সদরে অন্দরে-বর্জ্যের নিচে আর কত জীবন যাবে by মোস্তফা হোসেইন

দেড় কোটি মানুষের ব্যবহৃত দ্রব্যের উচ্ছিষ্ট যাচ্ছে ঢাকার আশপাশের পাঁচ নদীর পেটে। পরিমাণটা নেহাত কম নয়_গড়ে দৈনিক চার হাজার মেট্রিক টন। যদি ট্যানারি ও কল-কারখানার বর্জ্যের পরিমাণ যোগ করা হয়, মাথা ঘুরে যাওয়ার মতো অবস্থা হতে পারে তা দেখে। এর পরিমাণ ৪০ হাজার মেট্রিক টন প্রতিদিন।


কত আর ধারণক্ষমতা বালু, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গার? নদীর গভীরতা কমছে ক্রমেই। কারণ বর্জ্যগুলো নদীর তলদেশে জমা হতে হতে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি করছে। বুড়িগঙ্গা নাব্যতা হারিয়েছে। নাব্যতা হারিয়েছে অন্য নদীগুলোও। জানা যায়, একমাত্র বুড়িগঙ্গার তলদেশে ১০ ফুট স্তর পড়েছে অবিনাশী বর্জ্যের কারণে। অন্যগুলোর অবস্থা এতটা ভয়াবহ না হলেও শুকনো মৌসুমে সেখানে নৌযান চলতেও কষ্ট হয়।
রান্নাঘর থেকে শুরু করে পয়ঃপ্রণালিতে যত দূষিত তরল পদার্থ আছে, সবই যায় নদীগর্ভে। যায় কঠিন পদার্থও। মিলছে দেড় শতাধিক ট্যানারিশিল্প থেকে বের হওয়া বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ। যদি বলা হয় অন্য আরো কারখানার কথা? সবটারই বর্জ্যের গন্তব্য এসব নদী। আর নদীগুলো যেহেতু নির্বাক, যেহেতু এগুলোর প্রতিবাদী কণ্ঠ নেই, তাই মানুষ ইচ্ছামতো এগুলোর ওপর অত্যাচার চালিয়ে যেতে পারছে নিয়মিত।
যে নদী একসময় এই ঢাকা শহরের মানুষের ব্যবহারের পানি সরবরাহ করত, যে নদীতে মানুষ একসময় নিরাপদে গোসল করতে পারত, সেই নদীর পানি এখন মানুষই শুধু নয়, অন্যান্য প্রাণীর জন্যও বিষাক্ত তরল পদার্থে পরিণত হয়েছে। নদীর পানি বিষাক্ত হতে হতে এমন পর্যায়ে পেঁৗছেছে যে এখন ঢাকার আশপাশের নদীগুলোতে নিরাপদ পানি খুঁজে পাওয়া সাগর পাড়ি দেওয়ার চেয়েও কঠিন ব্যাপার। তার পরও বুড়িগঙ্গার ওপর দিয়ে লঞ্চ যায়। মানুষ নাকে রুমাল গুঁজে দেয় আলকাতরার মতো রঙের পানি থেকে আসা দুর্গন্ধ সামাল দিতে। আর যাদের এই নদীর পানি দিয়েই সংসার চালাতে হয় তাদের অবস্থাটা কী? কিংবা যারা এত সব জেনেও এই নদীতেই গোসল করতে বাধ্য হয়, তাদেরই বা কী পরিণতি ভোগ করতে হয়?
