সাদাকালো-বিচার : যুদ্ধাপরাধ তথা গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের by আহমদ রফিক

যুদ্ধ করতে গিয়ে যে বা যারা নিরীহ, নিরপরাধ মানুষজনকে হত্যা করেছে, একইভাবে নারীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে তাদের সে কর্মকাণ্ড যুদ্ধাপরাধ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি বাহিনীর শীর্ষ নেতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তেমন অপরাধে বিচার 'নুরেমবার্গ ট্রায়াল' নামে পরিচিত।


অনুরূপ অপরাধে ছোট বৃত্তে হলেও সার্ভিয়ার নির্দিষ্ট সেনানায়কের বিচার চলছে 'হেগ'-এর আন্তর্জাতিক আদালতে। এমনকি একই ঘটনা ঘটেছে একাধিক অত্যাচারী রাষ্ট্রপ্রধানকে নিয়ে।
১৯৭১ সালে (২৫ মার্চ থেকে ডিসেম্বর) তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ২৫ মার্চ মধ্যরাত থেকে বাঙালি ছাত্র-জনতার ওপর অনুরূপ আক্রমণ চালিয়ে হত্যা করে লাখ লাখ মানুষ। গ্রাম-নগর-বস্তি পুড়ে ছাই হয় তাদের রাজনৈতিক প্রতিহিংসায়। কয়েক লাখ নারী নির্যাতনের শিকার। ওই বর্বর হত্যাকাণ্ডের বিবরণ ধরা আছে বিদেশি পত্রপত্রিকায় যা চলেছে ১৯৭১ সালের পুরো ৯ মাস ধরে এবং যা গণহত্যা নামে পরিচিত।
তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল স্থানীয় বাঙালি-অবাঙালি নাগরিক যারা হত্যা, গুম, নারী নির্যাতন ও ঘরবাড়ি পোড়ানো এবং লুটপাটের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। পাকিস্তান রক্ষার নামে তারা ওই সব অন্যায়, অমানবিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছে কখনো পাকিস্তানি সেনার সহায়তায়, কখনো এককভাবে। কখনো সেনাবাহিনীর আহ্বানে, কখনো সেনাবাহিনীকে ডেকে এনে। অসহায়, নিরপরাধ নরনারী এককথায় বেসামরিক নাগরিক-শহরবাসী, গ্রামবাসী পূর্বোক্ত হত্যা ও নির্যাতনের শিকার।
যুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর (১৯৭১) বিজয় অর্জনের পর অমার্জনীয় যুদ্ধাপরাধে তথা গণহত্যায় অভিযুক্ত সেনাকর্মকর্তা ও সদস্য যাদের সর্বশেষ সংখ্যা ১১৮, তাদের বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি। এমনকি বেসামরিক পূর্বোক্ত অপরাধী, যারা এককথায় ঘাতক রাজাকার নামে পরিচিত তাদেরও সংঘবদ্ধ, নিয়মতান্ত্রিক, আইনি বিচার হয়নি, দু-চারটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদে। ব্যতিক্রম মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষোভের শিকার কিছু সংখ্যক ব্যক্তি।
যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে ইতিমধ্যে অনেক লেখালেখি হয়েছে, সমালোচনা চলেছে বিভিন্ন সময়ে সরকার ও শাসকগোষ্ঠীর। গঠিত হয়েছে ঘাতকদালাল নির্মূল কমিটি যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে। সে চেষ্টা ছিল স্থানীয় বেসামরিক অপরাধীদের নিয়ে। কারণ ১৯৭২ সালের প্রথম দিকেই জেনেভা কনভেনশনের বরাতে ৯৩ হাজার পরাজিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী স্বদেশে ফিরে যায়। অপরাধী সেনাসদস্যদের বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি।
দীর্ঘসময় পর বছর দুই আগে স্বাধীনতাযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডারদের উদ্যোগে গঠিত 'সেক্টর কম্যান্ডার্স ফোরাম'-এর উত্থাপিত যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবি নতুন মাত্রা অর্জন করে। তাদের দাবির পেছনে নতুন করে ব্যাপক জনসমর্থন লক্ষ করা যায়। সরকার সে দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এবং তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের দাবি পূরণ করতে বিচারের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু কোথায় পাবে গণহত্যায়, নরনারী, শিশুহত্যায় অপরাধী পাকিস্তানি সেনাকর্মকর্তা ও সৈনিকদের? তারা তো বহালতবিয়তে স্বদেশে অর্থাৎ পাকিস্তানে নিরাপদ আশ্রয়ে। তবু বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয় ঢাকায়।
যুদ্ধাপরাধীদের পাওয়া না গেলেও স্থানীয় ঘাতক অপরাধী রাজাকার, আলবদর বাহিনীর সদস্যদের অধিকাংশই এখন বাংলাদেশে। তাদের বিচারের দাবিও ছিল জনসাধারণের, বিশেষ করে একাত্তরে নিহত ও নির্যাতীত ব্যক্তি ও পরিবারের জীবিত সদস্য ও তাদের উত্তরসূরিদের। যে লক্ষ্যে গঠিত হয় 'প্রজন্ম ৭১' থেকে শুরু করে একাধিক সংগঠন। কিন্তু অপরাধী রাজাকার সদস্য ও অন্যরা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়নি বলে আইনি যৌক্তিকতায় যুদ্ধাপরাধ হয়ে দাঁড়ায়। মানবতাবিরোধী অপরাধ। সে হিসেবেই বিচার।
অপরাধের বিচার প্রশ্নে দু-একটি বিষয় আমাদের অবাক করে। করে রাজনৈতিক দলগুলোর বিচারবিষয়ক আচরণে। একাত্তরের অবিশ্বাস্য পাকিস্তানিদের বর্বরতার বিচারে, এমনকি স্থানীয় ঘাতকদের বিচারেও তাদের কেমন যে অনীহা দীর্ঘসময় ধরে লক্ষ করা গেছে। তা না হলে নানা প্রমাণে অপরাধী কেমন করে বছরের পর বছর সবার চোখের সামনে ঘুরে বেড়ায়। তাদের কেউ কেউ রাষ্ট্রনৈতিক মার্যাদায়ও অধিষ্ঠিত হয়। দু-একটি সংগঠন বাদে সেসব ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ উচ্চারিত হয় না। যেমন সাধারণ মানুষ তেমনি রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, বলাবাহুল্য কিছু ব্যতিক্রম বাদে।
'অনীহা'র প্রশ্ন উঠছে এ জন্য যে বহু পরিচিত এদেশীয় অপরাধীদের বিচার অনেক আগেই দেশের প্রচলিত আইনে করা যেত। হত্যা, অগি্নসংযোগ ও লুটপাটের মতো অপরাধের জন্য দেশি আইনই তো যথেষ্ট। বিশেষ করে যেসব ক্ষেত্রে সাক্ষ্য-প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু তাদের দীর্ঘসময় অবাধে চলাফেরা করতে দেওয়ার ফলে তাদের পক্ষে একধরনের সামাজিক স্বীকৃতি তৈরি হয়ে গেছে। অবশ্য তাতে অপরাধের বিচার চলতে বাধা তৈরি হয় না কিন্তু পরোক্ষ বিঘ্ন ঘটে।
