অভিবাসী শ্রমিক-প্রবাসীদের দুঃখগাথা প্রধানমন্ত্রী শুনবেন কি? by শরিফুল হাসান

একটু ভালো থাকবেন, পরিশ্রম করে টাকা পাঠিয়ে পরিবারে সচ্ছলতা ফেরাবেন, বদলে ফেলবেন ভাগ্যের চাকা—এমন স্বপ্ন নিয়ে প্রতিবছর লাখ লাখ বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে যান। কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই স্বপ্ন আর বাস্তবতা দূরে থেকে যায়। সারা দিন কাজ করেও তাঁরা অভিবাসন খরচের টাকাটাও তুলতে পারেন না। একসময় এই কর্মীরা বুঝতে পারেন, তাঁরা শুভংকরের ফাঁদে পড়েছেন। ফেরার পথ নেই।


মালয়েশিয়ায় চার থেকে পাঁচ লাখ বাংলাদেশি এখন এই আশাভঙ্গের বেদনায় দুঃসহ দিন কাটাচ্ছেন। কতটা কষ্টে, কতটা অমানবিক পরিবেশে তাঁরা থাকেন, তা দেখলে চোখ ভিজে আসে। দিনে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা কাজ, এরপর কারখানার পেছনে বস্তির মতো ঘরে গাদাগাদি করে ঘুমানো, পুলিশের গ্রেপ্তারের ভয়—সব মিলিয়ে চরম দুঃসময় পার করছেন তাঁরা।
প্রবাসীদের দুরবস্থার কথা জানতে ১৪ ডিসেম্বর মালয়েশিয়ায় যাই। কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেই দেখা হয় সাত-আটজন বাংলাদেশি তরুণের সঙ্গে। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কথা বলার চেষ্টা করি। কিন্তু তাঁরা ভয়ে কথাই বলতে চাইলেন না। তাঁদের সঙ্গে থাকা একজন জানালেন, পর্যটক হিসেবে মালয়েশিয়ায় বেড়াতে যাচ্ছেন। পরে জানলাম তিনি দালাল। বাজার বন্ধ থাকায় ছাত্র ও পর্যটক পরিচয়ে এভাবে অনেক বাংলাদেশিকে নেওয়া হচ্ছে মালয়েশিয়ায়। বিমানবন্দরে কোনো ঝামেলা হয় না, এমন প্রশ্নের জবাবে জানালেন, ঢাকা ও কুয়ালালামপুর—দুই জায়গাতেই পুলিশকে টাকা দিতে হয়।
এশিয়ার অন্যতম সমৃদ্ধ দেশ মালয়েশিয়া। রাস্তার দুই পাশে আকাশছোঁয়া সব অট্টালিকা, অসংখ্য ফ্লাইওভার, প্রশস্ত সব সড়ক দেখে মুগ্ধ হতে হয়। কিন্তু এমন একটি দেশে অধিকাংশ বাংলাদেশি শ্রমিকের দিনের বেশির ভাগ সময় কাটে কর্মক্ষেত্রে। সকাল থেকে সন্ধ্যা, কখনো কখনো রাত পর্যন্ত তাঁরা কাজ করেন। এরপর কারখানার পেছনে বস্তির মতো অন্ধকার কতগুলো খুপরি ঘরে রাত কাটান তাঁরা। থাকার ঘরগুলো দেখলে মনে হবে, কোনো উদ্বাস্তু শিবির কিংবা বন্দিশালার প্রকোষ্ঠ।
প্রবাসীরা জানালেন, মালয়েশিয়ার চার লাখ বাংলাদেশির প্রধান সমস্যা—কারও বৈধ ভিসা নেই। বিশেষজ্ঞ ও পেশাদার ছাড়া মালয়েশিয়ার সব সাধারণ শ্রমিককে এক বছরের জন্য ভিসা দেয় মালয়েশিয়ার অভিবাসন অধিদপ্তর। প্রতিবছর এই ভিসা নবায়ন করতে হয়। কিন্তু ২০১০ সাল থেকে কোনো বাংলাদেশি শ্রমিকের ভিসা নবায়ন করছে না মালয়েশিয়া। বিশেষ করে ২০০৭ ও ২০০৮ সালে কলিং ভিসায় যে চার লাখ বাংলাদেশি এসেছেন, তাঁদের নতুন করে ভিসা দেওয়া হচ্ছে না। তাই সব সময় তাঁদের থাকতে হচ্ছে পুলিশ-আতঙ্কে।
কুয়ালালামপুরের কোতারিয়া এলাকার অধিকাংশ দোকান ও রেস্তোরাঁ চালান বাংলাদেশিরা। সব দোকানের সাইনবোর্ড বাংলায়। বাংলাদেশ মার্কেট হিসেবে পরিচিত এলাকাটি একসময় দিন-রাত মুখরিত থাকত বাংলাদেশিদের পদচারণে। কিন্তু এখন সন্ধ্যার পর প্রায় জনশূন্য হয়ে যায় এলাকাটি। কারণ ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া বাংলাদেশিরা পুলিশ-আতঙ্কে বের হন না।
১৬টি দেশের প্রায় ২৫ লাখ শ্রমিক মালয়েশিয়ায় কাজ করেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে দুরবস্থায় আছেন বাংলাদেশিরা। বাংলাদেশ থেকে সরকারিভাবে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার খরচ ৮৪ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু শহরে-গ্রামে থাকা দালালদের কারণেই একজন শ্রমিককে মালয়েশিয়ায় আসতে খরচ করতে হয়েছে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা।
মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত চার বছরে মালয়েশিয়া এসেছেন চার লাখ ৩৮ হাজার ৬৪০ জন বাংলাদেশি শ্রমিক। গড়ে দুই লাখ টাকা খরচ ধরলে এই বাংলাদেশি শ্রমিকদের খরচ হয়েছে আট হাজার ৭৭২ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, গত পাঁচ অর্থবছরে মালয়েশিয়া থেকে প্রবাসী-আয় (রেমিট্যান্স) এসেছে এক হাজার ১৪১ মিলিয়ন ডলার বা সাত হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা।
ছয় লাখ শ্রমিক চার বছরে সাত হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা পাঠালে গড়ে একজন শ্রমিক পাঠিয়েছেন এক লাখ ৩৩ হাজার ৬৬ টাকা। এই হিসাবে এক বছরে পাঠানো টাকার পরিমাণ ৩৩ হাজার টাকা এবং মাসে প্রায় তিন হাজার টাকা। অর্থাৎ একজন শ্রমিক তিন বছরের চুক্তিতে দুই লাখ টাকা খরচ করে এসে চার বছরে মাত্র এক লাখ ৩৩ হাজার টাকা পাঠাতে পেরেছেন।
১৬ দিন মালয়েশিয়ায় যত প্রবাসী বাংলাদেশির সঙ্গে কথা হয়েছে, সবাই এই বৈধতার বিষয়টিকেই বড় সমস্যা মনে করছেন। তাঁরা জানালেন, রাস্তাঘাটে পুলিশ ধরে টাকা নেয়। টাকা না দিলে থানায় নিয়ে যায়। সবচেয়ে বড় ভয় মালয়েশিয়ার রেলা (অভিবাসন পুলিশ)। তারা রাতে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালায়। যাকে-তাকে ধরে নিয়ে যায়। তাদের ভয়ে বাড়ি থেকে লাফ দিয়ে অনেকের হাত-পাও ভেঙেছে।
প্রবাসীদের কাছে ভয়াবহ আতঙ্কের নাম রতান (বেত মারা)। ভয়ে গা শিউরে ওঠে রতানের বর্ণনা শুনে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ৬ ডিসেম্বর ‘এ ব্লো টু হিউম্যানিটি: টর্চার বাই জুডিশিয়াল ক্যানিং ইন মালয়েশিয়া’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, ক্যাম্প বা কারাগারে ৫০ থেকে ৬০ জনকে একসঙ্গে রেখে মধ্যযুগীয় কায়দার বেত মারা হয়। চার ফুট লম্বা ও এক ইঞ্চি মোটা এই বেতের প্রচণ্ড এক আঘাতেই অধিকাংশ মানুষ অজ্ঞান হয়ে যান। শরীরের চামড়া কেটে যায়, রক্ত জমাট বেঁধে যায়। জ্ঞান ফেরে ১২ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর। গত আট বছরে অন্তত ৫০ হাজার বন্দীকে এভাবে বেত মারা হয়েছে। তাঁদের বেশির ভাগই বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের অভিবাসী শ্রমিক।
মালয়েশিয়ার মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানাল, বাংলাদেশিদের অন্যায়ভাবে এই বেত মারা হচ্ছে। কারণ খুন, ধর্ষণসহ মোট ৬৬ ধরনের অপরাধের শাস্তি হিসেবে বেত মারা হয়। ২০০২ সালে অভিবাসন বিষয়টি এতে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও কোনো বাংলাদেশি শ্রমিক অবৈধভাবে সে দেশে ঢোকেননি। তাঁদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে মাত্র, কিন্তু কোনো বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করা হলে কিংবা জেলে নেওয়া হলে দূতাবাস থেকে কোনো সহায়তা পাওয়া যায় না। এ ছাড়া কোনো বাংলাদেশি বন্দীকে আদালতে নেওয়া হলেও অধিকাংশ সময় আইনজীবী বা অনুবাদক পান না তাঁরা। ফলে একতরফাভাবে শাস্তি পেতে হয়।
প্রবাসীদের অভিযোগ, বাংলাদেশ দূতাবাসে গিয়ে অপদস্থ হতে হয়। পাসপোর্ট পাওয়া, নবায়ন থেকে শুরু করে সব জায়গাতেই দুর্ভোগে পড়তে হয়।
