চিরকুট-পুনশ্চ: আরোগ্যশিল্পী by শাহাদুজ্জামান

এই কলামে ডাক্তারদের নিয়ে লিখেছিলাম একবার ‘আরোগ্যশিল্পী’ শিরোনামে। সমপ্রতি ডাক্তারবিষয়ক বিতর্কে আরও একবার এ প্রসঙ্গে ফিরতে উদ্বুদ্ধ হলাম। আগের লেখায় চিকিৎসা পেশা কীভাবে একাধারে বিজ্ঞান ও শিল্প, সে প্রসঙ্গে লিখেছিলাম। কিন্তু শিল্পী ইত্যাদি বলে যতই কাব্য করার চেষ্টা করি না কেন,


দেখা যাচ্ছে ডাক্তাররা বেশ তোপের মুখে আছেন। ডাক্তাররা আদৌ মনুষ্য প্রজাতির সদস্য, নাকি রক্ত পানকারী ড্রাকুলা বংশোদ্ভূত, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। বোঝা যাচ্ছে পরিস্থিতি জটিল। আমি নিজে চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়াশোনা করেছি কিন্তু আমার কাজের ক্ষেত্র জনস্বাস্থ্য গবেষণা, অধ্যাপনা। কাজের সূত্রে দেশের ও দেশের বাইরের চিকিৎসা জগৎটিকে পর্যবেক্ষণ করার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এ প্রসঙ্গে কিছু মন্তব্য করছি।
দেখতে পাই, মোটাদাগে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ত্রিমুখী। এক, ডাক্তাররা অর্থপিপাসু; দুই, ডাক্তাররা গ্রামবিমুখ; তিন, ডাক্তারদের ব্যবহার অসংবেদনশীল। এমন ডাক্তারই বেশি নাকি স্বল্প কয়েকজন, তা নিয়ে সংখ্যাতাত্ত্বিক বিতর্ক চলতে পারে কিন্তু গড়পড়তাভাবে ডাক্তার পেশাটির ব্যাপারে এ রকম একটি ধারণা সমাজে জারি আছে। দেশের বিবিধ পেশা নিয়ে বিতর্ক প্রায়ই হয়। কিন্তু লক্ষ করি, ডাক্তারবিষয়ক বিতর্কে মানুষের আবেগ, ক্ষোভ বেশ একটা উচ্চগ্রামে গিয়ে পৌঁছায়। ব্যাপারটা বোধগম্য। ডাক্তারের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তার সবচাইতে জরুরি সম্পদ শরীরের সঙ্গে। একজন মানুষ তার জীবনের সবচেয়ে নাজুক, হতবিহ্বল সময়টিতে চিকিৎসকের মুখোমুখি হয়। পৃথিবীতে আর কোনো পেশা নেই, যারা মানুষের জীবন-মৃত্যুকে এভাবে হাতের মুঠোয় পায়। আর কোনো পেশা নেই, যাদের কাছে মানুষ নিজেকে এভাবে সর্বান্তকরণে সমর্পণ করে। ফলে এই শক্তিমান পেশাটির কাছে মানুষের আদর্শিক দাবি সীমাহীন। এই দাবি পূরণের ব্যর্থতার দায় ডাক্তাররা এড়াতে পারেন না, সে কথা মেনে নিয়েও বলতে চাই, এই সংকটের বীজ এবং সমাধান কোনোটিই শুধু এই পেশার গণ্ডির ভেতর সীমিত নয়। এর ডালাপালা আছে বৃহত্তর সামাজিক প্রেক্ষপটে। কথাটি নতুন নয়। তবু লক্ষ করি, উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে ব্যাপারটিকে হয় রোগীর পক্ষ, না হয় ডাক্তারের পক্ষ—এমন একটি সাদা-কালো প্রেক্ষাপটে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়।
ডাক্তারদের অর্থলিপ্সু ও ধনাঢ্য বলে একটা পরিচয় তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমি এমন অনেক ডাক্তারকে জানি, যাঁরা রোদে ঘেমে, বাসে-রিকশায় চড়ে উপজেলা বাজারে রোগী দেখে মাস শেষে যা উপর্জন করেন, তা কোনো করপোরেট অফিসের শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে থাকা তাঁর চেয়ে অর্ধেক বয়সী কোনো তরুণ কর্মকর্তার চেয়ে কম। এমন অসংখ্য নবীন ডাক্তারকে জানি, যাঁরা পাস করে যে বেতনে বিভিন্ন ক্লিনিকে কাজ করেন, তা অনেক বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অফিস সহকারীর বেতনের সমান। তবে স্বাস্থ্যসেবার সিংহভাগ যখন থাকে ব্যক্তিমালিকানাধীন, তখন চিকিৎসাও হয়ে ওঠে সম্ভাবনাময় এক