২৫ মার্চ একাত্তরের স্মৃতি by বদরুদ্দীন উমর

১৯৭১ সালের ২২ মার্চ মুঈদুল হাসানের বাসায় এক ডিনারে পশ্চিম পাকিস্তান ন্যাপের নেতা ওয়ালী খান ও বেজেঞ্জোর সঙ্গে দেখা হয়। ওয়ালী খান ছিলেন উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের বিখ্যাত কংগ্রেস নেতা আবদুল গাফফার খানের ছেলে। বেজেঞ্জো ছিলেন বেলুচিস্তানের নেতা।


ওয়ালী খানের কথাবার্তায় হতাশার সুর খুব স্পষ্ট ছিল। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষমতা বণ্টন নিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও শেখ মুজিবের মধ্যে একটা আপস নিষ্পত্তি প্রায় চূড়ান্ত হয়েছিল এমন ধারণা থেকেই ওয়ালী খান কথা বলছিলেন। তিনি বলছিলেন, একবার ১৯৪৭ সালে তাদের অর্থাত্ পাঠান ও বেলুচদের মাথায় ইংরেজ ও কংগ্রেস কাঁঠাল ভেঙেছিল। এবার তাঁদের মাথায় কাঁঠাল ভাঙার ব্যবস্থা করছে পাকিস্তানি সামরিক শাসক এবং আওয়ামী লীগ।
২৩ মার্চ সন্ধ্যায় আমি কামাল হোসেনের বাসায় ছিলাম। কামালের সঙ্গে তখন আমার কোনো রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু সামাজিক পর্যায়ে যোগাযোগ ছিল। কেন ওই সময় তার বাসায় গিয়েছিলাম জানি না। হতে পারে রাতে খাওয়ার দাওয়াত ছিল। সেখানে দেখা হলো লাহোরের বিখ্যাত ইংরেজি দৈনিক পাকিস্তান টাইমসের সম্পাদক মাজহার আলী খানের সঙ্গে। তিনি ছিলেন পাঞ্জাবের এককালীন প্রধানমন্ত্রী স্যার সেকেন্দার হায়াত খানের জামাই। তারেক আলী তার ছেলে। এর আগে পাকিস্তানের সামরিক সরকার পাকিস্তান টাইমস পত্রিকার প্রকাশনা নিষিদ্ধ ও বন্ধ করেছিল।
আগের সন্ধ্যায় ওয়ালী খান যা বলছিলেন তার উল্টো কথা শোনা গেল মাজহার আলী খানের মুখে। ওই দিন প্রেসিডেন্ট ভবন ও ক্যান্টনমেন্ট ছাড়া সারা ঢাকায় বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো ছিল। সে প্রসঙ্গে তিনি বলছিলেন, এর অর্থ তো পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্ন হওয়া। তাকে খুব বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। তিনি বললেন, আমরা তো চাই এক সঙ্গে থাকতে। আমরা আলাদা হয়ে গেলে তার ফল মোটেই ভালো হবে না। তার কথা শুনে একেবারেই মনে হয়নি যে, ২৫ তারিখে সামরিক হামলার ব্যাপারে তার কোনোরকম ধারণা ছিল। আসলে আইয়ুব খানের মতো পশ্চিম পাকিস্তানের দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক নেতাদের কেউ কেউ এ বিষয়ে জানলেও যারা বামপন্থী ছিলেন তাদের এ ব্যাপারে কোনই ধারণা ছিল না। এটা তাদের কাছে ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। তবে শুনেছিলাম যে, পরে তাদেরও ২৫ তারিখের মধ্যেই ঢাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। তখনই তারা বুঝেছিলেন সরকার ও সামরিক বাহিনী ঢাকা ও সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে কী করতে যাচ্ছে।
