ে প্রায় রূপকথার মতো যে দেশটিতে তিনি গিয়েছেন, তার সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য ও তত্ত্বের আবিষ্কার, বিশ্লেষণ ইত্যাদি। নিজের দেশের মধ্যে বেড়ানোকে সে অর্থে ভ্রমণ ভাবতে আমাদের কেমন যেন একটু ইতস্তত বোধ হয় এবং সে বেড়ানোর বৃত্তান্তকে ভ্রমণকাহিনি বলতেও বাধোবাধো ঠেকে খানিকটা। এবংবিধ কারণে মৃত্যুঞ্জয় রায়ের বইটি প্রথাসিদ্ধ ভ্রমণকাহিনির মতো নয়। তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন নিজ দেশের এ মাথা ও মাথা। উত্তরে বাংলাদেশের সব শেষের দিনমজুর আজিমুলের বাড়িটি থেকে দক্ষিণের সাগর ধোয়া সেন্টমার্টিনের ছেঁড়াদ্বীপ পর্যন্ত। তো সেই চলতি পথে তিনি কথা বলেছেন বিস্তর মানুষের সঙ্গে। প্রকৃতি অকৃপণভাবে যে রূপ ঢেলে দিয়েছে বাংলায়, উপলব্ধি করেছেন তার সৌন্দর্য। দেখেছেন, পূর্বসূরিদের গৌরবগাঁথার সাক্ষী হয়ে থাকা ভগ্নজীর্ণ স্মৃতিচিহ্ন। তাঁর নিজের ভাষায়, ‘হেঁটেছি আমার প্রিয় মাতৃভূমির শত শত গ্রামের পথে, অরণ্যে, দ্বীপে, ধর্মালয়ে। হাত ভিজিয়েছি নদী, সাগর আর ঝরনার জলে।’ নিবিড় বনভূমির পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর মনে হয়েছে রবীন্দ্রনাথের কথা, বিদায় অভিশাপ কবিতায় যেমন করে কচ বলেছিল, ‘এ বনভূমিরে আমি মাতৃভূমি মানি/হেথা মোর নব জন্মলাভ’—এই অনুভবই তিনি সুখপাঠ্য ভাষায় তুলে এনেছেন ছোট ছোট রচনায়। সেগুলো বহু দিন ধরেই প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। তা থেকে বাছাই করা ২৮টি রচনা নিয়ে প্রথমা প্রকাশনী থেকে সদ্য প্রকাশিত হলো তাঁর ভ্রমণকাহিনি দেখি বাংলার মুখ। প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। অফসেট কাগজে ঝকঝকে ছাপা, মজবুত বাঁধাই। প্রতিটি রচনার সঙ্গে রেখাচিত্র। সব মিলিয়ে পরিপাটি প্রকাশনা।
ঘরকুনো অপবাদ কাটাতেই বোধ হয় ইদানীং বাঙালির ঘরের বাইরে হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। ভ্রমণকে বিদেশযাত্রা হিসেবে না দেখে দেশের মধ্যে ঘোরাফেরাকেও ভ্রমণ বলে মনে নিয়ে ঘাসের ডগার ওপরে শিশিরবিন্দু দেখতে ঘর থেকে দুই পা ফেলে বাইরে যেতে উত্সাহী হচ্ছে অনেকেই। সমুদ্রসৈকত, পার্বত্য এলাকা, চা-বাগান, এমনকি গহিন সুন্দর বনেও যাওয়ার মতো সুযোগ-সুবিধা এখন তৈরি হয়েছে। তবে ভ্রমণে যাওয়ার সময় সেই স্থানের বিষয়ে আগে থেকে কিছু জানাশোনা থাকলে জায়গাটি যেমন ঘুরেফিরে দেখতে সুবিধা, তেমনি দেখার আনন্দও অনেক গভীর হয়ে ওঠে। সে ক্ষেত্রে এই বই সাহায্য করবে স্বদেশ ভ্রমণে আগ্রহী ব্যক্তিদের।

