ধর্ম-ইসলামের দৃষ্টিতে কর্মসংস্থান ও স্বাবলম্বন by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

আল্লাহ তাআলা ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানুষকে তাঁর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। আর বিশ্বের সবকিছু মানব জাতির কল্যাণ ও সেবার জন্য তৈরি করেছেন। তিনি মানুষকে জ্ঞান, বুদ্ধি, কর্মস্পৃহা, কর্মদক্ষতা ও মননশীলতা দিয়েছেন।


স্বহস্তে কাজ করার জন্য দিয়েছেন শক্তি-সামর্থ্য, তার কর্মক্ষেত্র হিসেবে দিয়েছেন এ বিশাল জগত্। আর পার্থিব অসংখ্য নিয়ামত থেকে মানুষকে নিজের কর্মসংস্থান তথা রিজিক অনুসন্ধান করতে বলা হয়েছে। সামাজিকভাবে আমরা যেসব কাজকর্ম করে রিজিক অন্বেষণ করি, সে কাজটা হতে হবে পরিশুদ্ধ। কর্মময় জীবনে মানুষ নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে সততা ও ন্যায়নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করবে; অপরকে ধোঁকা দিয়ে, মানসিকভাবে কষ্ট দিয়ে অসত্ উপায়ে যে অবৈধ আয়-উপার্জন, ইসলামের দৃষ্টিতে তা হারাম। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন নামাজ শেষ হয়ে যায় তখন তোমরা ভূপৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা) অন্বেষণ করবে।’ (সূরা আল-জুমুআ, আয়াত-১০)
স্বাবলম্বন মানে হচ্ছে স্বনির্ভরতা, আত্মনির্ভরশীলতা, অপরের ওপর ভরসা না করা, নিজের পায়ে নিজে দাঁড়ানো, নিজের প্রয়োজন পূরণের পর অন্যের মুখাপেক্ষী না হওয়া। পরনির্ভরশীল জাতির যেমন কোনো মর্যাদা নেই, তেমনি পরনির্ভরশীল ব্যক্তিরও কোনো মানমর্যাদা নেই। পরনির্ভর লোক পরগাছার বা পরজীবীর মতো। অপরের দয়া, অনুগ্রহ ও অনুকম্পার ওপর সে ভরসা করে, অথচ আল্লাহ তাআলা মানুষকে যে দৈহিক সামর্থ্য ও মানসিক শক্তি দান করেছেন, ধর্মপ্রাণ লোকেরা যদি তাতে আত্মবিশ্বাসী হয়ে জীবনে উন্নতি করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা-সাধনা চালায়, তাহলে আল্লাহ তাকে সফলতা প্রদান করেন। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘আর মানুষ তা-ই পায়, যা সে চেষ্টা করে।’ (সূরা আন-নাজম, আয়াত-৩৯)
ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী মানবজীবনে পরনির্ভরশীল না হয়ে প্রত্যেকেরই স্বাবলম্বী হওয়ার প্রচেষ্টা ও অনুশীলন করা উচিত। স্বাবলম্বনের অনুশীলনে একজন মানুষ যেকোনো পরিবেশে যেকোনো অবস্থায় নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়। তাই নিজের কাজ নিজেই করা উচিত। কেননা আল্লাহ তাআলা কোনো জাতির ভাগ্য ততক্ষণ পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে সচেষ্ট হয়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বাণী প্রদান করেছেন, ‘আল্লাহ উপার্জনশীল বান্দাকে পছন্দ করেন।’ (তাবারানি)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বাল্যকাল থেকেই অত্যন্ত কর্মঠ ও আত্মনির্ভরশীল ছিলেন, ছোটবেলায় তিনি তাঁর পিতৃব্য আবু তালিবের সংসারে ছিলেন, কিন্তু চাচার পরিবারে গলগ্রহ হয়ে থাকেননি। কিশোর মুহাম্মদ (সা.) মক্কার উপত্যকায় রাখাল বালকদের সঙ্গে মেষ-বকরি চরিয়েছেন। নবীজি ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু, কিন্তু তিনি পরনির্ভরতাকে মোটেই পছন্দ করতেন না। তিনি ভিক্ষাবৃত্তিকে খুব অপছন্দ করতেন। রাসুলে করিম (সা.) মানুষকে স্বাবলম্ব্বনের শিক্ষা দিয়ে বলেছেন, ‘উপরের হাত নিচের হাত অপেক্ষা উত্তম’ অর্থাত্ গ্রহীতা অপেক্ষা দাতা উত্তম। (মিশকাত) এ সম্পর্কে নবী করিম (সা.) সাবধান বাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘তোমার নিজের প্রতি কর্তব্য রয়েছে।’ (বুখারি)
