খোলা চোখে-ক্রিকেট ও রাজনীতি by হাসান ফেরদৌস

২৩ মার্চ, ‘পাকিস্তান ডে’ উপলক্ষে নিউইয়র্কে সে দেশের মিশনে দাওয়াত ছিল। সিকিউরিটি চেক সেরে, শীতের কোট জমা দিয়ে এক পা বাড়িয়েছি মাত্র, অমনি আধচেনা এক পাকিস্তানি ভদ্রলোক আমাকে সোল্লাসে জড়িয়ে ধরলেন। ‘থ্যাঙ্কু, থ্যাঙ্কু,’ বলে প্রায় চুমু খান আর কি। আমি তাঁর ‘ভালুক আলিঙ্গন’ সামলে জিজ্ঞেস করলাম, কী এমন মহান কারণে এই


উদ্বাহু সংবর্ধনা? তিনি দুচোখ কপালে তুলে বললেন, ‘বল কী, শোননি, ঢাকায় কোয়ার্টার ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে গোহারা হারিয়েছে পাকিস্তান! তোমরা পাশে না থাকলে এমন সহজ বিজয় অসাধ্য ছিল।’ ইংরেজিতে বললেন, ‘ইউ মেড থিংস ইজি ফর আস।’
২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে ঢাকায় বিশ্বকাপ ক্রিকেটের কোয়ার্টার ফাইনাল হবে, তা নির্ঘাত কেউ আগে থেকে অঙ্ক কষে রাখেনি! ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে কাকতালীয়, কিন্তু কাকের তালতলায় যাওয়ার ঘটনাটি একদম উপেক্ষা করার মতো ব্যাপার নয়। ১৯৪০ সালের এই দিনে লাহোরে মুসলিম লিগের এক সম্মেলনে প্রস্তাব করা হয়, ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভেঙে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র গঠিত হোক। অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক সেই প্রস্তাব পাঠ করেছিলেন, ফলে অনেকে তাঁকেই লাহোর প্রস্তাবের প্রণেতা বলে বিবেচনা করে থাকে। কথাটা অবশ্য ঠিক নয়।
তো, সে ঘটনার ৭১ বছর পর, ২০১১ সালের ২৩ মার্চ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা ঢাকায় হলো পাকিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যে। এর দিন কয়েক আগে এই ওয়েস্ট ইন্ডিজের হাতেই গোহারা হেরে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছিল। দল হিসেবে আজকের ওয়েস্ট ইন্ডিজ আগের সেই সোবার্স-কানহাইয়ের দল নয়, তাতে ওয়েসলি হল বা গ্রিফিথের মতো খেলোয়াড়ের ছায়া মাত্রও নেই। সে তুলনায় পাকিস্তান বরং অনেক দক্ষ, অনেক পাকা দল। ফলে তারা যে জিতবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। হয়েছিলও তা-ই। কিন্তু অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার হলো, সেই খেলার সময় এবং পরে পাকিস্তানের পক্ষে বাংলাদেশের দর্শকদের অমন আদেখলাপনা। খেলা শেষে ইএসপিএনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে একদঙ্গল বাঙালি ছেলেমেয়ে যে রকম হুল্লোড় শুরু করে দিল, তা দেখে কিছুটা ভড়কে গিয়েছিলাম। বিস্মিত পাকিস্তানিরাও কম কিছু হয়নি। তাদের অনেকের ধারণা, মিরপুর স্টেডিয়ামে তাদের দলের খেলোয়াড়েরা বিদেশের মাটিতে নয়, যেন নিজের দেশে খেলছে। আর সেটাই তাদের বিজয়ের অন্যতম কারণ। নামজাদা সাংবাদিক আদিল নাজাম তো তাঁর নিয়মিত ব্লগে লিখেই বসলেন, ধন্যবাদ বাংলাদেশ। পাকিস্তানি মিশনের কূটনীতিক ভদ্রলোক সেই স্পিরিট থেকেই আমাকে অমন জাপ্টে ধরেছিলেন।
