প্রাণবৈচিত্র্য- বাইক্কা বিল কি পর্যটনকেন্দ্র? by মোকারম হোসেন

মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলা থেকে বাইক্কা বিলের দূরত্ব ১৮ কিলোমিটার। ১৮ কিলোমিটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কাঁচা সড়ক। মূলত সড়কের এই অংশটুকুই বাইক্কা বিলের প্রতিবেশব্যবস্থা হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। পথটি দৃশ্যত ও কার্যত দুটি সমস্যা তৈরি করেছে।
এক. হাইল হাওরে স্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি করে হাওরের প্রবহমানতা বিনষ্ট হওয়া, দুই. বাইক্কা বিলের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পথ ত্বরান্বিত করা। হাওরে এ ধরনের সড়ক নির্মাণ কি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল! আমরা জানি স্থায়ী কোনো বসতির জন্য সাধারণত পথঘাট তৈরির প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু এখানে আদতে কোনো জনগোষ্ঠীর বসবাস নেই। অথচ দেশের কোথাও কোথাও হাজার হাজার মানুষকে পথ ও সেতুর সংকট পোহাতে দেখা যায়। যাতায়াতব্যবস্থার এমন সংকট যখন আমাদের নিত্যসঙ্গী, তখন জলমগ্ন হাওরের বুক চিরে এমন একটি পথ নির্মাণ সত্যিই বাড়াবাড়ির শামিল। বড় প্রশ্ন, পথটি কাদের প্রয়োজনে তৈরি হলো?
বাইক্কা বিলের সর্বনাশ ডেকে আনার জন্য অনেকেই দায়ী। ব্যাপক লেখালেখি করে স্থানটিকে জোরপূর্বক একটি পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করার চেষ্টা করা হয়েছে। হাওরের বুক চিরে নির্মিত দীর্ঘ পথের দুই ধারে তেমন কোনো বসতি নেই। হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার চোখে পড়ে, তাও নতুন বসতি। সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ, পথের দুই ধারের বিস্তীর্ণ হাওরে আড়াই শতাধিক মৎস্য খামার গড়ে উঠেছে। বিশাল এলাকাজুড়ে থাকা এসব খামারে অসংখ্য বাঁধ তৈরি করে শুরু হয়েছে রমরমা মৎস্য ব্যবসা। তৈরি হচ্ছে আরও নতুন নতুন অবকাঠামো। হাওরের শত শত একরের এই জায়গাগুলোতে শুধু বোরো চাষের অনুমতি থাকলেও অননুমোদিতভাবেই বানানো হয়েছে এই খামারগুলো। এ ধরনের প্লাবনভূমিতে কোনো ধরনের স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করতে হলে জেলা প্রশাসনের অনুমতি লাগে। কিন্তু এসবের তোয়াক্কাই করেনি খামারগুলো। একসময় দীর্ঘ কাঁচা পথটি শেষ হলো। অটোরিকশার চালক গাড়ি থামিয়ে ডান দিকে বিলের পথটি দেখিয়ে দিলেন। সামনেই একটি সুবিশাল মৎস্য খামার। খামারটি প্রায় বাইক্কা বিলের ভেতরেই। ওদিকে আবার একটি সুসজ্জিত দালানের অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে! হায়রে বাইক্কা বিল! আমরা দ্রুত বিলের পথ ধরি। পথের দুই পাশে ঢোলকলমি আর মটমটিয়ার ঝোপ। ঝোপের ভেতর ডাহুক ডাকছে তীব্র স্বরে। হাঁটতে হাঁটতেই পেয়ে যাই কম বয়সী সুবিন্যস্ত হিজল-করচের বাগান।
আরেকটু ডান দিকে ঘুরলেই পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। প্রায় বিলের ভেতরে অবস্থিত টাওয়ারটির গায়ে একটি তথ্যফলক ঝুলছে। তাতে লেখা: বাইক্কা বিল স্থায়ী অভয়াশ্রম, ব্যবস্থাপনায় বড়গাঙ্গিনা আরএমও, সহযোগিতায় মাচ প্রকল্প। কিন্তু এখন আর মাচ প্রকল্পের কার্যকারিতা নেই। সম্পৃক্ততা রয়েছে আইপ্যাকের। টাওয়ারের ভেতর-দেয়ালে বিলের প্রাণবৈচিত্র্যের বেশ কিছু ছবি প্রদর্শন করে তাতে এসব প্রাণসম্পদ বাঁচিয়ে রাখার আবেদন জানানো হয়েছে। টাওয়ারের পাশেই কয়েকটি নৌকা বাঁধা। পর্যটকেরা ইচ্ছে করলে নৌকা নিয়ে বিলের ভেতর ঘুরতে পারেন। তবে কেবল টাওয়ারে ওঠার পরই জানা যাবে যে ওপরে ওঠা বিনা মূল্যে নয়। বলা হচ্ছে যে সিএনআরএসের মাধ্যমে দর্শনীর টাকা এই বিল সংরক্ষণের কাজে ব্যয় হবে। কিন্তু আদতে কী হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখার কি কেউ আছে?