আমি এ সময় আমাদের পার্টির প্রকাশ্য সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘গণশক্তি’ সম্পাদনা করতাম। কিন্তু কিছু সতর্কতার কারণে কিছু দিন থেকে থাকছিলাম ধানমণ্ডিতে আমাদের পার্টির মহম্মদ আমানুল্লাহর বাসায়। তিনি ছিলেন তত্কালীন ইউনাইটেড ব্যাংক, পরবর্তীকালে জনতা ব্যাংকের একজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী। ‘গণশক্তির’ কাজের জন্য ঠাটারি বাজারে তার অফিসে নিয়মিত যেতাম। পার্টির নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ থাকত। কিন্তু তত্কালীন পরিস্থিতির ওপর পার্টির কোন লিখিত বক্তব্য বা নির্দেশ ছিল বলে মনে হয় না। একথা ভাবলে এখন অবাক লাগে। তখনকার দিনে পার্টি ছোট হলেও একেবারেই ছোট ছিল না। দেশের সর্বত্র তার স্থানীয় সেল, কমিটি ইত্যাদি ছিল, সদস্যরা ছড়িয়ে ছিলেন। তাদের সঙ্গে কেন্দ্রের যোগাযোগ রক্ষা ও তাদের কাছে পার্টির নির্দেশ পাঠানোর প্রয়োজন তত্কালীন পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে জরুরি ছিল। কিন্তু সেরকম কিছু দেখা যায়নি। নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে তখন যা বোঝা যেত তা হলো, দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের কোন মূল্যায়ন ও ধারণা ছিল না, কিছু বাঁধাধরা মতামত ছাড়া। এ জন্য ২৫ তারিখে কী ঘটতে যাচ্ছে এ বিষয়ে পার্টির (পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি, মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) কোন ধারণাও ছিল না। আমি নিজেও কোনো সূত্র থেকে ২৫ তারিখের সামরিক আক্রমণ সম্পর্কে পূর্বাহ্নে কিছু জানতে পারিনি।
সে সময় আমানুল্লাহর বাসায় থাকলেও কেন জানি না ২৫ তারিখ রাতে আমি আমাদের চামেলীবাগের বাসায় থেকে গিয়েছিলাম। সেখানে রাত দশটার দিকেই শুনতে পেলাম, শান্তিনগরের মোড় এবং অন্য রাস্তায় লোকজন ব্যারিকেড তৈরি করছে। স্লোগানও দিচ্ছে, অর্থাত্ ওই সময়ে এটা প্রচার হয়ে গিয়েছিল যে, সামরিক বাহিনী রাস্তায় নেমে হামলা করবে। তবে কী ধরনের আক্রমণ আসছে সে বিষয়ে কারও ধারণা ছিল না। তাদের মনে হয়েছিল যে, ১৯৬৯-এর অভ্যুত্থানকালীন সময়কার মতো কিছু সামরিক হামলা হবে। কাজেই তাদের ঠেকানোর জন্য ব্যারিকেড দেয়া হচ্ছিল। সন্ধ্যার মধ্যেই আওয়ামী লীগ নেতারা এটা জেনে গিয়েছিলেন যে, একটা বড় রকম সামরিক আক্রমণ ওই রাতেই হতে যাচ্ছে। তাদের থেকে এ হামলার কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল।
চামেলীবাগ ছিল রাজারবাগ পুলিশ হেডকোয়ার্টারের একেবারে সংলগ্ন এলাকা। রাত সাড়ে এগারোটা-বারোটার দিকে হঠাত্ রাস্তার দিক থেকে চিত্কার শুরু হলো—পালাও পালাও। এর কারণ ওই সময় শান্তিনগরের রাস্তার ওপর ট্যাঙ্ক নেমেছিল। ১৯৬৯ সালে বেপরোয়া গুলি হলেও ট্যাঙ্ক নামেনি। ট্যাঙ্ক নামা থেকে লোকজনের আর বুঝতে বাকি থাকেনি যে, এক ভয়াবহ সামরিক হামলা জনগণের ওপর হতে যাচ্ছে। রাস্তায় যেসব ব্যারিকেড দেয়া হয়েছিল গাছ কেটে, আশপাশের জায়গা থেকে ড্রাম নিয়ে এসে, অন্য জিনিস ফেলে, সেগুলো সামরিক বাহিনীর অ্যাডভান্সড ইউনিট সরিয়ে দিয়েছিল ট্যাঙ্ক আসার ঠিক আগেই।
