দুর্নীতি দমন-কথায় নয়, কাজে বড় হতে হবে by বদিউল আলম মজুমদার

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তার ‘দিনবদলের সনদ’ শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহারে ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা’ গ্রহণকে ‘অগ্রাধিকারের পাঁচটি বিষয়’-এর মধ্যে দ্বিতীয়—দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি প্রতিরোধের পরই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছে। নির্বাচনী ইশতেহারে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে অঙ্গীকার করা হয়েছে: ‘দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে শক্তিশালী করা হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে বহুমুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।


ক্ষমতাধরদের বার্ষিক সম্পদের বিবরণ দিতে হবে। দুর্নীতি উচ্ছেদ, অনোপার্জিত আয়, ঋণখেলাপি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, কালো টাকা ও পেশিশক্তি প্রতিরোধ ও নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ এ ছাড়া ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী এসব বিষয়ে, বিশেষত দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও পেশিশক্তি নির্মূলে তাঁর দৃঢ়প্রত্যয়ের কথা বারবার ব্যক্ত করে আসছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত গত এক বছরে বহু হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা ছাড়া এসব ক্ষেত্রে তেমন কোনো উল্লেখ ও বিশ্বাসযোগ্য উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। উল্লেখ্য, ২০০১ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর ১০০ দিনের কর্মসূচি ঘোষণাকালে আমাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছিলেন।
দিনবদলের সনদে দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হলেও সরকার ক্ষমতা গ্রহণের কয়েক মাস পরই কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান হাসান মশহুদ চৌধূরীকে পদত্যাগ করতে হয়। এ ছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠান-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি যখন দুদক কমিশনারদের কমিটির সামনে তলব করার মাধ্যমে হয়রানি করছিল এবং তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করাসহ বিভিন্ন হুমকি দিচ্ছিল, তখন সরকারের পক্ষ থেকে কিছুই বলা হয়নি। মাননীয় স্পিকারও এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নীরবতা পালন করেন। এ ধরনের নীরবতা ছিল সম্পূর্ণ দুর্ভাগ্যজনক।
দুর্ভাগ্যবশত পুনর্গঠনের পরও সরকারের পক্ষ থেকে কমিশনকে শক্তিশালী করার কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। বরং আইন সংশোধন করে কমিশনের ক্ষমতা খর্ব করার কথা শোনা যাচ্ছে। দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা প্রায় দেড় শ মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করার ফলেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশের ক্ষেত্রেও সরকার চরম পক্ষপাতিত্ব করছে। যেমন, রাজনৈতিক হয়রানির অজুহাতে প্রত্যাহারের জন্য সুপারিশকৃত মামলাগুলোর প্রায় সবগুলোই সরকারি দলের নেতাদের বিরুদ্ধে করা মামলা। আমরা আনন্দিত যে দুদক সরকারের চাপের কাছে এ পর্যন্ত নতিস্বীকার করেনি। আমরা মনে করি, মামলাগুলো বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পন্ন হওয়া আবশ্যক। মামলাগুলো যদি সত্যিকার অর্থেই হয়রানিমূলক হয়, তাহলে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নিশ্চয়ই বিচার-প্রক্রিয়ায় আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হবেন। এ জন্য অবশ্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমান সরকারের আমলে গত এক বছরে একটি দুর্নীতির মামলাও চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়নি এবং একজন দুর্নীতিবাজকেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হয়নি, যা নিঃসন্দেহে সরকারের দুর্নীতি দমন কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বস্তুত সরকারের অনাগ্রহের কারণে সবগুলো দুর্নীতির মামলা বর্তমানে উচ্চ আদালতে ঝুলে আছে। মামলাগুলো ঝুলে আছে মূলত দুটি মামলার কারণে, যার একটির প্রতিপক্ষ হাবিবুর রহমান মোল্লা এবং অন্যটির প্রতিপক্ষ মহীউদ্দীন খান আলমগীর।
