প্রতিবেশী দেশগুলোর অনিশ্চিত পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ

সম্পাদকদের সঙ্গে মনমোহন সিং প্রশ্ন :আমাদের প্রতিবেশীদের সম্পর্কে আপনি কিছু উল্লেখ করেননি। মনমোহন :খোলামেলাভাবে বলতে গেলে প্রতিবেশী দেশগুলো নিয়ে আমি বেশ উদ্বেগের মধ্যে আছি। শ্রীলংকায় এক ধরনের অবস্থা। তামিল টাইগারদের ধ্বংস হয়ে যাওয়া এক অর্থে ভালোই হয়েছে। কিন্তু এতে তামিল সমস্যা দূর হয়ে যায়নি।


শ্রীলংকার তামিল জনগণের দুঃখ-দুর্দশার যথার্থ কারণ রয়েছে। তারা নিজেদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হয়েছে বলে মনে করে। শ্রীলংকার তামিলরা যাতে আত্মসম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারে এবং তারা যাতে সিংহলিদের মতো নিজেদের একই মর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক মনে করতে পারে, এর জন্য আমরা দেশটিতে নতুন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য সে দেশের সরকারকে অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করছি। তা সহজ কাজ নয়। শ্রীলংকার জনগণের মধ্যেই মাথা গরম লোকের সংখ্যা কম নয়। সিংহলি সোভিনিজম এখন বাস্তব। শ্রীলংকার পরিস্থিতি আমাদের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর প্রভাব রয়েছে বিধায় সেখানে যা ঘটছে সে ব্যাপারে আমাদের একটা কঠিন ভারসাম্যমূলক অবস্থান নিতে হবে। সেখানে যা ঘটছে সে ব্যাপারে তামিলনাড়ূর সরকার ও বিধানসভা প্রকাশ্যেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তামিলনাড়ূ সরকারকে আমাদের সঙ্গে রাখা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। আমার সঙ্গে তামিলনাড়ূর মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতার চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে। প্রথমবার সাক্ষাতের সময়ই আমি তার কাছে এ ব্যাপারে কথা পাড়ি। তিনি আমার কাছে কতগুলো ন্যায়সঙ্গত বিষয় তুলে ধরেছেন। তামিলনাড়ূর বিধানসভায় যে প্রস্তাবই পাস হোক না কেন তিনি শ্রীলংকার তামিল সমস্যার জটিলতা এবং শ্রীলংকার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বজায় রাখার বাস্তবতা সম্পর্কে খুবই সচেতন বলে মনে হয়েছে।
প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশে থেকে তৎপরতা পরিচালনাকারী ভারতীয় বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপগুলোকে দমন করার ব্যাপারে সে দেশের বর্তমান সরকার আমাদের সহযোগিতা দিচ্ছে এবং এ কারণেই আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে উদার মনোভাব নিয়েছি। আমরা ধনী দেশ নই। তারপর শেখ হাসিনা যখন ভারত সফরে আসেন আমরা তখন দেশটিকে একশ' কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব করি। এ ছাড়াও আর কী কী ক্ষেত্রে তাদের সুবিধা দেওয়া যায় সে বিষয়ে আমরা বিভিন্ন উপায় খুঁজে দেখছি। দেশটির সঙ্গে তিস্তার পানি বণ্টনের ব্যাপারেও আমরা বাস্তবসম্মত ও গঠনমূলক উপায় অনসন্ধান করছি। আমি বাংলাদেশ সফরের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বিদেশমন্ত্রী সে দেশে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন চমৎকার। তবে আমাদের