সেই সঙ্গে আরো একিট প্রশ্ন : বিদেশে অবস্থানরত চিহ্নিত ঘাতক অপরাধীদের স্বদেশে এনে বিচারের চেষ্টাও করা হয়নি। যেমন কয়েকদিন আগে একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে 'আলবদরের সহযোগী এখন যুক্তরাজ্যে বড় মুসলিম নেতা'। এ 'নেতা' বহু আলোচিত তৎকালীন 'পূর্বদেশ' পত্রিকার কনিষ্ঠ সাংবাদিক চৌধুরী মাঈনুদ্দিন। বাহাত্তরে যার নৃংশস অপরাধের বিষয়ে বেশ কিছু লেখালেখি হয়েছে।
শুধু অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ও সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে অপহরণ ও হত্যার অভিযোগই নয় 'পূর্বদেশে' কর্মরত সহকারী সম্পাদক আ ন ম গোলাম মোস্তফাকে তাঁর বাসা থেকে 'পূর্বদেশ' অফিসে নিয়ে যাওয়ার অজুহাতে গুম ও হত্যার পেছনে মাঈনুদ্দিনের প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতার কথাও তখন আলোচিত হতে শুনেছি। কারণ যতদূর জানা যায়, স্বাধীনতাযুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে ওই পত্রিকা অফিসে বসেই মোস্তফার সঙ্গে মাঈনুদ্দিনের তর্কবিতর্ক হয়েছিল। সম্ভবত ওই ঘটনার জেরে মোস্তফা হত্যাকাণ্ড।
ভাবতে অবাক লাগে যে লন্ডনে বহুসংখ্যক বাঙালি বুদ্ধিজীবীর বসবাস সত্ত্বেও ঘাতক মাঈনুদ্দিন চৌধুরী কিভাবে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বাস করে নিজেকে শীর্ষস্থানীয় মুসলিম নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে! বিশেষ করে বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতা বাঙালি সাংবাদিক বুদ্ধিজীবী মহলেও ছিল বহু আলোচিত। বিদেশি পত্রিকায় বিশেষত একাত্তর-বাহাত্তরে লন্ডনে পত্রিকায়ও তার অপরাধের খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
তা সত্ত্বেও লন্ডনবাসী বাঙালিদের কেউ বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারকে অবহিত করেননি বা তার বিচারের দাবি তোলেননি কেন? জামায়াতে ইসলামীর সদস্য এবং ঘাতক আলবদর বাহিনীর সহযোগী হিসেবে চৌধুরী মাঈনুদ্দিন বাহাত্তরে বহু আলোচিত ব্যক্তি। তা সত্ত্বেও যুক্তরাজ্য কিভাবে তাকে নাগরিকত্ব প্রদান করে তাও এক প্রশ্নবিদ্ধ ঘটনা। গণতন্ত্র কি এমনই নীতি সংবলিত যে ঘাতক অপরাধীকেও আইনি বিধানে নাগরিকত্ব দেওয়া চলে। তার ধর্মীয় রক্ষণশীলতাও কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না?
আর শাবাশ মুক্তিযুদ্ধের নামে উচ্ছ্বসিত লন্ডনস্থ বাঙালিদের যে সেখানে নানা কর্মকাণ্ডে জড়িত ঘাতক মাঈনউদ্দিন সম্বন্ধে তাদের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পায়নি দীর্ঘ চলি্লশ বছরেও!