হাবিবুর রহমান মোল্লার মামলাটি পর্যালোচনা করা যাক। স্মরণ করা যেতে পারে যে দুদকের পক্ষ থেকে ২৫.৫.২০০৭ তারিখে হাবিবুর রহমান মোল্লার কাছ থেকে ১৯৭১ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে অর্জিত সব সম্পদের হিসাব চাওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে দুদক তাঁর বিরুদ্ধে আইনের ২৬(২)/২৭(১) ধারার অধীনে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করে এবং যথারীতি বিচার-প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিচার-প্রক্রিয়া শুরুর এবং মোট ২৫ জনের মধ্যে ১৭ জনের সাক্ষ্য গ্রহণের পর মামলাটি বাতিলের জন্য হাবিবুর রহমান মোল্লা হাইকোর্টে আবেদন করেন। মামলার আরজিতে তিনি দাবি করেন, দুদক আইনের অধীনে প্রণীত বিধি ১০ অনুযায়ী নির্ধারিত ৬০ দিনের মধ্যে মামলার তদন্ত সম্পন্ন করা হয়নি। এ ছাড়া মামলার বিচারও ৬০ দিনের মধ্যে শেষ করা হয়নি। উপরন্তু তদন্ত প্রতিবেদনের অনুমোদনপত্র (sanction) পুরো কমিশন প্রদান করেনি। আরজিতে আরও দাবি করা হয়, হাবিবুর রহমান মোল্লার বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের সময়ে আইনের ৩২(১) এবং রুল ১৫(৭) অনুযায়ী দুদক থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্র দেওয়া হয়নি। অর্থাত্ সম্পূর্ণ ‘টেকনিক্যাল গ্রাউন্ডে’ বা যান্ত্রিক যুক্তিতে মামলাটি করা হয়—আরজিতে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ হাবিবুর রহমান মোল্লা অস্বীকার করেননি।
বিচারপতি মো. আনোয়ারুল হক ও বিচারপতি ফারাহ্ মাহবুবের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০ নভেম্বর ২০০৮ তারিখে প্রদত্ত রায়ে হাবিবুর রহমান মোল্লার পক্ষে উত্থাপিত যুক্তিগুলো নাকচ এবং মামলা বাতিলের আবেদন খারিজ করে দেন [হাবিবুর রহমান মোল্লা বনাম রাষ্ট্র (ঢাকা ল রিপোর্টস) ৬১(২০০৯)]। রায়ে বিজ্ঞ বিচারপতিদ্বয় বলেন, ‘বস্তুত আইনে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে চাপ সৃষ্টির জন্য, যাতে এগুলো মেনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুততার সঙ্গে বিষয়টি নিষ্পন্ন করে। এর উদ্দেশ্য বিচার ছাড়া অপরাধীকে যান্ত্রিক যুক্তিতে মুক্তি দেওয়া নয়।’ এ ছাড়া আদালতের মতে, ফৌজদারি অপরাধের বিচারের কোনো নির্ধারিত সময়সীমা নেই।
আদালত তাঁর রায়ে আরও বলেন, যেহেতু নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তদন্ত শেষ না করলে আইনে কোনো শাস্তির বিধান নেই, তাই সময়সীমার এ বাধ্যবাধকতা মানা ঐচ্ছিক (directory), বাধ্যতামূলক (mandatory) নয়। যদি আইনপ্রণেতারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত ও বিচার-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ওপর বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করতে চাইতেন, তাহলে তা না মানার জন্য আইনে শাস্তির বিধান থাকত। দুদক আইনে এ ধরনের কোনো বিধান নেই।
পুরো কমিশনের সম্মতি সম্পর্কে দুদক আইনের ধারা ৩২ ও বিধি ১৫ উল্লেখ করে আদালত বলেন, কমিশনের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে একজন কমিশনার স্বাক্ষর করলেই যথেষ্ট। এ ছাড়া যেহেতু অনুমতিপত্র প্রদানের জন্য নির্দিষ্ট ছক আইনে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, সেহেতু অনুমতিপত্রে অনুমতি প্রদানের জন্য অতিরিক্ত কারণ প্রদর্শনের প্রয়োজনীয়তা নেই।