অল্প কিছুক্ষণ পর, মনে হয় রাত বারোটার দিকেই, রাজারবাগ পুলিশ হেডকোয়ার্টারের ওপর শুরু হলো মর্টারের গোলাবর্ষণ। এক-একবার সেই গোলাবর্ষণের সঙ্গে সঙ্গে চারদিক একেবারে আলোয় ভরে যাচ্ছিল। ওদিকে রাজারবাগ পুলিশ হেড কোয়ার্টারের ভেতর থেকেও বন্দুকের আওয়াজ শোনা যেতে লাগল। কিন্তু মর্টারের গোলার কাছে তার ফায়ার পাওয়ার বলতে কিছুই ছিল না। মর্টারের গোলাবর্ষণের সঙ্গে সঙ্গে ট্যাঙ্কের গোলারবর্ষণ রাজারবাগে এমন অবস্থা করল যাতে পুলিশেরা আর প্রতিরোধের চিন্তা না করে পালাতে শুরু করল। সরকার যে সামরিক বাহিনী দিয়ে নিজেদের পুলিশ হেডকোয়ার্টারে এভাবে আক্রমণ করল তার থেকেই বোঝা গেল যে, পরিস্থিতি মোটেই ১৯৬৯ সালের মতো নয়। পাকিস্তান সরকার পূর্ব বাংলার জনগণের বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।
গোলাবর্ষণ চলতে থাকা অবস্থাতেই এক সময় আমাদের বাড়ির দরজায় জোর কড়া নাড়া শুরু হলো। ধাক্কা বাড়তে থাকলো দরজায়। সেটা ভেঙে ফেলার মতো অবস্থা। দরজা খুলে দেখলাম কয়েকজন পুলিশ, উর্দি পরা। মনে হয় তারা ডিউটিতে ছিল। শুধু তারাই নয়। এর পর আরও পুলিশ এসে গেল। আমাদের ওপর হামলার জন্য নয়, আশ্রয়ের জন্য। চামেলীবাগের দিকে রাজারবাগ পুলিশ হেডকোয়ার্টারের দেয়াল নিচু ছিল। সেই দেয়াল টপকে পুলিশ শুধু আমাদের বাড়িই নয়, সব বাড়িতে ভরে গেল। প্রথম দিকে তাদের কেউ কেউ পুলিশের পোশাক ও বেল্ট নিয়ে কী করা যায় তাই নিয়ে ব্যস্ত হলো। কয়েকজনকে লুঙ্গি, এমনকি শাড়িও দেয়া হলো লুঙ্গির মতো করে পরার জন্য। কিন্তু কতজনকে আর দেয়া যায়? যারা কাপড় পরিবর্তন করেছিল তাদের বললাম পুলিশের পোশাক ও বেল্ট বাইরে ডাস্টবিনে ফেলে আসতে। তারা তাই করল। মনে হয় আমাদের বাসাতে দশ-বারো জন পুলিশ ছিল। এছাড়া অন্য কেউ কেউও উল্টো দিকের দেয়াল টপকে আমাদের বাসায় ঢুকেছিল।
ওই অবস্থায় রাতে কারও ঘুম হওয়ার প্রশ্ন ছিল না। আমরা তো বটেই, এমনকি ছোট ছেলেমেয়েরাও সারা রাত আতঙ্কের মধ্যে কাটাল। আমি বুঝতে পারছিলাম না এর পর কী হবে! এভাবে ঢালাও আক্রমণের পর ঢালাও গ্রেফতার হওয়ার কথা। একথা ভেবে আমি ঠিক করলাম ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাসা ছেড়ে বাইরে চলে যাব। কিন্তু কাউকে গ্রেফতারের ব্যাপার তখন ছিল না। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের গ্রেফতারের জন্য তাদের নাম-ঠিকানা সামরিক বাহিনীর কাছে ছিল না। সেটা ছিল পুলিশের কাছে এবং পুলিশ তখন তাদের শত্রু। কাজেই হাতেগোনা কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তির বাড়িতেই সে সময় তারা উপস্থিত হতে ও হামলা করতে পেরেছিল। কিন্তু তখনকার অবস্থায় এ চিন্তা মাথায় আসেনি। কাজেই ভোর হতেই গোলাগুলির মধ্যে আমি বাড়ি ছেড়ে আমাদের পাড়াতেই অন্য কোথাও যাওয়ার জন্য বের হয়ে গেলাম। তখনও বাইরে গোলাগুলি চলছিল, যদিও মর্টার আক্রমণ বন্ধ হয়েছিল।