মানবিক-পাশবিক
কোমরে দড়ি বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে তাকে। দেখে প্রাণহীন বলেই মনে হয়। মাটিতে পড়ে আছে বেচারা। সে এক বনবিড়াল। রাঙ্গুনিয়ার মুরাদনগরের সংরক্ষিত বনের এই বাসিন্দা খাদ্যের সন্ধানে চলে এসেছিল লোকালয়ে। তার পর এই হাল। প্রথম আলোতে তার ছবিটি ছাপা হয়েছে গত বুধবার। এর আগের বৃহস্পতিবার এক শেয়ালকে দেখা গেল পত্রিকার পাতায়। তাকেও বেঁধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে শেয়ালের তেল তৈরির জন্য। খাবারের সন্ধানে লালমনিরহাটের এক গেরস্ত বাড়িতে বেচারা ঢুকে পড়েছিল। পরে জবাই করে তার তেল করা হয়েছে। শনিবার পত্রিকার পাতায় দেখা গেল, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে এক চিতাবাঘের বাচ্চাকে আটকে ফেলা হয়েছে। এর কদিন আগেই মারা পড়ল চিতাবাঘটি। লোকে ধরে ফেলছে লক্ষ্মীপেঁচা, শকুন। বনবিড়াল, চিতাবাঘ এসব তো প্রায়ই মারা পড়ছে। তারও আগে খুবই দুর্লভ একটি কালোবাঘ মারা গেল, সিলেটের কানাইঘাটে। বেচারা সীমান্তের ওপার থেকে এ দেশে এসেছিল। মারা পড়ল বেঘোরে। পশু-পাখি, সাপ-বিচ্ছু যা-ই হোক, সামনে পেলে তাকে ধরে ফেলা বা মেরে ফেলার ভাবনাটিই প্রথম আসে আমাদের মাথায়। তারা আমাদের আক্রমণ করুক চাই না করুক, হিংস্র হোক বা নিরীহ—বন্য প্রাণীদের বধ করাটা অতিজরুরি কর্তব্যজ্ঞান করে থাকি আমরা।
ছোট দেশ, তার ওপরে অভাব-অনটন। নিজেদেরই থাকার জায়গা নেই, খাবার নেই। সেখানে পশুদের জন্য হা-হুতাশ করা, তাদের থাকার জন্য জায়গা ছেড়ে দেওয়া বিলাসিতা বলেই বিবেচনা করে অনেকে। যাদের অঢেল আছে, তাদের মানায়; আমাদের ওসব মানায় না—এমন ভাবনার লোকেরও অভাব নেই। ‘আমরা’ বলতে মানুষেরা। আর ‘ওরা’ বলতে মানবেতর যা কিছু। এভাবেই তো ভাগটি করে নিয়েছি এবং ধরেই নিয়েছি, ওদের কোনো অধিকারই নেই টিকে থাকার। দুনিয়াদারির কর্তৃত্ব আর মালিকানা পুরোটাই আমাদের। এখানে শুধু আমাদেরই মৌরসি পাট্টা চলতে থাকবে।
এই করে পশু-পাখিদের আবাস ছারখার করার কাজ সুচারুভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। বন বলতে সেই এক মুঠি সুন্দরবন, আর কয়েক চিলতে সিলেটের ওদিকে রেমা কালেঙ্গা, সাতছড়ি প্রভৃতি। খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে গেছে। বনে তাদের খাবারের সংকট তীব্র। সেখানেও তারা নিরাপদ নয়, বন্ধ নেই মানুষের হানা। আর বনের সীমানা পার হলে তো কথাই নেই। মৃত্যু নিশ্চিত। সে চেষ্টা করেই একে একে এরা মরছে। বাঘ মরছে, শেয়াল মরছে, প্রায়ই মারা পড়ছে মেছোবিড়াল। যে আসবে, সে-ই মরবে। বন্য প্রাণীদের আমরা বলি হিংস্র। কিন্তু আমরা কি পেরেছি নিজেদের হিংস্রতা দমন করতে? মানবিকতার জয়গান করি বটে, অথচ বুকের কন্দরে জাগিয়ে রেখেছি আদিম হিংস্রতা।
আশীষ-উর-রহমান: সাংবাদিক।

No comments

Powered by Blogger.