দূরদেশ-তিউনিসিয়া: শেষ দৃশ্য মঞ্চায়নের অপেক্ষা by আলী রীয়াজ

তিউনিসিয়ার গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনাপরম্পরা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। জনরোষের মুখে দেশের প্রেসিডেন্ট জয়নুল আবেদিন বেন আলী সপরিবারে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হলেও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিবর্তন ঘটেনি। ২৩ বছর ধরে চলা স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের সুবিধাভোগী দল ও ব্যক্তিরা ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকার চেষ্টা করছেন।


তিউনিসিয়ার এই অকস্মাৎ গণ-অভ্যুত্থানের পর সারা বিশ্বের গণমাধ্যমে সাংবাদিক ও বিশ্লেষকেরা বলতে শুরু করেছেন, উত্তর আফ্রিকা ও আরব বিশ্বে একনায়কী বা একদলীয় শাসনের মৃত্যুঘণ্টা বেজে উঠেছে। এই বিপ্লব এখন ওই অঞ্চলের অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়বে বলে তাঁদের আশা। আশা এই যে, এ ঘটনার পর এই অঞ্চলের শাসকেরা শিক্ষা নেবেন এবং গণতন্ত্রের সুবাতাস বইতে শুরু করবে। আলজেরিয়া ও মিসরে ছোট আকারে হলেও একই ধরনের প্রতিবাদ-বিক্ষোভের কারণে এ ধরনের মন্তব্যকে মনে হচ্ছে বাস্তবসম্মত। কিন্তু তিউনিসিয়ার অভ্যুত্থানের শেষ দৃশ্য এখনো মঞ্চায়িত হয়নি বলে বাছবিচারহীনভাবে এ ধরনের আশাবাদীদের মিছিলে শরিক না হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
উত্তর আফ্রিকার অন্য আরেকটি দেশ, তিউনিসিয়ার প্রতিবেশী আলজেরিয়াতে ১৯৮৮ সালে একই ধরনের বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে সে দেশে গণতন্ত্রায়ণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। দ্রুত গণতন্ত্রের প্রক্রিয়া দেশের ভেতরে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে টানাপোড়েনের সূচনা করে। ক্ষমতার ভেতরে ও বাইরে যেসব সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি ছিল তাদের দ্বন্দ্ব ও সংঘাত, ইসলামপন্থীদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির পটভূমিকায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯২ সালে। এই নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের আসন্ন বিজয় মোকাবিলা করতে ঘটে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ। তার পরিস্থিতি কিন্তু দেশটির জন্য শুভ হয়নি। এক দশক ধরে চলা গৃহযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন হাজার হাজার মানুষ, দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বদলে আরেক ধরনের স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আলজেরিয়ার মানুষের গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি দুই দশক পরও।
আলজেরিয়ার ঘটনাপ্রবাহের সংক্ষিপ্ত বর্ণনার উদ্দেশ্য একটাই—কোনো দেশের গণতন্ত্রায়নের পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়। দেশের ভেতরে যে শক্তি আছে তাদের দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও ভারসাম্যই নির্ধারণ করে দেশটি কোন পথে অগ্রসর হবে। তিউনিসিয়ার ঘটনার পর যাঁরা রাতারাতি একটি গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থার আশা করছেন, তাঁরা বোধ করি আরেকটু অপেক্ষা করলে ভালো করবেন। তিউনিসিয়ার অতীত ইতিহাসও বলে, তিউনিসিয়ার জনগণ এর আগেও বিক্ষোভ করেছে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণ দিয়েছে। ১৯৭৮ সালের জানুয়ারি মাসের বিক্ষোভের পর দেশের রাজনীতিতে একধরনের বহুদলীয় ব্যবস্থা চালু হয় ১৯৮১ সালে, ১৯৮৪ সালের জানুয়ারিতে বিক্ষোভ হয়েছে, ১৯৮৬-৮৭ সালে ঘটেছে শ্রমিক বিক্ষোভ, ১৯৯০ সালের শেষ পর্যায়ে ক্ষমতাসীন সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক র‌্যাালির (ফরাসি নামের আদ্যক্ষর অনুযায়ী আরসিডি) কার্যালয়ে হামলা হয়েছে। অনেকেরই জানা আছে, দেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট হাবীব বরগুইবার কাছ থেকে ১৯৮৭ সালে বেন আলী রক্তপাতহীন প্রাসাদ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতা নিয়েছিলেন পরিবর্তন ও গণতন্ত্রায়ণের প্রতিশ্রুতি দিয়েই। সাধারণ মানুষও তাঁকে স্বাগত জানিয়েছিল। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে ২০০৮ সালেও দেশের বিভিন্ন শহরে সহিংসতা ও বিক্ষোভ সংঘটিত হয়। এসব ঘটনার পরিণতিতে তিউনিসিয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি। তবে এসব অভিজ্ঞতায় তিউনিসিয়ার মানুষ সমৃদ্ধ হয়েছে এবং সে কারণেই বেন আলীর দেশত্যাগের পর যেনতেন প্রকারে একটা ‘পরিবর্তন’ দেখানোর চেষ্টাকে তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। বড় ধরনের পরিবর্তনের আসার জায়গাটা এখানেই। কিন্তু গোটা রাষ্ট্রকাঠামো ও শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তনের সম্ভাবনা ও সমস্যা বুঝতে হলে তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক শক্তিগুলো সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার। তিউনিসিয়ায় কার্যত একদলীয় ব্যবস্থা চলেছে দেশটির স্বাধীনতার পর থেকেই। ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত হাবীব বরগুইবা এক ব্যক্তিশাসন প্রত্যক্ষ করেছে তিউনিসিয়া, তার পরের ২৩ বছর চলেছে বেন আলীর শাসন। দলগতভাবে আরসিডিই ক্ষমতায় থেকেছে। ১৯৮১ ও ১৯৮৯ সালে দুই দফায় বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে কয়েকটি সরকার-সমর্থক দলকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। ফলে তিউনিসিয়ায় কখনোই প্রকৃত সরকারবিরোধী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠেনি। একমাত্র ব্যতিক্রম হচ্ছে ইসলামপন্থী একটি দল। এ অবস্থায় দেশের রাজনীতিতে সক্রিয়, জনগণের কাছে পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য কোনো নেতা বা দল সেখানে অনুপস্থিত।
তিউনিসিয়ার রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে এমন শক্তি রয়েছে চারটি। প্রথম এত দিনকার ক্ষমতাসীন আরসিডি, দ্বিতীয় দেশের সেনাবাহিনী, তৃতীয় জেনারেল ইউনিয়ন অব তিউনিসিয়ান ওয়ার্কার্স (ইউজিটিটি) এবং চতুর্থ দেশের ইসলামপন্থী দল হেজব-আল-নাহাদা (পুনর্জাগরণের দল)। আরসিডি এ মুহূর্তে জনরোষের মুখে থাকলেও ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না যে ৫০ বছর ধরে ক্ষমতাসীন দলের অনুগত ও সুবিধাভোগীর সংখ্যা কম নয়। ইকোনমিস্ট পত্রিকার ভাষ্য ধরে বলতে পারি, আলী বাবা নেই, কিন্তু চল্লিশ চোরের কী হবে? এই দল ও তার অনুসারীরা পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন পেয়ে এসেছে এই যুক্তিতে যে তারা তিউনিসিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করেছে, শিক্ষার প্রসার ও নারীর অধিকার সমুন্নত রেখেছে, ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থা চালু রেখেছে। সর্বোপরি দেশে ইসলামি চরমপন্থী মোকাবিলায় সাফল্য দেখিয়েছে। এসব যুক্তির পেছনে সত্যতা নেই, তা নয়; তবে তার পাশাপাশি এটাও বলা দরকার, এর কিছু কিছু সরকারি অতিরঞ্জিত প্রচারণাও বটে। পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন যে তার পরও বেন আলীর সরকার ও তাঁর পরিবারের দুর্নীতি নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিল, উইকিলিকসের কল্যাণে আমরা তাও জানি। এখন পর্যন্ত তিউনিসিয়ার সেনাবাহিনী প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেনি। বেন আলী তাঁর শাসনামলে সেনাবাহিনীর চেয়ে বেশি নির্ভর করেছেন তাঁর তৈরি করা মিলিশিয়া বাহিনীর ওপর। ডিসেম্বর মাসে দেশে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর সেনাবাহিনী কার্যত বেন আলী সরকারকে সমর্থন জোগায়নি। তারা বিক্ষোভ মিছিলে গুলিবর্ষণে অস্বীকার করে, যখন মিলিশিয়া সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালাচ্ছিলেন, তখন তারা ঘোষণা করে যে জনসাধারণ যেন সরাসরি সেনাবাহিনীকে এ ধরনের ঘটনা জানায়; বেন আলী সেনাবাহিনীর ওপর এতটাই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন যে দেশত্যাগের আগে সেনাবাহিনীর প্রধানকে