বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিদদের রাজনীতি by ড. খুরশীদা বেগম

প্রতিপক্ষের নির্মম নির্যাতনে ২০১২ সালের ৯ জানুয়ারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের স্নাতক সম্মান ইংরেজি বিভাগের ছাত্র জুবায়ের আহমেদের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। সেদিন দেশের মেধাসম্পদ থেকে খসে পড়ে আরেকটি প্রভাতি মেধা।


'আরেকটি' বলা হলো এ কারণে যে বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আজ বহুদিন একের পর এক সংঘটিত হয়ে চলেছে মেধাবী কিশোর-তরুণদের এ রকম অস্বাভাবিক মৃত্যু। এমন সব অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, ঘটনাক্রম মাত্র। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার পারিপাশ্বর্িকতা মারাত্মক তারুণ্যদূষণে বিপর্যস্ত। সংঘাত-সংঘর্ষে, নির্যাতন-রক্তপাতে, দুর্নীতি-দুরাচারে চরিত্রহীনতার বিস্তর আবর্জনা জমেছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে। নিহত-আহত, পঙ্গু-অনাচারী সন্তানদের জন্য হাহাকার করে কাঁদছেন মা-বাবা, সহপাঠীরা আহাজারি করছে, দায়িত্ববান শিক্ষাবিদদের মাথা নিচু, দেশবাসী হতভম্ব। কাতর নাগরিক বিবেক লিখছেন, 'আমরা লজ্জা পাচ্ছি।' 'কী হয়েছে উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে?' প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্র সূত্রে, শিক্ষাঙ্গন হচ্ছে 'It (school) is a hermitage amid sylvan surroundings beyond the distractions of urban life functioning in solitude and silence. ...It also operates as a protective sheath, shutting out unwholesome influences. It operates as a restraining force.'
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রসূন মেধাগুলোকে আগলে রেখে প্রস্ফুটিত করে দিতে পারছে না কেন? শিক্ষার্র্থী সন্তানরা আতঙ্কে দাবি জানাচ্ছে, 'চাই সন্ত্রাসমুক্ত শিক্ষাঙ্গন, চাই স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি।' শিক্ষার্র্থীদের নবীন কণ্ঠে সতর্কতার আহ্বান, 'শিক্ষা-সংস্কৃতি-মনুষ্যত্ব ধ্বংসের চক্রান্ত রুখে দাঁড়ান।' প্রবীণ সমাজ আর কবে এই চক্রান্তকারী উৎসগুলো চিহ্নিত করবে? সমাজে ক্রমাগত গালাগাল খাওয়া আজকের এই নষ্ট প্রজন্ম কি মায়ের কোলেই নষ্ট ছিল? প্রখ্যাত রাষ্ট্র দার্শনিক রুশো বলছেন,
'(Human being) is by nature good, but becomes bad on account of the corrupt institutions which an unnatural civili�ation creates.'
অস্ত্রহাতে প্রতিপক্ষের প্রতি ধাবমান, টেন্ডারের বাঙ্ বগলে, চাঁদা আদায়ে উদ্যত নষ্ট শিক্ষার্থীর জন্য যে কঠিন শাসন আবশ্যক, সে সূত্রে একটি বাংলা গানের প্রথম কয়েকটি কলি দ্বারা প্রশ্ন, 'বাবার পকেট মারলে পরে ছেলেরে ধরে বেত মারো,/তোমরা যেসব বুড়ো ছেলে দেশের পয়সা লুট করো,/তার বেলা? তার বেলা? তার বেলা?' বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিদ হিসেবে নিজের ছাত্রদের অপরাধ স্নেহান্ধ হয়ে আড়াল করার জন্য নয়, বরং ছুরি, চাপাতি, পিস্তল, টেন্ডারের বাঙ্, চাঁদার থলে, অযৌক্তিক মৌলবাদী টুপি, জ্ঞানবিমুখতা, মানহীন শিক্ষাদীক্ষার ছাইভস্মে কিম্ভূতকিমাকার চেহারার এই সদ্য নবীন মেধাবী ছাত্রদের হাত ধরে টেনে এনে নাগরিক সমাজের সামনে দাঁড় করিয়ে একজন অসহায় শিক্ষাবিদ হিসেবে প্রশ্ন, এরা বিপথগামী কেন? যারা হাত-পা-মাথায় বেড়ে উঠছে মাত্র কয়দিন, যাদের কাচস্বচ্ছ দুই চোখে বুদ্ধিদীপ্ত ঊষা, যাদের এখন ক্ষুব্ধ-সুন্দর মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যাওয়ার কথা, তারা এমন ভয়ংকর খুনে, নির্যাতক, চোর-ছ্যাঁচড় কেন? মেধা-মস্তিষ্ক হত্যার নীলনকশা এ দেশে একাত্তর থেকে আর কত দূর বিস্তৃত? ১২ অক্টোবর ১৯৯৩ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক ড. খন্দকার মুস্তাহিদুর রহমান, সাবেক সম্মানীয় উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, লিখিত বক্তব্যে বলেন, 'একদল বিবেকহীন, মনুষ্যত্বহীন, পেশিবাজের কাছে জিম্মি করে জাতিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে।' প্রাজ্ঞ শিক্ষাবিদরা নির্দেশিত এই ভয়াবহ সত্য সূত্রে এক্ষণে দুটি প্রশ্ন, (এক) অল্পবয়সী তরুণ ছেলেরা মনুষ্যত্বহীন, বিবেকহীন হলো কেন? (দুই) একটি মুক্তিসংগ্রামী মহান জাতি ও জনগোষ্ঠীকে 'কে' ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে? এই প্রশ্ন সূত্রেই 'Corrupt Institution-সহ দুর্বহ নানা ব্যক্তি-গোষ্ঠী স্বার্থকেন্দ্রিক অবস্থানের প্রসঙ্গ অনিবার্য এবং সেই সূত্রে বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক রাজনীতি নিয়ে আলোচনা। সংক্ষেপে এই রাজনীতির প্রধান দুটি ধারা, বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে রাজনীতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি। বক্ষ্যমান নিবন্ধে আলোচ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিদদের রাজনীতির বিষয়ে লেখিকার গবেষণা গ্রন্থ, 'বিধ্বস্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ... একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ' (প্রকাশিতব্য মে, ২০১২) থেকে প্রয়োজনীয় সামান্য অংশ নিচে তুলে দেওয়া হলো : বিশ্ববিদ্যালয়ে বয়ঃসন্ধিকালের অস্থিরমতি কিন্তু মেধাবী কিশোর-তরুণ শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চা, উচ্চমার্গীয় জ্ঞানভিত্তিক দক্ষতা-যোগ্যতা অর্জন, মানস কাঠামো বিন্যাস, চরিত্র গঠন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা-দীক্ষার পারিপাশ্বর্িকতা রক্ষায় প্রতিজন শিক্ষাবিদের। অন্য কথায় প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে সব শিক্ষাবিদের দায়বদ্ধতা অনস্বীকার্য। শিক্ষাবিদরা শিক্ষক সমিতি ও বিভিন্ন গ্রুপ গঠনপূর্বক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থসহ পেশা স্বার্থরক্ষায় স্বার্থগোষ্ঠী হিসেবে স্বাভাবিক নিয়মে তৎপর থাকেন।
শিক্ষাবিদদের তৎপরতার পিছে আরো যে একটি উপাদান নিয়ামক ভূমিকা পালন করে তা উচ্চাকাঙ্ক্ষা। এর প্রধান দুটি দিক, প্রথমত পেশাগত, যেমন_গবেষণার সুযোগ প্রাপ্তি, পদোন্নতি ইত্যাদি। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে ও সরকারি প্রশাসনে নানাবিধ পদ/প্রতিষ্ঠা লাভ। প্রথমটির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বিতাজনিত কোনো কোন্দল অপ্রত্যাশিত হলেও অস্বাভাবিক না এবং তা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি, শিক্ষাপর্ষদ, সিন্ডিকেট বা দেশের বিচার বিভাগ ইত্যাদির মাধ্যমে প্রতিকার করা সম্ভব। কিন্তু যখন পেশাগত এসব বিষয়সহ পদ-প্রতিপত্তি লাভের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণে নির্ধারক হয় জাতীয় পর্যায়ের কোনো বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও অবস্থান তখন শিক্ষাবিদমণ্ডলীর উল্লেখযোগ্য অংশের চরম রাজনীতিকীকরণ (Politicization) ঘটে। শিক্ষাবিদদের রাজনীতিকীকরণের আরেকটি যে নিয়ামক রয়েছে, তা সভ্যতা নির্মাণের শাশ্বত মূল্যবোধে স্থিত