যে কয়েক হাজার দর্শক সেদিন মিরপুর স্টেডিয়ামে খেলা দেখেছিল, তাদের কজন বাংলাদেশের, কজন পাকিস্তানের, তা আমি জানি না, টিভিতে দেখে বলা মুশকিল। তবে প্রায় সবাই যেভাবে তারস্বরে পাকিস্তানের পক্ষে মাতম করছিল, তাতে সবাইকেই পাকিস্তানি ভাবতে হয়। আমার কথা বলছি না, মাঠে উপস্থিত ছিলেন এমন একজন পাকিস্তানি সাংবাদিকের প্রতিবেদন থেকে জেনেছি, পাকিস্তানের পক্ষে বাংলাদেশিদের এমন চমৎকার মনোভাব দেখে তাঁরা রীতিমতো থ হয়ে গেছেন। তাঁর ধারণা, পাকিস্তানের পক্ষে এমন শাণদার, এমন বুকখোলা সাপোর্ট দেখানোর কারণ, দেশটা তো একসময় পাকিস্তানের অংশ ছিল। পুরোনো আনুগত্য বাঙালিরা এখনো ভোলেনি। সালেহা রিয়াজ নামের এই পাকিস্তানি সাংবাদিক এক্সপ্রেস ট্রিবিউন পত্রিকায় লিখেছেন, ‘ঢাকায় যে আমরা এত সহজে জিতে গেলাম, আমাদের জন্য সেটা সবচেয়ে আনন্দময় অভিজ্ঞতা ছিল না। পাকিস্তানের পতাকা আঁকা আমাদের মুখ বারবার টিভির পর্দায় দেখা যাচ্ছিল, সেটাও বড় কথা নয়। পাকিস্তান ডেতে এই জিত হলো, সেটাও নয়। সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার হলো, বাংলাদেশি দর্শকদের আমাদের প্রতি বিরামহীন সমর্থন। জামাহীন যুবকেরা তাদের কপালে বাংলাদেশি পতাকা এঁকে নিয়েছিল, বুকে লেখা ছিল “বুম বুম আফ্রিদি”, আর বুকের ওপর আঁকা ছিল পাকিস্তানের পতাকা। অনেকেই পাকিস্তানি পতাকা কাঁধে ঝুলিয়ে দৌড়ঝাঁপ করছিল, কেউ কেউ চন্দরপল কীভাবে দাঁড়ায়, তা নিয়ে ব্যঙ্গ করছিল। সব দেখে ভুলেই যাচ্ছিলাম যে আমি পাকিস্তানে নেই।’
মনে রাখা ভালো, সেই খেলার দুই দিন পর ছিল ২৫ মার্চ। গণহত্যার ভয়াল কালরাত। সালেহা রিয়াজের কথাগুলো পড়ে মনটা খারাপই হলো। একটা বমি বমি ভাবও এল। সে অবশ্য অল্প সময়ের জন্য। নিজেকে বুঝ দিলাম, ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে ক্রিকেট খেলায় আমরা তো ওয়েস্ট ইন্ডিজকে সমর্থন করতে পারি না। এরাই না সপ্তাহ খানেক আগে আমাদের নাকের জল চোখের জল এক করে ছেড়েছে! রেগেমেগে ওদের বাসে আমরাই না ঢিল ছুড়েছি! হেরেছে, বেশ হয়েছে। কিন্তু তাই বলে বুকে পাকিস্তানি পতাকা এঁকে স্টেডিয়াম মাতিয়ে বেড়াব? সে প্রশ্নেরও জবাব পেলাম। ইএসপিএনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বাংলাদেশি ছেলেমেয়েগুলো বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে যা বলল, তার মোদ্দাকথা হলো, খেলা খেলাই, এর সঙ্গে রাজনীতি না মেশানোই ভালো।
যে ছেলেমেয়েগুলো হড়হড় করে ক্যামেরার সামনে এই কথাগুলো বলছিল, আমার বিশ্বাস, তারা কেউ বানানো কথা বলেনি। পাকিস্তান জিতেছে, এতে তারা সত্যি সত্যি খুশি হয়েছে। আমিও খুশি হতাম, যদি জানতাম, এই ব্যাপারটায় সত্যি সত্যি রাজনৈতিক কিছু নেই। কিন্তু আসলেই কি তাই?