এটা অবশ্যই হিসাবে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশের ২৫ শতাংশ মানুষ জামায়াতের সমর্থক এবং তারা অত্যন্ত কট্টর ভারতবিরোধী। তারা অনেক সময় পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা-আইএসআইর পরামর্শে কাজ করে। অতএব, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট যে কোনো সময় পাল্টে যেতে পারে। তবে জামায়াতের ওপর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এমন সন্ত্রাসবাদী কারা কারা তাদের সম্পর্কে এখনও পর্যন্ত বিস্তারিত আমাদের জানা নেই।
সুতরাং অনিশ্চিত প্রতিবেশীদের সঙ্গেই আমাদের বসবাস। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও অনিশ্চিত। এর মধ্যেই আমাদের মাথা তুলে চলতে হবে।
প্রশ্ন :সরকার ও পার্টির মধ্যকার অনিশ্চয়তা সম্পর্কে বলুন।
মনমোহন :আমাকে বলতে হবে যে, এটাকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে। তবে এ ধরনের অবস্থা কংগ্রেস পার্টিতে সবসময়ই ছিল। আমি এ ধরনের মতামতকে স্বাগত জানাই। কারণ এটা মধ্যমেয়াদে সংশোধনের মাধ্যমে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণে সহায়ক হয়। এ প্রসঙ্গে আমার সরকারের আন্না হাজারে ও রামদেব বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়ে পার্টির সমালোচনাকে উল্লেখ করা যায়। তিনি যখন অনশনের হুমকি দেন তখন আমি মনে করেছি যে, আমার সরকারের সব মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার অবস্থান থেকে সংবেদনশীল ভূমিকা নেওয়া উচিত এবং এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই আমি আন্না হাজারের সঙ্গে সংলাপকে উৎসাহিত করি। আন্না হাজারেকে দীর্ঘকাল ধরেই আমি চিনি। তিনি আমার সঙ্গে এক ঘণ্টা আলোচনা করে যান। তিনি ফিরে যাওয়ার সময় আমার মনে হয়েছে যে, আলোচনায় তিনি খুশি হয়েছেন। কিন্তু দু'তিন দিন যেতে না যেতেই দেখা গেল তাকে অন্য জায়গা থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে এবং তারা সংঘাত চায়। আমি সচেতনভাবে এমন একটা পন্থা উদ্ভাবন করি, যাতে নাগরিক সমাজের সবার সঙ্গে আমার সরকার আলোচনা করতে পারে। আমরা আমাদের দেশে যে ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিব রূপান্তর চাই সেটা অর্জন করার জন্য আমাদের এই নাগরিক সমাজের সাহায্য ও সমর্থন প্রয়োজন। আমি আরও আশা করেছিলাম যে, তারা নিয়মনীতি মেনেই তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবেন। তবে দেশের জনগণের চাওয়া সম্পর্কে তারা যা বলছেন তাই শেষ কথা, এমনটা কেউই দাবি করতে পারেন না। সংসদ ও সাবেক প্রধান বিচারপতিরা আন্না হাজারের কিছু ধারণার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। এনজিও ধারণার আরও স্তর রয়েছে। তবে আমি এখনও মনে করি যে, এ ব্যাপারে একটা জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলতে আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে একত্রে কাজ করতে পারব। রামদেবের ক্ষেত্রেও অপ্রয়োজনীয় ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করা উচিত ছিল না বলে আমি মনে করি। তিনি আমার কাছে পত্র লিখলে আমি তার জবাব দিই। তাকে লিখি যে, তার