পদচ্যুত করেন। তিউনিসিয়ার রাজধানীতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সেনাবাহিনী জনগণের পাশাপাশি থেকেছে। এসব থেকে বোঝা যায়, সেনাবাহিনী এই পরিবর্তনের সময় দর্শক হতে রাজি নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, ভবিষ্যতে তারা কী ভূমিকা পালন করবে। আলজেরিয়ায় ১৯৯১ সালে সেনাবাহিনী যখন ক্ষমতার পথে পা বাড়িয়েছিল, তখন তারা প্রথম নির্বাসিত ভিন্ন মতাবলম্বী মোহাম্মদ বউদিয়াফকে প্রথম ক্ষমতায় বসিয়েছিল। বউদিয়াফ আততায়ীর হাতে নিহত হলে সেনাবাহিনী সরাসরি ক্ষমতা গ্রহণ করে।
তিউনিসিয়ার তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি হলো দেশের একমাত্র ট্রেড ইউনিয়ন-ইউজিটিটি। সংগঠনটির ইতিহাস দীর্ঘ হলেও গত ৫৪ বছরে তাদের ভূমিকায় রয়েছে উত্থান-পতন। ১৯৭৮ সালে দেশে প্রথম বড় ধরনের বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিয়েছিল ইউজিটিটি। সে জন্য তাদের বড় ধরনের ক্ষতি স্বীকার করতে হয়—৫০ জন কর্মী নিহত হন, মহাসচিবসহ ২০০ জন নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হন। মহাসচিব হাবীব আকর দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। ১৯৮০ সালে প্রেসিডেন্ট তাঁকে ক্ষমা প্রদান করেন এবং তিনি মুক্তি পান। ১৯৮১ সালের নির্বাচনে ইউজিটিটি যে ফ্রন্ট গঠন করে তার শরিক ছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল। শুধু তা-ই নয়, সংগঠনটি সেই থেকে ক্ষমতাসীনদের সমর্থনই জুুগিয়েছে। দেশের একমাত্র ট্রেড ইউনিয়ন হিসেবে তাদের স্বীকৃতি থেকেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। ১৯৮৮ সালে ইউনিয়ানিস্ট ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (ইউডিইউ) গঠিত হলে ইউজিটিটি তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে। কিন্তু জানুয়ারি মাসে গণ-আন্দোলন শুরু হলে ট্রেড ইউনিয়নের নেতারা তাকে সমর্থন দেননি। যখন বিক্ষোভকারীদের ওপর রাজপথে পুলিশি হামলা চলছিল, ইউজিটিটির নেতারা তখনো বেন আলীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বেন আলী দেশত্যাগ করার পর ‘ঐক্য সরকার’-এ তাঁরা যোগ দিতে রাজি হন। পরে তাঁদের তিন সদস্যই মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ফলে ইউজিটিটি-ট্রেড ইউনিয়ন হলেও তাদের আদর্শিক অবস্থান রাষ্ট্রকাঠামো ও শাসনব্যবস্থা বদলের অনুকূল কি না, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। দেশের রাজনীতির চতুর্থ শক্তি হচ্ছে একমাত্র ইসলামপন্থী দল হেজব-আল-নাহাদা। এর নেতা রাশিদ আল ঘানুুশি, যিনি দীর্ঘদিন লন্ডনে নির্বাসিত জীবন যাপন করেন।
তিউনিসিয়ায় ইসলামপন্থী সংগঠনের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয় ইসলামি প্রবণতা আন্দোলনকে (ফরাসি নামের আদ্যক্ষর অনুযায়ী, যা এমটিআই বলে পরিচিত)। ১৯৮১ সালে এর যাত্রা শুরু। এই সংগঠনের নেতারা দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজজীবনে ইসলামি আদর্শের বাস্তবায়নের দাবি জানান, শরিয়া আইন প্রচলনের জন্য তাঁরা হাবীব বরগুইবার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন এবং অভিযোগ করেন যে ইসলামি দেশগুলো পশ্চিমা বিশ্বের সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদের শিকার হয়েছে। সরকার অভিযোগ করে, দলটি দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। এই দলের নেতৃস্থানীয় ইমামরা উত্তেজনাকর বক্তব্য দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ ওঠে।
১৯৮১ সালে রাশিদ আল ঘানুশি ও এমটিআইর নেতাদের আটক করা হয় এই অভিযোগে যে তাঁরা দেশে উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা করছেন। আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে আনা মামলার রায়ে রাশিদ ঘানুশিকে ১২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এমটিআই ও ঘানুশির কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে সরকার সমালোচনার মুখোমুখি হয়। ১৯৮৪ সালে ঘানুশিকে ক্ষমা প্রদর্শন করে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। এমটিআইর অনেক নেতা তখন কারাগারে আটক থাকলেও ঘানুশির মুক্তির পর দল আবারও সংগঠিত হতে শুরু করে।