পাকিস্তানিদের কাছে বিশ্বকাপের এই প্রতিযোগিতা শুধু খেলা নয়, রীতিমতো ধর্মযুদ্ধ। সে কথা বোঝা গেল পাকিস্তানি অধিনায়ক আফ্রিদির একটা মন্তব্য থেকে। ভারতের সঙ্গে পাকিস্তান ভালো খেলেও হেরেছে। দেশে ফিরে সাংবাদিকদের কাছে আফ্রিদি বলেছেন, ‘আমাদের মুসলমানদের যত বড় হূদয়, ভারতীয়দের তা নেই। আল্লাহ আমাদের অর্থাৎ মুসলমান ও পাকিস্তানিদের যেমন বৃহৎ ও পরিষ্কার হূদয় দিয়েছেন, ওদের (অর্থাৎ হিন্দুদের) তা দেননি।’ আফ্রিদি সাহেব আরও জানালেন, ‘ওদের সঙ্গে আমরা শান্তিতে থাকতে পারব না, ওদের সঙ্গে শান্তিতে থাকা সম্ভব নয়। শান্তির তো কম চেষ্টা হলো না, কী লাভ হলো!’
খেলা হলো দুই দেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে, অথচ আফ্রিদি আবিষ্কার করলেন, সেই খেলা হয়েছে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে। তিনি হয়তো লক্ষ করেননি যে হিন্দু দলটির ভেতর জহির খান নামের একজন মুসলমান খেলোয়াড়ও ছিলেন, যদিও তিনি পাঠান খেলোয়াড়, কখনো তাঁর ধর্মের পরিচয়টি সবার আগে তুলে ধরেননি। পাকিস্তানিরা—তা তারা ক্রিকেটার হোক বা জেনারেল, বরাবর সবকিছুর ভেতর সবার আগে ধর্ম খোঁজে। খেলোয়াড়ের ভেতর তারা খেলোয়াড় দেখে না, মানুষের ভেতর মানুষ দেখে না। ভারতের সঙ্গে খেলার আগের দিন পুরো পাকিস্তানি দল খেলার মাঠে সারি বেঁধে নামাজ পড়েছে, একবার নয়, দুই দুবার। তাবৎ ক্যামেরা তাদের দিকে তাক করা। যে দলের সেরা খেলোয়াড়েরা খেলা নিয়ে জুয়া খেলতে গিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ হয়েছে, তাদের আর যাই হোক, ধার্মিক সাজা মানায় না।
পাঠক বলবেন, ক্রিকেটের কথা বলতে গিয়ে আমি রাজনীতির কপচানি করছি। কিন্তু এই কপচানি করার প্রয়োজন হয়তো পড়ত না, যদি আমাদের দেশের ছেলেরা বুকে পাকিস্তানি পতাকা এঁকে দৌড়ঝাঁপ করছে, সে কথা পাকিস্তানি পত্রিকার পাতায় পড়তে না হতো। অথবা পাকিস্তানের কথা বলতে গিয়ে যদি তাদের অমন গলে যেতে না দেখতাম। ভিন্ন প্রজন্মের বলেই কি আমার পক্ষে তাদের নির্দোষ আনন্দ পুরোপুরি বোঝা কঠিন?
আরও একটা ব্যাপার আমার মনে কাটার মতো বিঁধেছিল। পাকিস্তানি মিশনে যে কর্তাব্যক্তি আমাকে শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরেছিলেন, তাঁর গলায় আমি কোনো কটাক্ষ দেখিনি, কিন্তু শ্লাঘার আভাস অবশ্যই পেয়েছিলাম। সালেহা রিয়াজের লেখায়ও সেই শ্লাঘা। ভদ্রমহিলা তাঁর প্রতিবেদনে আরও লিখেছেন: ‘পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তান একসময় যে বৈরী মনোভাব দেখায়, তা থেকে মনে হতে পারে, বাংলাদেশিরা বুঝি আমাদের ওপর রুষ্ট। কিন্তু না, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যে বৈরিতা আছে, বাংলাদেশিদের মধ্যে তার এক-দশমাংশও আমি দেখিনি। আমাদের প্রতি তাদের ভালোবাসা নিখাদ মনে হয়েছে। যখন খেলার শুরুতে পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত বাজছিল, আমি ও আমার ভাই কিছুটা চেঁচিয়ে, কিছুটা সুরে তার সঙ্গে গলা মেলাচ্ছিলাম। আমার পাশে বসা এক বাংলাদেশি তরুণ বলল, এই গানের শব্দ আমরাও জানি। একসময় এই গান আমাদের জাতীয় সংগীত ছিল।’
পাকিস্তানি সাংবাদিককে নয়, ওই বাংলাদেশি তরুণটির কাছে আমার জানতে ইচ্ছে করে, পাকিস্তানি জাতীয় সংগীত জানো, খুব ভালো কথা, কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত তোমাদের জানা আছে তো?
হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

No comments

Powered by Blogger.