এর নাম 'মুক্তিযুদ্ধের চেতনা'? নাকি ওখানেও মাঈনউদ্দিনের হাতে প্রাণ হারানোর ভয় ছিল? থাকলেও স্বদেশের জন্য এটুকু সাহস দেখানোর প্রয়োজন ছিল। এখন সরকারের দায় তাকে এনে বিচারের মুখোমুখি করা।
তা ছাড়া মাঈনউদ্দিন তো সেখানকার সমাজে কীর্তিমান ব্যক্তি।
লন্ডনস্থ জামায়াতে ইসলামের বড়সড় নেতা। ইউরোপে 'ইসলামী ফোরাম' গঠনের অন্যতম কর্মকর্তা। এমনকি সালমান রুশদীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সংগঠিত করারও অন্যতম নেতা। তাকে তো লন্ডনস্থ বয়স্ক বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের না চেনার কথা নয়। তবু লন্ডনে মাঈনউদ্দিনের জামায়াতি রাজনীতি বহালতবিয়তে চলেছে! এবার পাকিস্তানি সেনা প্রসঙ্গ।
যুদ্ধাপরাধ তথা মানবাধিকারবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনাল এবং সেই সঙ্গে সরকারের উদ্দেশে আমাদের আবেদন যুদ্ধাপরাধে চিহ্নিত (১৯৭২-এ) সর্বশেষ সংখ্যার ১১৮ জন পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা ও সদস্যেরও এই সঙ্গে বিচারের ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তাদের মধ্যে যারা জীবিত তাদের বাংলাদেশে ফেরত এনে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করা হোক। এ ব্যাপারে হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক আদালতের সাহায্যও নেওয়া যেতে পারে।
আরবাব, জামশেদসহ একাধিক সেনাকর্মকর্তার নাম তো তখনকার বিদেশি (ব্রিটেন ও আমেরিকার) পত্রপত্রিকায়ই মিলবে। এমনকি পরোক্ষে মিলবে পাকিস্তানি মেজর সিদ্দিক মালিকের লেখা 'উইটনেস টু সারেন্ডার' বই থেকে। এ ছাড়া রয়েছে একাধিক স্থানীয় সূত্র, একান্তই যদি ১৯৭২ সালে রচিত ১১৮ জনের তালিকা পাওয়া না যায়। অবশ্য সে তালিকা ভারতের কাছেও থাকার কথা। জেনারেল জ্যাকব বা পি এন হাকসার বা নিদেনপক্ষে জে. এন দীক্ষিতের কাছে সে তালিকার হদিস মিলতে পারে।
একান্তই যদি তাদের ফিরিয়ে আনতে পারা না যায় তাহলে তাদের অনুপস্থিতিতেও বিচরকাজ শুরু করা যেতে পারে। অপরাধীর অনুপস্থিতিতে বিচারকাজ তো আইনসম্মত বিষয়। পাকিস্তান সরকারকে একাত্তরের পূর্বপাকিস্তানে গণহত্যা ও নারী নির্যাতনের জন্য পাকিস্তান সরকারকে ক্ষমা চাইতে বলার চেয়ে (যা তারা কোনোদিনও চাইবে না) ওই সব জঘন্য অপরাধের জন্য দায়ী পাকিস্তানি সৈন্যদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা বরং অনেক বেশি যুক্তিসম্মত কাজ। এটা বাংলাদেশের জন্য রাষ্ট্রনৈতিক মর্যাদারও বিষয়।
শেষ পর্যন্ত যখন যৃদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়েছে তখন অপরাধী পাকিস্তানি সৈন্যদের বিচারের বিষয়টি রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখনো হয়তো কিছু সংখ্যক বাঙালি বেঁচে আছেন যাঁরা এ বিষয়ে কিছু না কিছু তথ্য দিতে পারবেন। তা ছাড়া পত্রপত্রিকার তথ্য তো রয়েছেই। চিহ্নিত ১১৮ না হোক অন্তত আট জনেরও যদি বিচার করা হয় তাহলে পাকিস্তানিদের বর্বরতার ভুক্তভোগী বাঙালি কিচুটা হলেও স্বস্তি পাবেন।
এ কাজ হাতে নেওয়ার জন্য, যদিও কাজটা কঠিন, আমি সরকার, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, সংশ্লিষ্ট গবেষক, সংগঠন, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি এবং বিশেষ করে 'বিচার ট্রাইব্যুনালে'র প্রতি আবেদন জানাচ্ছি। ৪০ বছর পার হয়ে গেছে বলেই বিষয়টাকে যেন আমরা যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করি। কাজটা জাতীয় পর্যায়ের এবং স্বাধীনতাকামী বাঙালি মাত্রেরই এ বিষয়ে কিছু না কিছু দায়দায়িত্ব রয়েছে।
লেখক : কবি ও ভাষাসৈনিক

No comments

Powered by Blogger.