তিন বছর পর দেশে আবার অস্থিরতার সূচনা হয়। কয়েকটি বোমাবাজির ঘটনা ছাড়াও সরকার দাবি করে, ইসলামপন্থী দল ও গোষ্ঠী সরকার উৎখাত করতে ষড়যন্ত্র করছে। সরকার আবার এমটিআই এবং তার নেতা রাশিদ আল ঘানুশির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। এমটিআইর বিরুদ্ধে আনা মামলায় মোট ৫৭ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। মামলায় সাতজনকে প্রাণদণ্ড দেওয়া হয়, ১৩ জন খালাস পান এবং বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড দেওয়া হয়। রাশিদ আল ঘানুশি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন।
মামলার রায়ে হাবীব বরগুইবা কেবল অসন্তুষ্টই ছিলেন না, তিনি জোর দেন যে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পুনর্বিচারের মুখোমুখি করা হোক। তিনি মনে করেন, ইসলামপন্থী নেতাদের যথেষ্ট কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়নি। বিশেষ করে, রাশিদ আল ঘানুশিকে মৃত্যুদণ্ড না দেওয়ায় তিনি আদালতের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। এই রায় নিয়ে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর ভেতরে মতপার্থক্য তুঙ্গে ওঠে। হাবীব বরগুইবার ঘনিষ্ঠজনেরা তখন অভিযোগ করেন, তিনি প্রেসিডেন্ট থাকার মতো শারীরিকভাবে সুস্থ নন। এই পটভূমিকাতেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জয়নুল আবেদিন বেন আলী হাবীব বরগুইবাকে সরিয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করেন ১৯৮৭ সালে।
১৯৮৯ সালে বেন আলী সীমিত আকারে বহুদলীয় পদ্ধতি চালু করলে সাবেক এমটিআই নেতারা দল পুনর্গঠন করেন এবং এর নাম দেন হেজব-আল-নাহাদা। এর আগে ১৯৮৮ সালে রাশিদ ঘানুশিকে মুক্তি দেওয়া হয়। হেজব-আল-নাহাদা ও এর ছাত্রসংগঠনকে কাজ করতে দেওয়া হলেও ১৯৮৯ সালের নির্বাচনে তাদের দলগতভাবে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি, কেননা জাতীয় ঐকমত্যের যে চুক্তি হয়, তাতে ধর্মকে রাজনীতির বাইরে রাখতে সব দলই অঙ্গীকার করে। নির্বাচনে হেজব-আল-নাহাদার সমর্থকেরা নির্দলীয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং কমপক্ষে ১৫ শতাংশ ভোট পান। কোনো কোনো এলাকায় তাঁরা ৩০ শতাংশ ভোটও পান।
১৯৯০ ও ১৯৯১ সালে সরকার ও ইসলামপন্থীদের মধ্যে ছোট ছোট অনেক সংঘর্ষের পরিণতিতে সরকার সংগঠনটি নিষিদ্ধ করে, নেতাদের আটক করে এবং ১৯৯২ সালে তাদের সামরিক আদালতে বিচার করে। হেজব-আল-নাহাদার নেতারা তাঁদের সাজার মেয়াদ পূর্ণ করেন কিংবা সরকারি অনুকম্পার কারণে ২০০৪ সালের মধ্যে মুক্তি লাভ করেন। কিন্তু দলটি অনেকাংশেই দুর্বল হয়ে পড়ে। বিগত বছরগুলোতে দলের কার্যক্রমে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য লক্ষ করা গেছে। তিউনিসিয়া থেকে পাওয়া কোনো কোনো খবরে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক অভ্যুত্থানে দলের কর্মীরা প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছেন।
দেশের এই চারটি রাজনৈতিক শক্তিকেন্দ্রকে ঘিরে ছোটখাটো দল আছে, আছে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা। গণতন্ত্রকামী ও পরিবর্তনপ্রত্যাশী মানুষের আশাও ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু সব মিলিয়ে এই দলগুলোর মধ্যকার শক্তির ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করবে তিউনিসিয়ার ভবিষ্যৎ কী। তিউনিসিয়ার এই গণ-অভ্যুত্থান যাঁদের আশাবাদী করে তুলেছে, তাঁদের অনেকে এই শঙ্কাকে ঝেড়ে ফেলতে পারছেন না যে পরিবর্তনের বদলে কেবল জোড়াতালি দিয়ে পুরোনো ব্যবস্থাই চালু থাকবে। পুরোনো ব্যবস্থার ইতিবাচক দিকগুলো বহাল রেখে মানুষের রুটি-রুজির সমস্যার সমাধান ও গণতন্ত্রের স্বপ্ন পূরণ সম্ভব হবে কি না, তা দেখার জন্য অনেকেই অপেক্ষমাণ।
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

No comments

Powered by Blogger.