কালো টাকা ও দুর্নীতি সম্পর্কিত উদ্বেগের সঙ্গে আমি সহমত পোষণ করি এবং এ ব্যাপারে তার কোনো সুনির্দিষ্ট মতামত রয়েছে কি-না সে ব্যাপারে জানতে চাই। তিনি ভালোভাবেই সাড়া দেন। প্রণব মুখার্জি যখন বাবা রামদেবের কাছে কর কর্মকর্তাসহ কিছু সরকারি কর্মকর্তাকে প্রেরণ করেন, তখন তারা তার সঙ্গে দেখা করে এসে জানান যে, বাবা খুবই সহযোগিতামূলক মনোভাব দেখিয়েছেন। তিনি কোনো সমস্যা সৃষ্টি করবেন না বলেও তারা জানান। এখানে এলেই তিনি এ ব্যাপারে একটা বিবৃতি দেবেন, তাতেই সব সমস্যা মিটে যাবে। এই প্রেক্ষাপটেই আমাদের সতীর্থরা বিমানবন্দরে যায়, তবে তাকে অভ্যর্থনা জানাতে নয়। সেখানে তাদের সঙ্গে ভালো আলোচনা হয়। কিন্তু বিপুলসংখ্যক মানুষ যখন তার সমর্থনে জড়ো হয় তখন এর একটা প্রভাব পড়ে তার ওপর। তবে তার কথাবার্তায় পূর্ব প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ লক্ষ্য করা যায়নি তখনও পর্যন্ত। আমি তাকে বলতে শুনেছি যে, তাদের দাবি ৯০ শতাংশ পূরণ হয়েছে। কপিল সিবাল তাকে যখন এ ব্যাপারে আমরা আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছি বলে একটা চিঠি দেন, তখন এর উল্লেখ করে তাকে বলতে শুনেছি যে, এতে তাদের দাবির সবটাই পূরণ হবে। কিন্তু যখন তিনি সমবেত জনতার উদ্দেশে ভাষণ দেওয়া শুরু করলেন তখন অকস্মাৎ তাকে ভিন্ন দৃশ্য বিবৃত করতে দেখা গেল।
প্রশ্ন :আপনার দল থেকে মাঝে মধ্যেই শোনা যায় যে, রাহুল গান্ধীর ক্ষমতা গ্রহণ করা উচিত। এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?
মনমোহন :আমি নিশ্চিত যে, কংগ্রেস এবং এর প্রেসিডেন্টের আমার ওপর আস্থা আছে বলেই তারা আমাকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে নিয়োজিত করেছেন। কংগ্রেস হাইকমান্ড থেকে আমি এর অন্যথা কোনো কিছু শুনিনি। বস্তুত কংগ্রেস হাইকমান্ড বিশেষত প্রেসিডেন্ট সোনিয়া গান্ধী আমার ব্যাপারে যথেষ্ট সহায়ক ভূমিকা রেখেছেন। এ ব্যাপারে আমার অভিমত হলো, তরুণ প্রজন্মের ক্ষমতায় আসা উচিত বলে যে ধারণা রয়েছে বলে আপনি উল্লেখ করেছেন, সে সেন্টিমেন্ট সঠিক বলে আমি মনে করি। আমি আন্তরিকভাবে মনে করি, যখনই কংগ্রেস পার্টি চাইবে আমাকে আর প্রয়োজন নেই তখনই আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেব। কিন্তু এই পদে যতক্ষণ রয়েছি ততক্ষণ আমার কিছু করণীয় রয়েছে বলে আমি মনে করি।
প্রশ্ন :সরকার উদ্দেশ্যহীনভাবে চলছে বলে একটা অনুভূতি রয়েছে, জোট ভেঙে যাচ্ছে এমন একটা ধারণাও রয়েছে। আপনার সরকারের আয়ু নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
মনমোহন :কিছু উত্তেজনা রয়েছে। তবে কেউই এখন নির্বাচন চান না বলে আমার মনে হয়েছে। এই আত্মোপলব্ধির প্রবণতা আমাদের পক্ষেই যাবে বলে আমি মনে করি। জোটের অভ্যন্তরের বিদ্যমান উত্তেজনা আমরা সামলে নিতে পারব।
প্রশ্ন :একটা ধারা চালু রয়েছে যে, সোনিয়া গান্ধীই সবকিছু নির্ধারণ করে থাকেন এবং আপনি এক্ষেত্রে অসহায়।
মনমোহন :এই সরকার যা কিছু করেছে তার সব দায়দায়িত্ব আমার। সরকারের কর্মকাণ্ড পরিচালনার পথে তিনি প্রতিবন্ধক, এমনটা কখনোই মনে হয়নি। আমি তার সঙ্গে প্রতি সপ্তাহেই সাক্ষাৎ করি।
 

No comments

Powered by Blogger.