হাইকোর্টে পরাজিত হওয়ার পর হাবিবুর রহমান সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন এবং আদালত ‘লিভ টু আপিল’ গ্রাহ্য করেন। আপিলের আরজিতে বলা হয়, যেহেতু দুর্নীতি দমন আইন, ১৯৫৭ এবং দুর্নীতি দমন (ট্রাইব্যুনাল) অধ্যাদেশ, ১৯৬০-এর আওতায় হাবিবুর রহমান মোল্লার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের দুর্নীতিসংক্রান্ত অভিযোগ, তদন্ত, মামলা বা অনুমতিপত্র নেই, তাই দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর অধীনে ১৯৭১-২০০৭ সময়সীমা কালে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের আইনসিদ্ধ নয়। উপরন্তু এর মাধ্যমে সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করা হয়েছে। সংবিধানের ৩৫(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘অপরাধের দায়যুক্ত কার্যসংঘটনকালে বলবত্ ছিল, এইরূপ আইন ভঙ্গ করিবার অপরাধ ব্যতীত কোন ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করা যাইবে না।’
লিভ টু আপিল গ্রাহ্য করার জন্য আপিল বিভাগের এ যুক্তিটি গ্রহণের যৌক্তিকতা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। কারণ, দুর্নীতি একটি চলমান প্রক্রিয়া, তাই সম্পদের মালিক হওয়ার এবং দুর্নীতিতে লিপ্ত হওয়ার সময় এক এবং অভিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ। এ দুটির মধ্যে সরাসরি যোগসূত্রতা না থাকাই স্বাভাবিক। এ কারণে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অপেক্ষাকৃত অধিক নির্ভরযোগ্য তথ্যের জন্য দীর্ঘকালীন সময় ধরে তা হিসাব করা দরকার। হাবিবুর রহমানের ক্ষেত্রে ২০০৪-০৭ সময়সীমার মধ্যে অর্জিত সম্পদ ওই সময়ে দুর্নীতির মাধ্যমে আয় করা অর্থ থেকে এসেছে, তা প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। বস্তুত, এ ধরনের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করলে কোনো দুর্নীতির মামলাই প্রমাণ করা যাবে না। অন্যভাবে বলতে গেলে, দুর্নীতি একটি ভিন্ন ধরনের অপরাধ—এটি চুরি বা খুনের মতো অপরাধ নয়, যা একটি সুনির্দিষ্ট সময়ে ঘটে। তাই চুরি কিংবা খুনের জন্য অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সময় বলবত্ আইন প্রয়োগ বাঞ্ছিত, কিন্তু দুর্নীতির মতো চলমান অপরাধের ক্ষেত্রে তা যৌক্তিক নয়। কারণ, আইনের পরিবর্তন হলেও দুর্নীতিমূলক কার্যক্রম থেমে থাকে না এবং পরবর্তী দুর্নীতি আগের দুর্নীতিরই অনেকটা শাখা-প্রশাখা। আর শুধু শাখা-প্রশাখা ছেঁটে ফেললেই দুর্নীতি নির্মূল হবে না—এ জন্য আগের থেকে প্রোথিত দুর্নীতির মূলোত্পাটন প্রয়োজন।
দুর্নীতি দমন আইন, ১৯৫৭ এবং দুর্নীতি দমন (ট্রাইব্যুনাল) অধ্যাদেশ, ১৯৬০-এর ধারাবাহিকতাই দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ প্রণীত হয়েছে। এগুলোর উদ্দেশ্য, এমনকি অনেক বিধানও এক ও অভিন্ন। যেমন, ১৯৫৭ সালের আইনের ধারা ৪ ও ৫, সাম্প্র্রতিক আইনের ধারা ২৬ ও ২৭-এর সমতুল্য। অর্থাত্ এগুলো মূলত একই আইন এবং এগুলোর প্রায় অভিন্ন উদ্দেশ্য হলো সমাজকে দুর্নীতির করালগ্রাস থেকে মুক্ত করা। পরের আইন মূলত আগের আইনের পরিবর্তিত, বর্ধিত ও উন্নত সংস্করণ এবং দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধ কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার উদ্দেশ্যেই নতুন আইন—পুরোনো আইন বলবত্ থাকাকালে দুর্নীতিমূলক অপরাধকে, যা বৈশিষ্ট্যগতভাবে চলমান, বিচারালয়ের বাইরে রাখা এর উদ্দেশ্য নয়। তাই চুরি কিংবা খুনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও সংবিধানের ৩৫(১) অনুচ্ছেদ দুদক আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক নয় বলেই আমাদের ধারণা।