পাড়াতেই আমাদের এক বৈবাহিক আত্মীয় থাকতেন। তাদের বাসাতেই প্রথমে যাওয়া ঠিক করলাম। সেখানে আমি আগে মাত্র একবারই গিয়েছিলাম। আমাদের বাসার কাছেই মসজিদের মধ্য দিয়ে সেখানে যাওয়া যেত। বাসা থেকে বের হয়ে মসজিদের জায়গায় ঢুকে দেখলাম দু-একজন লোক ফজরের নামাজ পড়ার জন্য এসেছে। তবে নামাজের জন্য কোনো আজান শোনা যায়নি। দেখলাম, মসজিদের দেয়ালের কাছে একটা লাশ। আঠারো-কুড়ি বছরের ছেলে। সে চামেলীবাগের রাস্তার মোড়ে একটা টঙে বসে পান-সিগারেট বিক্রি করত। মনে হয় সেখানেই তাকে গুলি করেছিল। তারপর কোনোমতে মসজিদের মধ্যে ঢোকার পর তার মৃত্যু হয়।
মসজিদ থেকে বের হয়ে আমি আমার পরিচিত বাসাটিতে যাওয়ার জন্য একটু ঘোরাঘুরি করে সেটা পেয়ে গেলাম। বাসার লোকেরা আমাকে দেখে মোটেই খুশী হলো না। তবু সেই বাসা ও তার কাছাকাছি থাকতে হলো। আরও কয়েকজন সেখানে ছিলেন। চাকরি চলে গেল বলে একটা পুলিশ মাঝে মাঝে কেঁদে উঠছিল। এভাবেই কাটতে লাগল সময়। এক সময় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এক বেতার ভাষণে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ও সেই সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে অনেক বিষোদগার করলেন। সকাল থেকেই রেডিও শুনছিলাম। তাতে ঘোষণা করা হচ্ছিল যে, ঢাকায় কারফিউ জারি করা হয়েছে এবং সেটা অনির্দিষ্ট কাল চলবে।
সারা রাত মেঝের ওপর শুয়ে কাটল। রাতের অন্ধকারেও গুলিবর্ষণ চলল সমানে। মনে হয়, সেটা তারা করেছিল মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য। যাই হোক, ভোরের দিকে রেডিওতে ঘোষণা করা হলো যে, ২৭ মার্চ সকাল ৭টা থেকে কারফিউ থাকবে না। সেটা আবার জারি হবে বিকাল ৪টার সময়। কাজেই মধ্যে নয় ঘণ্টা কারফিউর বিরতি।
কারফিউ থাকবে না জেনে আমি সঙ্গে সঙ্গে ওই জায়গা ছেড়ে মসজিদের মধ্যে দিয়ে বাসায় গেলাম। লাশটা তখনও মসজিদের মধ্যে পড়ে ছিল। ওই অবস্থায় কারও পক্ষে লাশের গতি করার উপায় ছিল না। আমি বাসায় ফিরে দেখলাম, যেসব পুলিশ এবং অন্য লোকেরা বাসায় ছিল তারা নেই। অতগুলো লোক বাসায় বসার ঘরে থাকায় সে ঘরের অবস্থা লণ্ডভণ্ড। যাই হোক, আমার স্ত্রী সুরাইয়া চা এবং অন্য সামান্য কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। ২৫ তারিখ রাত থেকে ২৭ তারিখ সকাল পর্যন্ত ৩৬ ঘণ্টা প্রায় কিছুই খাওয়া হয়নি। ক্ষিদেও বিশেষ ছিল না।
আমি তাড়াতাড়ি সামান্য কিছু কাপড়-চোপড় এবং দু-একটা অন্য জিনিস থলিতে পুরে বের হওয়ার জন্য তৈরি হলাম। বাচ্চারাসহ সুরাইয়া উয়ারীতে আব্বার বাসায় কীভাবে যাবেন তার কোনো ঠিক ছিল না। পরে শুনেছিলাম, আমাদের এক আত্মীয় এবং সুহৃদ সৈয়দ মনসুর আহমদ সকালের দিকেই আমাদের বাসায় যাওয়ার পর বাচ্চারাসহ সবাই পায়ে হেঁটে উয়ারীর বাসায় গিয়েছিলেন। সুরাইয়ার দুই ভাই আসাদ ও কামাল আমাদের বাসার কাছেই থাকত। তারাও রাতে আমাদের বাসাতেই চলে এসেছিল। তখনও পর্যন্ত বোঝা যাচ্ছিল না, খুন-খারাবি ছাড়া মিলিটারি লোকজনকে গ্রেফতার করছিল কিনা। আসলে তখন পুলিশ না থাকায় ঠিকানা দেখে বাড়িতে বাড়িতে যাওয়া মিলিটারির পক্ষে সম্ভব ছিল না। কাজেই সন্দেহ হলে গুলি করে মেরে ফেলাই অনেক দিন পর্যন্ত চলেছিল।