চেতনা। অর্থাৎ নিজস্ব কোনো সংকীর্ণ স্বার্থে নয়; দেশ, গণমানুষ ও বিশ্বের কোনো কল্যাণের স্বার্থে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দর্শন, উদ্দেশ্য, অবস্থান দ্বারা শিক্ষাবিদদের রাজনীতিকীকরণ ঘটে। এরূপ রাজনীতিকীকরণ পর্যায়ে কখনো কোনো শিক্ষাবিদের ক্ষেত্রে যদি প্রাজ্ঞজন হিসেবে দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠা লাভের উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রণোদনা হিসেবে কাজ করে, তবে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পারিপাশ্বর্িকতায় ক্ষতিকর না। মেধা ও শ্রমের বিনিয়োগে, আত্মমর্যাদা ও আস্থাবোধে জগতের মাঙ্গলিক মূল্যবোধকে সমুন্নত রেখে উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের প্রয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ক্ষতিকর না, বরং তা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলপ্রসূ ইতিবাচক প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহ সৃষ্টি করে। শিক্ষার্থীদের জন্য এটি দৃষ্টান্ত স্বরূপ। কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় যখন তা কেবল নিছক পদ/প্রতিপত্তি লাভে নানারূপ অলিগলি-কানাগলি হাতড়ে বেড়ায়। এসব পথেই মুখ থুবড়ে পড়ে জ্ঞান ও শিক্ষা, নীতি ও ন্যায়বোধ, ব্যক্তিত্ব ও চরিত্র। এ পথেই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে ছলচাতুরী ও অভিসন্ধি, নানারূপ যোগসাজশ ও সুযোগ-সুবিধার লেনদেন। এরূপ দৃষ্টান্তে শিক্ষার্থীদের সামনে অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব সংকট ঘটে।
১৯৭১-এ স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে রাজনীতিকীকরণ ঘটেছিল, এক অর্থে সর্বোতভাবে তা ছিল একটি ইতিবাচক রাজনীতিকীকরণ, যার মাহ@ে@@@্য একদিকে ভাস্বর হয়ে উঠেছিল শিক্ষার্থী-শিক্ষাবিদদের মানব মুক্তি ও স্বাধীনতা যুদ্ধের দর্শন। অন্যদিকে ঘটেছিল স্বাধীনতাযুদ্ধের জন্য সশস্ত্র-নিরস্ত্র প্রত্যক্ষ গণসংযোগ ও রণাঙ্গনের তৎপরতা। ১৯৭৫, বঙ্গবন্ধু হত্যা পরবর্তীকাল থেকে জনজীবন উৎসগত নিয়মিত রাজনৈতিক দল, আওয়ামী লীগ, জাসদ, বাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি ইত্যাদির প্রতি সমর্থন এবং অবৈধ সৈনিক শাসন উৎসগত বিএনপি, সৈনিক শাসক ও তাদের অনুগামীদের প্রত্যক্ষ প্রয়াসে পুনর্বাসিত দেশের স্বাধীনতাবিরোধী মৌলবাদী জামায়াতের প্রতি সমর্থন বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-শিক্ষাবিদদের রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রধান নির্ধারক। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ ও বিপক্ষ, জনজীবন ও সৈনিক শাসকের স্বৈরাচার উৎসগত অবস্থানের সমান্তরাল সক্রিয় রাজনীতির দুর্বিষহ গোঁজামিলের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধারার রাজনীতি ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ে নানারূপ বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষবিদদের আর একটি ধারার রাজনীতি উল্লেখযোগ্য। এটি পেশাজীবনের কোনো ক্ষোভ, ঈর্ষা, সুবিধা লাভ, ব্যক্তিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ক্ষমতার জন্য চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী বা 'Pressure Group' হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাব-প্রতাপ ও প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যগত ঐক্যবদ্ধতা। দেখা যায়, পরস্পরবিরোধী বা সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর রাজনৈতিক আদর্শ-বিশ্বাসের শিক্ষাবিদরা (নিজেদের পক্ষে যে রাজনৈতিক বিশ্বাস তারা প্রচার করেন) সংগঠিত হয়েছেন। এটি একটি Marriage of Convenience বা সুবিধা বিবাহের মঞ্চ-এর অনুরূপ। এরূপ গোষ্ঠীবদ্ধতার দুই বা অধিক স্তর থাকতে পারে। ওপর স্তরে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ রক্ষামূলক বক্তব্য থাকে, যা অনেক সময় নিপুণ দক্ষতায় বিজ্ঞাপন চিত্রের মতো ব্যবহৃত হয় গণসমক্ষে। কেননা এর পরবর্তী নিচের স্তরে থাকে ব্যক্তিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা পূরণের প্রত্যাশা। তার নিচের স্তরে থাকে গোষ্ঠীবদ্ধ শিক্ষাবিদদের কারো কারো নিজ নিজ রাজনৈতিক আদর্শ-বিশ্বাস অনুযায়ী জাতীয় পর্যায়ে সক্রিয় রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাব-প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার তৎপরতা। এই নেতিবাচক রাজনীতিকীকরণের চরম অবস্থায় সাধারণের অলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থই প্রাধান্য হারায় যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাত বা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম ঘটে, কোটি কোটি টাকার ক্ষতি সাধিত হয়। সাম্প্রতিককালে কেবল ছাত্ররাজনীতি নয়, শিক্ষক রাজনীতিও বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রশ্নবিদ্ধ বটে। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশ্রয়ে বেঁচে থাকেন, বেড়ে ওঠেন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়েই ব্যক্তি/গোষ্ঠী/রাজনৈতিক স্বার্থে অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌল স্বার্থকে বিপর্যস্ত করেন নির্দ্বিধায়। উপলব্ধির বিষয় এই যে, মানবমুক্তির জন্য শিক্ষা-দীক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা বিন্যাসে স্বাধীনতার পক্ষ-বপক্ষ, গণতান্ত্রিক ও একনায়কতান্ত্রিক শাসন এবং ধর্মনিরপেক্ষ বামচিন্তা ও মৌলবাদী চরম ডান চিন্তা ইত্যাদি পরস্পরবিরোধী চিন্তা-চতনার সমর্থক শিক্ষাবিদদের একমঞ্চে সম্মিলন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের জ্ঞানমার্গে অন্তর্নিহিত গভীর উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের স্বার্থে কখনো সম্ভবপর নয়। অপ্রিয় সত্য এই যে, প্রায় তিন যুগব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সংঘাত, হানাহানি, রক্তপাত এবং শিক্ষার্থী, শিক্ষাবিদদের খুন হওয়ার মতো একের পর এক ঘটনা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নির্দেশ করছে না। স্মরণ করা যেতে পারে, গেল শতকের ষাটের দশকে একনায়ক সৈনিক শাসক ও মৌলবাদীদের কর্তৃক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জোহা'সহ শিক্ষার্থী হত্যা, একাত্তরে জানা-অজানা অগণিত শিক্ষার্থী-শিক্ষাবিদ হত্যা। ধর্মনিরপেক্ষতা-মৌলবাদিতা, জঙ্গিবাদ-শান্তিবাদ, স্বাধীনতার দর্শন ও স্বাধীনতার বিরোধিতা ইত্যাদি ব্যক্তিক রাজনৈতিক বিশ্বাসে ও কাগজে-কলমে, তর্কে-বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকলে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব। কিন্তু যখন তা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা লাভের উদ্দেশ্যগত হয়, তখন দ্বন্দ্ব অনিবার্য। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে এটাই ঘটছে। এখানে সম্প্রসারিত 'একাত্তরের' যুদ্ধ।
লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

No comments

Powered by Blogger.