বাণিজ্য। কারণ চিকিৎসকের হাতে থাকে বাণিজ্যের মোক্ষম এক পুঁজি, মানুষের মৃত্যুভয়। যে ডাক্তাররা এই পুঁজিকে ব্যবহার করতে চান, তাঁরা দুর্ধর্ষভাবেই তা করতে পারেন। চিকিৎসা বাণিজ্যের পাকচক্রে পড়ে রোগীদের সঙ্গে এমন ডাক্তারের দেখাই হয় প্রায়শ। আর এই লোভনীয় চিকিৎসার বাজারে হাজির হন অন্য সওদাগরেরাও। কমিশনের গোপন ফাঁদ নিয়ে আসেন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকেরা, উপহারের পসরা নিয়ে বসেন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির লোকেরা, যাঁরা সবাই ডাক্তার নন। এই বাজারে ধনবান রোগীরাও তাঁদের প্রতিভা দেখান। চিকিৎসা হয়ে দাঁড়ায় তাঁদের বৈভব প্রদর্শনীর উপায়। সামান্য অসুস্থতায়ও তারা পাঁচতারা হাসপাতালের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হন। এভাবে সবাই মিলেই বেশ একটা জমজমাট চিকিৎসা বেসাতির আসর বসান। একটা লাগামহীন বাজারি অর্থনীতির রাষ্ট্রকাঠামোতে মানুষের কাজ এবং মনের গতি মোটা দাগে ধাবিত হয় একটি দিকেই, অর্থ উপার্জন করা। এবং তা অঢেল, যেকোনো উপায়ে এবং যত দ্রুত সম্ভব। এমন একটি সমাজে ডাক্তারদের আগ্রাসী ব্যবসায়ী হওয়ার বিপুল সুযোগ থাকে। যাঁরা সেই সুযোগ নিতে চান, সমাজের রাজপথ, গলি-ঘুপচি কোথাও এমন কোনো আদর্শ-নৈতিকতার ট্রাফিক নেই যা তাকে বাধাগ্রস্ত করবে। কিন্তু মুক্তবাজার অর্থনীতির অনেক দেশেই ডাক্তারদের আচরণের লাগাম টানার নানা ব্যবস্থা আছে। আছে রোগীর অধিকারবিষয়ক কঠোর আইন। পশ্চিমা দেশের ডাক্তারদের দেখেছি, মামলায় পড়ে যাওয়ার ভয়ে সদা সন্ত্রস্ত থাকতে। প্রাচ্যের অনেক দেশেও দেখেছি ডাক্তারদের জবাবদিহির সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া। কিন্তু ডাক্তারদের বিরুদ্ধে কর্তব্যে অবহেলার জন্য আইনি ব্যবস্থার নজির বাংলাদেশে বিরল। আর দেশে ডাক্তারদের পেশাগত আচরণ নিশ্চিত করবে যে সংস্থা, তারা তো মূলত ব্যস্ত থাকে ডাক্তারদের রাজনৈতিক আনুগত্য নিশ্চিত করা এবং সে অনুযায়ী পদ, বদলি ইত্যাদি বিলিবণ্টনে।
গ্রামবিমুখতা ডাক্তারদের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় অভিযোগ। আমরা বেশ ভালো জানি যে গ্রামের রস নিংড়ে যাবতীয় জৌলুস, মজা আর সুবিধাগুলো জড়ো করা হয়েছে শহরে। প্রত্যাশাটা কি তাহলে এই যে শহরের মূল প্যান্ডেলে বসে সবাই যখন সার্কাস দেখবেন, ডাক্তাররা তখন গ্রামে আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত থেকে দূর থেকে শুধু বাদ্য-বাজনা শুনবেন? বলা বাহুল্য, ডাক্তাররা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে শুধু হাজির থাকলেই রোগী সুস্থ হয়ে ওঠে না। চালক গাড়িতে গিয়ে বসলেই গাড়ি চলতে শুরু করে না, তার পেট্রল চাই, মবিল চাই। প্রয়োজনীয় ওষুধবিহীন, যন্ত্রপাতিবিহীন, নার্সবিহীন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে উপস্থিত থেকে ডাক্তারদের এক অসম্ভব অবস্থা সামাল দিতে হয়। তার পরও যে গুটিকয় ডাক্তার নানা প্রতিকূলতার মধ্যে প্রত্যন্ত গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে থেকেছেন, তার বিনিময়ে প্রশাসন তাঁকে কোনো স্বীকৃতি, মর্যাদা দিয়েছে বলে নজির নেই। বরং দেখেছি, যিনি গ্রামে গিয়ে থেকেছেন, তিনি পেশাগতভাবে অতল গহ্বরে তলিয়েছেন শুধু। অতএব, গ্রামে যাওয়ার ব্যাপারে ডাক্তারদের পেশাগত কোনো প্রণোদনা