বিদেশে শ্রমিক পাঠানো নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। একটি বিষয় যদি আমরা মাথায় রাখতে পারি, মালয়েশিয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের মতো দেশে শ্রমিক লাগবেই। আর বাংলাদেশি শ্রমিকদেরও কাজের সুনাম আছে। কাজেই আমরা গণহারে শ্রমিক না পাঠিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রমিক পাঠাতে হবে। এ জন্য তাঁদের একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের বেতন, মোটামুটি থাকা-খাওয়ার পরিবেশ—এসব বিষয় আমরা দাবি করতে পারি। সরকারের উচিত সেখানকার চার লাখ বাংলাদেশিকে বৈধ করার ব্যাপারে জোর প্রচেষ্টা চালানো।
আরেকটি বিষয়, যেকোনো মূল্যে অভিবাসন খরচ কমাতে হবে। শ্রমিক নিতে হলে তাঁদের সব খরচ, উড়োজাহাজ ভাড়া, ভালো বেতন দাবি করতে পারে বাংলাদেশ। নেপাল, ভারত, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা সব দেশই তো তা-ই করছে। শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায়ও তারা সোচ্চার।
কয়েক বছর আগে মালয়েশিয়ায় কয়েকজন ভারতীয় শ্রমিককে মারধর করে সে দেশের পুলিশ। তৎকালীন হাইকমিশনার বীণা সিক্রি ঘটনাটি জানতে পেরে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে জানান। এরপর ভারত মালয়েশিয়ার সঙ্গে সব ফ্লাইট বাতিল ও বাণিজ্য বন্ধ করে দেয়। ভারতের এই দৃঢ় অবস্থানের কারণে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী পুলিশের আচরণের জন্য ক্ষমা চান এবং প্রতিশ্রুতি দেন, ভবিষ্যতে এমন আর হবে না। অন্যান্য দেশ যদি তাদের নাগরিকদের মর্যাদা রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে, আমরা কেন পারব না?
আরেকটি বিষয়, মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশে গড়ে ওঠা দালালপ্রথা ভাঙতে হবে। এই দালালেরাই মানুষগুলোকে সর্বস্বান্ত করছে। মালয়েশিয়ার যাঁরা বাংলাদেশিদের আনার নামে অবৈধ বাণিজ্যে জড়িত ছিলেন, তাঁদের বিচার করেছে সে দেশের সরকার। মালয়েশিয়ার অভিবাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ওয়াহিদও গ্রেপ্তার হয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশে যেসব দালাল এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাঁদের কোনো বিচার হয়নি। উল্টো বাংলাদেশ থেকে মন্ত্রী-সাংসদেরা মালয়েশিয়ায় এসে তাঁদের সঙ্গে তারকা হোটেলে গল্প করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রবাসী শ্রমিকদের দাবি, কলিং ভিসা নিয়ে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য বন্ধ হোক, দালালদের বিচার হোক। তাহলে ভবিষ্যতে কেউ প্রতারণা করার সাহস পাবেন না।
মালয়েশিয়া এসে চার লাখ বাংলাদেশি এখন চরম যন্ত্রণায় আছেন। দেশে ফেরারও কোনো রাস্তা নেই তাঁদের। বাড়ির কথা মনে করে, স্বজনদের কথা মনে করে তাঁরা গুমরে কাঁদেন। কিন্তু মোবাইলে স্বজনদের বলতে হয়, ‘মালয়েশিয়ায় ভালো আছি। শিগগিরই আবার টাকা পাঠাব।’
সংবাদ সংগ্রহের কাজে গিয়েছিলাম। সংবাদ পেয়েছিও। কিন্তু দেশে ফিরতে হয়েছে এক বুক কষ্ট নিয়ে। বারবার ঘুরেফিরে মনে পড়ছিল ৫০ বছরের নির্মাণশ্রমিক নূর মোহাম্মদের আহাজারির কথা, ছাত্র হিসেবে যাওয়া ১৯ বছরের তরুণ রাকিব আহসানের কথা। তাঁরা বলছিলেন, ‘দেশে বাবা-মা পরিবার-পরিজনকে কষ্টের কথা, সমস্যার কথা বলতে পারি না। বললে তাঁরা দুশ্চিন্তা করবে। আপনি শোনেন। প্রধানমন্ত্রীকে গিয়ে বলেন।’ কিন্তু তাঁদের কী করে বোঝাই, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দেশ-জাতির কত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। আর আমার মতো একজন সাংবাদিকের পক্ষেও তাঁর কাছে যাওয়া সহজ নয়। তাই এই লেখার মাধ্যমেই প্রবাসীদের দুঃখগাথা প্রধানমন্ত্রীকে জানালাম।
শরিফুল হাসান: জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, প্রথম আলো।
hasan06du@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.