একদা জনৈক সুস্থ-সবল এক লোক এসে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে ভিক্ষা চাইলে তিনি ভিক্ষা না দিয়ে জানতে চাইলেন তার ঘরে কিছু সহায়-সম্বল আছে কি না? লোকটি বাড়ি থেকে একটি কম্বল নিয়ে এল। নবীজি কম্বলটি বিক্রি করে পরিবারের জন্য কিছু খাবার আর একটি কুঠার কিনে আনতে বললেন। কুঠার নিয়ে এলে নবীজি নিজহাতে হাতল লাগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এটি নিয়ে বনে যাও এবং কাঠ কেটে বাজারে বিক্রয় করো। ভিক্ষা করবে না, এতে পাপ হয়। কাঠ বিক্রয় করে লোকটি সচ্ছল হয়েছিল।’ (আবু দাউদ)
ইসলাম অলসতা, কর্মবিমুখতা, কুঁড়েমি আদৌ পছন্দ করে না। পৃথিবীতে যুগে যুগে যত নবী-রাসুল এসেছেন, তাঁরা সবাই নিজের হাতে হালাল উপার্জন করে স্বাবলম্ব্বীরূপে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। তাই হালাল উপার্জন সব নবী-রাসুলের সর্বজনীন সুন্নাত। পরিশ্রমের দ্বারা স্বহস্তে কাজ করে হালাল উপায়ে উপার্জিত খাদ্যই সর্বোত্তম। রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষকে উত্সাহিত করে বলেছেন, ‘দুই হাতের উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কেউ কোনো দিন আহার করেনি।’ (বুখারি)
ইসলামের দৃষ্টিতে পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করায় কোনো দোষ নেই, এতে অমর্যাদা হয় না বরং মানুষের মর্যাদা ও সম্মান বৃদ্ধি পায়। রাসুলে করিম (সা.) বাণী প্রদান করেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের হাতের উপার্জিত খাদ্য ভক্ষণ করে, তার চেয়ে উত্তম খাদ্য ভক্ষণকারী আর কেউ নেই। আল্লাহর নবী হজরত দাউদ (আ.) নিজহাতে কাজ করে খেতেন।’ (বুখারি)
আল্লাহর নবী-রাসুলগণ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থেকে স্বাবলম্বী জীবন যাপন করতেন। হজরত আদম (আ.) কৃষিকাজ করতেন, হজরত নূহ (আ.) কাঠের কাজ করতেন, হজরত ইদ্রিস (আ.) সেলাইয়ের কাজ করতেন, হজরত ইব্রাহীম (আ.) ও হজরত লূত (আ.) ক্ষেত-খামার করতেন, হজরত সালেহ (আ.) ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন, হজরত দাউদ লৌহবর্ম তৈরি করতেন, হজরত মূসা (আ.), হজরত শুআইব (আ.) ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মেষ-ছাগল রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। মহানবী (সা.) ব্যবসা-বাণিজ্যও করতেন।
হালাল উপার্জনের তাগিদে সমাজে ধর্মপ্রাণ মানুষ চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, লেনদেন, অন্যান্য কাজকর্ম ছাড়াও পশুপালন, হাঁস-মুরগির খামার, মত্স্য চাষ, বৃক্ষরোপণ, সামাজিক বনায়ন, কৃষিকাজ, ছোট-বড়-মাঝারি বিভিন্ন ধরনের নার্সারি ও ক্ষুদ্র কুটির শিল্প বা কারখানা প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি স্বাবলম্বনের বৈধ পন্থা গ্রহণ করে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেন। এতে যেমন নিজে স্বাবলম্বী ও আত্মনির্ভরশীল হওয়া যায়, অন্যেরও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায় এবং দেশ ও জাতির প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। ঈমানদারের প্রতিটি কাজকর্মই ইবাদত, যদি তা কল্যাণকর এবং নিঃস্বার্থ হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বাণী প্রদান করেছেন, ‘কর্মের ফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (বুখারি)
সুতরাং ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী প্রতিটি মানুষ যদি স্বনির্ভর হয়ে নিজ নিজ কাজকর্মে দায়িত্বশীল থাকে এবং প্রত্যেকে নিজের কাজটুকু সঠিক সময়ে সম্পন্ন করে, তাহলে কোনো কাজই অবহেলিত হয় না। তখন দেশ, জাতি ও সমাজ অগ্রগতির পথে চলতে থাকে এবং সমৃদ্ধশালী হয়। তাই ধর্মপ্রাণ মানুষকে নিজের কাজ নিজে করতে অভ্যস্ত হতে হবে এবং স্বাবলম্বী হওয়ার মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য সর্বাত্মক প্রয়াস চালাতে হবে।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমি, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়। পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব হজরত মুহাম্মদ (সা.)।

No comments

Powered by Blogger.