নেই। এ দেশের ডাক্তারদের জবাবদিহিরও কোনো ভয় নেই। কারণ তাঁর জবাবদিহি জনগণের কাছে নয় বরং তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের চিকিৎসক সংগঠনটির কাছে। তবে গ্রামাঞ্চলে ডাক্তারদের অনুপস্থিতি শুধু আমাদের নয়, আরও অনেক উন্নয়নশীল দেশেরই সমস্যা। এ কারণে অনেক দেশে পেশাগত জীবনের শুরুতে ডাক্তারদের গ্রামে থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, কিন্তু সে জন্য দেওয়া হয়েছে উচ্চশিক্ষাসহ, নানা পেশাগত প্রণোদনা। এ ছাড়া যেসব দেশে স্বাস্থ্য খাতে জনবলের ঘাটতি আছে, সেখানে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার জন্য ডাক্তারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা হয়েছে। গ্রামাঞ্চলের নানা অপেশাদার, আধা পেশাদার স্বাস্থ্যসেবাদানকারীদের মান নিয়ন্ত্রণ সাপেক্ষে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ডাক্তারদের ব্যাপারে তৃতীয় অভিযোগ তাঁদের অসংবেদনশীল ব্যবহার নিয়ে। যে সমাজে অবিরাম একে অন্যের প্রতিযোগী, সেখানে মানুষের মানবিক সংবেদনশীলতা ভোঁতা হয়ে আসে। কিন্তু বহু দেশেই এ অবস্থায়ও ডাক্তারদের মানবিক গুণাবলি সমুন্নত রাখার নানা প্রশিক্ষণ থাকে। সংবেদনশীলতা একটি চর্চার বিষয়, প্রশিক্ষণেরও বিষয়। পৃথিবীর অনেক দেশে চিকিৎসা পেশাকে জনসম্পৃক্ত করার জন্য জনস্বাস্থ্য, চিকিৎসা, সমাজবিজ্ঞান, এমনকি শিল্পসাহিত্যসহ বিভিন্ন মানবিক বিদ্যাও পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মানবিক বিদ্যা মানুষের ঔদ্ধত্যকে নিয়ন্ত্রণ করে, তাকে সংবেদনশীল মানুষ করে তোলে। আমাদের দেশে সাধারণভাবে শিক্ষার প্রবণতা মানুষকে জনবিচ্ছিন্ন করে তোলা। যিনি যত বেশি শিক্ষিত, তিনি আমজনতা থেকে ততটা দূরে। আমাদের ডাক্তারি শিক্ষাক্রমে ছাত্রদের রোগ, চিকিৎসা ইত্যাদিকে বৃহত্তর সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে দেখার কোনো শিক্ষা নেই। ফলে তাঁরা মানুষের ভেতর রোগীটাকে চিনতে পারলেও রোগীর ভেতর মানুষটাকে আর চিনতে পারেন না।
বৃহত্তর সমাজের দোহাই দিয়ে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোকে খাটো না করেও বলা যায়, পেশা বা ব্যক্তির চরিত্র বহুলাংশে নির্ভর করে রাষ্ট্রের চরিত্রের ওপর। কাচের বাটিতে শস্যের বীজ রেখে দিলে তা থেকে শেকড় গজায় না; তার জন্য মাটি চাই, পানি চাই। আমাদের দেশেরই অগণিত ডাক্তারকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেখেছি অসাধারণ সাফল্যের সঙ্গে কাজ করতে। কিন্তু নিজ দেশে তাঁরা হয়ে উঠেছেন খলনায়ক। রাষ্ট্রের চরিত্র যত দিন না পাল্টাচ্ছে, এর ভেতরও স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি নানা পদক্ষেপে ডাক্তারদের অবস্থার গুণগত পরিবর্তন ঘটানো যায়। কিন্তু সে আলোচনার সুযোগ এখানে নেই। এইটুকু বলা যায়, ডাক্তার পেশাটির একটি স্পষ্ট রূপকাঠামো তৈরি না করে একের পর এক মেডিকেল কলেজ খুললে, স্বাস্থ্যসেবা খাতটিকে আরও বেশি মাত্রায় ব্যক্তিমালিকানায় ঠেলে দিলে ডাক্তার-রোগীর বৈরীভাব আরও বাড়বেই। আর রোগী ও ডাক্তার যদি পরস্পরের শত্রু হয়ে ওঠে, তাহলে ক্ষতি তো দুই পক্ষেরই।
শাহাদুজ্জামান: কথাসাহিত্যিক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।
zaman567@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.