ট্যানারি থেকে আসা ক্রোমিয়াম নামের রাসায়নিক পদার্থ মানবদেহে ক্যান্সার ছড়াতে ওস্তাদ। টঙ্কি কেমিক্যালগুলো মানুষের চোখের সামনেই মিশে যাচ্ছে নদীর পানিতে। যেমন মিশছে হাইড্রোজেন সালফাইড, অ্যামোনিয়া, বিষাক্ত ক্লোরিন কিংবা নাইট্রোজেনের মতো আরো কিছু গ্যাস। ট্যানারির বর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থ কী পরিমাণ ক্ষতি করছে পানির, এর একটি প্রমাণ পাওয়া গেছে এক গবেষণায়। দেখা গেছে, ১৯ ঘনফুট পানিতে তিন শতাধিক কেমিক্যাল কম্পাউন্ড পাওয়া গেছে এই ঢাকার নদীবক্ষ থেকে।
কারখানাগুলো মানুষের প্রয়োজন মেটায়। আর সেই প্রয়োজন মেটানোর জন্য সেখানে যে বিষ তৈরি হচ্ছে, তা মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সেখানে মানুষের সুবিধার জন্য মানুষ খুন হচ্ছে। এমন বলা গেলেও খুনিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার উপায় নেই। আরো সোজা করে বলতে গেলে, এই খুনিদের খুনি হিসেবে সম্বোধন করারও সুযোগ নেই।
অথচ এই ঢাকার মানুষগুলোর কথা ভাবার জন্য আছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। তারা কি ভাবছে এ নিয়ে? সিটি করপোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর, ওয়াসা_এমন আরো কিছু বিভাগ আছে সরকারের। তাদের কি কোনোই দায় নেই এ বিষয়ে? অথচ এই ঢাকার মানুষের সেবার জন্য গঠিত হয়েছে ওয়াসা। গঠিত হয়েছে সিটি করপোরেশন। মোগল আর নবাবরা এই নদীগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণ করেছে, মানুষের উপকারের চিন্তা করে। ফলে তাদের পক্ষে নদীর কাছ থেকে গ্রহণ করার সুযোগই ছিল। তাকে নষ্ট করার প্রয়োজন হয়নি। ওয়াসার সৃষ্টি অনেক পরে_১৯৬৩ সালে। ওয়াসাকে কেন্দ্র করে কিংবা মহানগরের উন্নয়নের জন্য মাস্টারপ্ল্যান হয়েছে খুবই ধীরে। আর বাস্তবায়নের কথা যদি বলা হয়, তাহলে দুরবস্থাগুলোই প্রমাণ করে কী হাল সেই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের।
দেড় কোটি মানুষের দেখভাল করার জন্য সিটি করপোরেশন দায়িত্বপ্রাপ্ত। সেই সিটি করপোরেশন নিজেও বর্জ্য ফেলে কোথাও কোথাও। আধুনিক ব্যবস্থা নেই তাদের সেই বর্জ্যব্যবস্থাপনায়। এই আধুনিক জমানায় এসেও সিটি করপোরেশনের আওতায় কিলোমিটারের পর কিলোমিটার খোলা ড্রেন রয়েছে এই ঢাকায়। ডাস্টবিনগুলো থেকে ময়লা-আবর্জনা সরানোর গাড়ি থাকলেও ডাম্পিং স্টেশনগুলোর আশপাশে বিষ ছড়াচ্ছে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে। ব্যবহৃত সিরিঞ্জ থেকে শুরু করে বিভিন্ন কেমিক্যালের পরিত্যক্ত অংশ, ওষুধ, এমনকি অপারেশনের পর কেটে ফেলা মানুষের শরীরের বিভিন্ন অংশও মিশছে এই ঢাকার নদীতে।
পরিবেশবাদীদের আন্দোলন ও বিষাক্ততায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আহাজারি_কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত আদালতের রায়ের অপেক্ষা করতে হলো। সর্বশেষ হাইকোর্ট কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েছেন। বুড়িগঙ্গা নদীতে সংযোগ হওয়া সব পয়ঃপ্রণালি ও শিল্প-কারখানার বর্জ্য নিষ্কাশন লাইন বন্ধ করতে ওয়াসার চেয়ারম্যানকে পদক্ষেপ নিতে বলেছেন আদালত। সিটি করপোরেশনের ভ্যান কিংবা গাড়ির মাধ্যমে যেভাবে নদীর তীরে ময়লা ফেলা হচ্ছে, তা বন্ধ করতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একটি বেসরকারি সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ-এর দায়ের করা রিট পিটিশনের রুলের শুনানি শেষে আদালত এই নির্দেশ দেন। বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী এবং বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরকে নিয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ এই রায় দেন। এর মধ্যে আশার বাণী হিসেবে আরেকটি তথ্য আমরা জানতে পেরেছি জাতীয় সংসদের অধিবেশনে দেওয়া পরিবেশ ও বন প্রতিমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের বক্তব্য থেকে। জানা গেছে, রাজধানীর চারপাশের শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গা, বালু ও তুরাগ নদীর পানি দূষণের জন্য দায়ী ৮২০টি প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ১৩০টির বিরুদ্ধে এরই মধ্যে মামলা দায়ের করা হয়েছে। আশা করা যায়, সরকার অবস্থানে অটল থাকবে। নদীদূষণের হাত থেকে রক্ষা করার জন্যই হাজারীবাগের ট্যানারিশিল্প স্থানান্তরের দায়িত্বটাও অতি দ্রুত পালন করা হবে।
mhussain_71@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.