যদি একটু ভিন্নভাবে এখানকার সব তৎপরতা বিশ্লেষণ করি, তাহলে সমগ্র উদ্যোগ ঘিরে পর্যটনের একটি বড় আয়োজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাহলে স্থানীয় প্রশাসন এবং নামসর্বস্ব পরিবেশবাদী সংস্থাগুলো বাইক্কা বিলকে কি একটি পর্যটনকেন্দ্র বানাতে চেয়েছে? এই প্রশ্ন আরও গুরুতর হয়ে ওঠে তখন, যখন দেখি পড়ন্ত বিকেলে পর্যটকবোঝাই অনেক গাড়ি এসে থামে বিলের অদূরে। তারপর ‘পক্ষীপ্রেমীরা’ হইচই করতে করতে ছুটে আসেন বিলের কিনারে, টাওয়ারের কাছে। নিরেট সত্য হচ্ছে, অসংখ্য মানুষের পদচারণ অতিথি পাখিদের শঙ্কিত করে তুলছে। অদূর ভবিষ্যতে ওরা এই এলাকা এড়িয়েও চলতে পারে।
এমন নাজুক পরিস্থিতিতে বাইক্কা বিলের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত না হয়ে উপায় নেই। সেখানকার সব ধরনের আয়োজন থেকে একটি জম্পেশ পর্যটনকেন্দ্রের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। প্রতিদিন যে হারে মানুষ এখানে আসছে, তাতে পাখিসহ সমগ্র বিলের জীববৈচিত্র্যই হুমকির সম্মুখীন। অথচ বাইক্কা বিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক জলাশয়। সারা বছরই পানি থাকে। এ কারণে বিলটি সংরক্ষিত মৎস্য প্রজননকেন্দ্র হিসেবেও বিখ্যাত। পাশাপাশি অন্যান্য প্রাণবৈচিত্র্যেরও নিরাপদ আবাস এই বিল। সবকিছু মিলিয়ে প্রাকৃতিক ভারসাম্যের অতি দরকারি একটি উৎস। এমন একটি বিলকে কোনো অবস্থায় পর্যটনকেন্দ্র বানানো উচিত নয়।
বাইক্কা বিল বাঁচিয়ে রাখতে হলে প্রথমেই সংযোগ সড়কটির অনুন্নয়নের কথা ভাবতে হবে। পথ ভালো থাকলে মানুষের যাতায়াত বাড়বে। স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অবাধ চলাফেরাও নিয়ন্ত্রিত হওয়া প্রয়োজন। শিক্ষার্থী, গবেষক বা বিষয়সংশ্লিষ্ট ব্যতীত অন্য কাউকেই বিলের পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ব্যবহার করতে দেওয়া উচিত নয়। হাওরের ভেতর বসতি গড়ে তোলায় চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা থাকা প্রয়োজন। বাইক্কা বিল নিয়ে প্রলোভনমূলক যেকোনো লেখা বা সংবাদ প্রচার থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে। এসব নিয়ে যত বেশি লেখা হবে ততই মানুষের আনাগোনা বাড়বে। দেশের সব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থানই বিনোদনকেন্দ্র নয়। কিছু কিছু প্রাকৃতিক স্থান মানুষের প্রভাবমুক্ত থাকা প্রয়োজন। কারণ, অতিরিক্ত মানুষের চাপ জীববৈচিত্র্যের আন্তপ্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটায়।
তা ছাড়া, আপাতদৃষ্টিতে আমরা যাদের পক্ষীপ্রেমী হিসেবে যেতে দেখি, তাদের বিরাট একটি অংশ কি গোপনে অতিথি পাখি খাওয়ার বাসনা রাখেন না? স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রাতের অন্ধকারে বাইক্কা বিলের মাছ ও পাখি গোপন শিকারিদের দখলে চলে যায়। আশপাশে বসতি যত বাড়বে, ততই চোরা শিকারিদের দল ভারী হবে। হুমকির মুখে পড়বে এখানকার প্রাণবৈচিত্র্য। বাইক্কা বিলের জীববৈচিত্র্য বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব সবার।
মোকারম হোসেন: প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক, সাধারণ সম্পাদক, তরুপল্লব।
tarupallab@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.