অচেনা লোকেরা হারিয়ে গেছে শেয়ারবাজার থেকে by তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু,

বানরের উপদ্রবে অতিষ্ঠ ছিল গ্রামবাসী। ওই গ্রামে হঠাৎ একদিন আগমন ঘটাল এক অচেনা লোকের। লোকটি ১০ টাকা দামে গ্রামের বানরগুলো কিনে নেওয়ার ঘোষণা দিল। গ্রামের লোকজন হুমড়ি খেয়ে পড়ল বানর ধরতে। তারা বানর ধরে ধরে ওই অচেনা লোকের কাছে বিক্রি শুরু করল।মাঠের কাজ ফেলে এভাবে প্রায় ২০০ বানর ধরে ওই অচেনা লোকের কাছে বিক্রি করল। লোকটি বানর কিনে খাঁচায় পুরে রাখল। এরপর গ্রামে বানরের সংখ্যা কমে গেল। লোকটি ২০ টাকা দরে বানর কেনার ঘোষণা দিল। এভাবে আরো ৩০টি বানর কিনতে সক্ষম হলো। এরপর গ্রামে আর কোনো বানর খুঁজে পাওয়া গেল না।


অচেনা লোকটি ৫০ টাকা দরে বানর কেনার ঘোষণা দিল। এ সময় আরেকজন অচেনা লোক হাজির হলো ওই গ্রামে। সেই লোকের কাছে সে ৩৫ টাকা দরে দুটি বানর বিক্রি করল। নতুন অচেনা লোকটি ওই গ্রামের একজনের কাছে সেটা ৪০ টাকা দরে বিক্রি করল। গ্রামের লোকটি সেটা আবার প্রথম অচেনা লোকের কাছে ৫০ টাকা দরে বিক্রি করে দিল। দ্বিতীয় লোকের কাছ থেকে এভাবে ৪০ টাকা দরে বানর কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ল গ্রামবাসী। প্রথম অচেনা লোকের কাছ থেকে দ্বিতীয় লোকটি সব বানর কিনে নিল ৩৫ টাকা দরে। দ্বিতীয় লোকটির কাছ থেকে ৪০ টাকা দরে গ্রামবাসী একে একে সেই ১০ টাকা দামের বানরগুলো কিনে নিল। এর পর তারা যখন সেটা প্রথম অচেনা ব্যক্তির কাছে বিক্রি করতে গেল_তাকে আর খুঁজে পেল না। দ্বিতীয় অচেনা ব্যক্তিকে খুঁজতে গিয়ে দেখে সেও নেই। গ্রামটি আবার বানরময় হয় উঠল।
টানা দরপতনে বিক্ষুব্ধ বিনিয়োগকারীরা গতকাল মঙ্গলবার যখন ঢাকা স্টক এঙ্চেঞ্জের সামনে বিক্ষোভ করছিলেন, তখন অনেকটা নিভৃতে দাঁড়িয়ে মিজানুর রহমান নামের এক বিনিয়োগকারী তাঁর মতোই দেউলিয়া আরেক বিনিয়োগকারী কামাল হোসেনকে গল্পটি শোনাচ্ছিলেন। মিজানুর রহমান লেনদেন করেন এনসিসি মার্চেন্ট ব্যাংকে। কামাল ব্রাক ইপিএলে। মিজানুর রহমান বললেন, 'আমরা সবাই গ্রামবাসী। আর অচেনা লোক দুজন বাজারের কারসাজি চক্র। যার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে বাজার সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি অনেক খ্যাত-বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির নাম।' জনাব কামাল বললেন, আবার অচেনা লোকগুলো গ্রামে ফিরবে, সেদিনই হয়তো বানরগুলো বিক্রি হবে। জনাব মিজান বললেন, তারা আর কোনো দিন ফিরবে না। পাশ থেকে এ গল্প শুনে কালের কণ্ঠের এ প্রতিবেদক এগিয়ে যান দুই বন্ধুর কাছে। এ প্রতিবেদককে মিজানুর রহমান বললেন, 'ভাই, বাজার কি কখোনো আর ফিরবে না। আর যারা আমাদের কাছে বানরগুলো বিক্রি করল, তাদের কি কোনো ঠিকানা নেই?'
গতকাল ঢাকা ঢাকা স্টক এঙ্চেঞ্জের সাধারণ মূল্যসূচক আগের দিনের চেয়ে ২২৫.৫৪ পয়েন্ট কমে ৫২৯৩.৩১ পয়েন্টে স্থির হয়েছে। তিন দিনের টানা দরপতনের ডিএসইর সূচক কমেছে ৪৩৪.৪৯ পয়েন্ট। ডিসেম্বরে শুরু হওয়া বিপর্যয়ের পর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সূচক সর্বনিম্ন ৫২০৩.০৮ পয়েন্টে নামে। এরপর সরকারের নানা পদক্ষেপ ও অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার ঘোষণায় এ পতনের ধারা থেকে একটু একটু ঘুরে দাঁড়াতে থাকে শেয়ারবাজার। গত ২৪ জুলাই সর্বোচ্চ ৬৭১০.৫৩ পয়েন্টে ওঠে ডিএসইর সূচক। এরপর অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে নানা বিভ্রান্তি ও ভয়-ভীতি তৈরি হয়। শেয়ারবাজারে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ বন্ধ থাকে। প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগকারীরা গুটিয়ে রাখেন তাঁদের হাত। নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এঙ্চেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) বিভিন্নমুখী পদক্ষেপে বাজার মাঝে-মধ্যে মাথা উঁচু করে; কিন্তু আবার ফিরে যায় পতনের ধারায়।
গত জুলাই থেকে গতকাল পর্যন্ত ডিএসইতে সূচকের পতন হয়েছে ১৪১৭.২২ পয়েন্ট। আর ৬ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘ দরপতনের পর গতকাল পর্যন্ত ডিএসইর সূচক কমেছে ৩৬২৫.২৫ পয়েন্ট। উল্লেখ্য, গত ৫ ডিসেম্বর ডিএসইতে সর্বোচ্চ লেনদেনের রেকর্ড হয়। এর পর থেকেই শুরু হয় ধারাবাহিক দরপতন। এদিন ডিএসইর সূচক ছিল ৮৯১৮.৫১ পয়েন্ট। এদিন থেকেই বানর কেনা সেই অচেনা লোকের মতো বাজার থেকে হারিয়ে যেতে থাকে কারসাজি চক্র।

No comments

Powered by Blogger.