সংবিধানের ৩৫(১) অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হবে কি না, তা নির্ভর করে অভিযুক্ত ব্যক্তির অপরাধের জন্য শাস্তি সম্পর্কে পূর্ব সতর্কীকরণের ব্যবস্থা ছিল কি না। এ প্রসঙ্গে মাহমুদুল ইসলাম তাঁর Constitutional Law of Bangladesh (দ্বিতীয় সংস্করণ) গ্রন্থে Marks v. U.S, 430 US 188; Beazell v. Ohio, 269 US 166 মামলার রায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, ‘এ ক্ষেত্রে মৌলিক নীতি হলো যেকোনো ব্যক্তির আচরণের জন্য ফৌজদারি আইনের অধীনে শাস্তি প্রাপ্তির সম্ভাবনা থাকলে, যা তার স্বার্থের পরিপন্থী—সে সম্ভাবনা সম্পর্কে তার উপযুক্ত পূর্ব সতর্কবাণী পাওয়ার অধিকার রয়েছে।’ যেহেতু দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অতীতের আইনের ধারাবাহিকতায়ই প্রণীত হয়েছে, তাই অভিযুক্ত হাবিবুর রহমান যথাযথ পূর্ব সতর্কবাণী পেয়েছেন বলে ধরে নেওয়া অযৌক্তিক হবে না।
এ ছাড়া সংবিধানের ৩৫(১) অনুচ্ছেদ হাবিবুর রহমানের ক্ষেত্রে প্রয়োগের যৌক্তিকতা নির্ণয়ে General Clauses Act, 1897 প্রাসঙ্গিক। ওই আইনের ধারা ৬ অনুযায়ী, কোনো আইন বাতিল হলেও এর আওতাভুক্ত বিষয়ে তদন্ত, বিচার, শাস্তি প্রদান ইত্যাদি করা যাবে ধরে নিয়ে যে বাতিল করা আইনের পরিবর্তে নতুন আইন পাস করা হয়নি।
এ প্রসঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ভূমিকা বা প্রস্তাবনার (preamble) দিকে, যেখানে এর উদ্দেশ্য লিপিবদ্ধ রয়েছে, দৃষ্টি দেওয়া যেতে পারে। প্রস্তাবনা অনুযায়ী, এটি হলো ‘দেশে দুর্নীতি এবং দুর্নীতিমূলক কার্য প্রতিরোধের লক্ষ্যে ... প্রণীত আইন’। অর্থাত্ আইনের উদ্দেশ্য হলো ন্যায়বিচারের মাধ্যমে দুর্নীতিবাজদের শাস্তি নিশ্চিত করে কার্যকরভাবে দুর্নীতি প্রতিরোধ করা, ‘হাইপার টেকনিক্যাল গ্রাউন্ডে’ বা অতি যান্ত্রিক যুক্তিতে দুর্নীতিবাজদের বিচার-প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা নয়। আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে তারা যাতে বেরিয়ে যেতে পারে, সে ব্যাপারে সহায়তা করা নয়। অর্থাত্ দুদক আইনের ব্যাখ্যা প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন প্রণয়নের সময়ে আইনসভার সদস্যদের উদ্দেশ্য, যা আইনের প্রস্তাবনায় বর্ণিত রয়েছে, বিবেচনায় নেওয়া আবশ্যক। তাহলে বিচারালয় ‘সুপার লেজিসলেটর’ বা আরও বড় আইনসভায় পরিণত হবে না।
পরিশেষে, আমরা আশা করি, প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতি নির্মূলের ব্যাপারে তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন—গত ১৭ অক্টোবর দারিদ্র্যবিরোধী এক সমাবেশে তিনি বলেন, ‘দুর্নীতিবাজ যে দলেরই হোক না কেন, তাদের রেহাই নেই। কারণ, দুর্নীতিমুক্ত না হলে দেশ দারিদ্র্যমুক্ত হবে না।’ অর্থাত্ কবি কুসুম কুমারী দাশের ভাষায় বলতে গেলে, আমাদের কামনা যে তিনি কথায় না বড় হয়ে, কাজে বড় হবেন। আশা করি, আমাদের উচ্চ আদালতও হাবিবুর রহমান মোল্লার মামলাটি দ্রুততার সঙ্গে নিষ্পন্ন করবেন এবং এ ব্যাপারে সুবিবেচনার পরিচয় দেবেন। কারণ, এ মামলাটির ব্যাপারে সিদ্ধান্তের জন্য অসংখ্য দুর্নীতির মামলা ঝুলে আছে। আমরা আরও আশা করি, অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস দুর্নীতির মামলাগুলো সম্পর্কে আরও তত্পর হবে। কারণ, তিনি সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত রাষ্ট্রের—সরকারের বা দলের নন—সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা এবং তাঁর বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ইতিমধ্যে কেউ কেউ তুলছেন। সর্বোপরি আমরা আশা করি যে নাগরিক সমাজ এ বিষয়ে সক্রিয় ও সোচ্চার হবেন, কারণ ক্ষমতায় গিয়ে দুর্নীতির ইজারাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ থাকলে এবং দুর্নীতি করে পার পেয়ে যেতে পারলে বা ‘কালচার অব ইম্পিউনিটি’ বিরাজ করলে আমাদের গণতান্ত্রিকব্যবস্থাও টিকে থাকবে না।
ড. বদিউল আলম মজুমদার, সম্পাদক, সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক।

No comments

Powered by Blogger.