আমি সুরাইয়া ও বাচ্চাদের থেকে বিদায় নিয়ে বের হলাম। এরকম পরিস্থিতির উদ্ভব হবে এটা যেহেতু পার্টির ধারণার বাইরে ছিল, কাজেই এই অবস্থায় কী করা যাবে তা নিয়ে কোনো নির্দেশ বা পরামর্শ ছিল না। আমি প্রথমেই কাছাকাছি সাইয়িদ আতীকুল্লাহর বাসায় যাওয়া ঠিক করলাম। রাস্তায় তখনও পর্যন্ত কোনো যান চলাচল ছিল না। সাইকেল পর্যন্ত নয়। আমি শান্তিনগরের মোড় পার হয়ে সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলের গলির মধ্যে ঢুকলাম। আতীকুল্লাহর বাসায় গিয়ে দেখলাম তারা আছে। আতীকুল্লাহ ও তার স্ত্রী জাহান আমাকে দেখে খুশি হলো। অবস্থা জানতে চাইল। সে সময় সেখানে এলো স্বপন নামে একটি ছেলে। সে ছিল জাহানের বোনের ছেলে। তার কাছে শুনলাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আর্মি খুব গোলাগুলি করেছে হিন্দু ছাত্রদের জগন্নাথ হলে। বহু ছাত্রকে মেরে ফেলেছে। ডক্টর দেব, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, আবদুর রাজ্জাক সাহেবসহ অন্যদেরও গুলি করে হত্যা করেছে বলে স্বপন জানাল। এসব শুনে মন খুব খারাপ হলো। তবে চারদিকে যে ধ্বংসযজ্ঞ চলছিল সেই অবস্থায় আমার প্রিয় শিক্ষক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের এই দুঃসংবাদ স্বাভাবিক অবস্থায় যতখানি শোকের ব্যাপার হতো তা হলো না। এটা যে হলো না, সেটাও আমার মনে হলো।
আতীকুল্লাহর ওখানে জাহান চা খাওয়াল, তার সঙ্গে অন্য কিছু। সে সময় কারও বাসায় বিশেষ কিছু খাওয়ার জিনিস ছিল না। সেখানে আমি বেশিক্ষণ থাকলাম না। কীভাবে কোথায় যাব এই চিন্তা করছি, এমন সময় স্বপন বলল তার সঙ্গে গাড়ি আছে। যে কোনো জায়গায় সে আমাকে পৌঁছে দিতে পারে। আমি তাকে বললাম, এক জায়গায় আমার যাওয়া দরকার। কিন্তু তার আগে উয়ারীতে আব্বার বাসায় একবার তাদের সঙ্গে দেখা করতে হবে। স্বপন বললো, ঠিক আছে। আমি আতীকুল্লাহ ও জাহানের থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে চড়লাম।
উয়ারীতে গিয়ে বাসার সামনে গাড়ি না রেখে তখনকার রেল লাইনের সমান্তরাল ফোল্ডার স্ট্রিট নামে যে রাস্তাটা ছিল তার এক জায়গায় গাড়িটা দাঁড় করিয়ে আমি ২০ নম্বর ওয়্যার স্ট্রিটে গেলাম। সেখানে তখন ছিলেন আব্বা, আম্মা ও ফুপু। এছাড়া ছোট বোন জীনাত এবং ভাই শাহাবুদ্দিন, তার স্ত্রী ও বাচ্চারা। তাদের সঙ্গে দেখা করে বললাম, আমাকে অন্য জায়গায় যেতে হবে। এরপর কখন দেখা হবে ঠিক নেই। পরে যোগাযোগ করব। সবারই তখন দারুণ দুশ্চিন্তা।
আমি বাসা থেকে বের হয়ে একটু যেতেই দেখা হলো আর্কিটেক্ট মাজহারুল ইসলাম সাহেবের সঙ্গে। তিনি ছিলেন মস্কোপন্থী ন্যাপের একজন নেতৃস্থানীয় লোক। আমার প্রতি তিনি খুব বিরূপ ছিলেন। দেখা হলে কথাই বলতেন না। কিন্তু ওই সময় তিনি আমাকে বললেন, আমি কোথাও যেতে চাইলে তিনি আমাকে পৌঁছে দিতে পারেন। তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম, অন্য একজনের গাড়িতে এসেছি। সে-ই আমাকে নিয়ে যাবে। স্বপনের গাড়িতে উঠে তাকে বললাম, মোহাম্মদপুরের দিকে যেতে। আমানুল্লাহর বাসায় যেতে হলে এখনকার সোহ্রাওয়ার্দী হাসপাতালের সামনে কলেজ রোডের বাসস্ট্যান্ডের কাছ দিয়ে ঢুকতে হতো। আমরা তাই করলাম। আমানুল্লাহর বাসাটা ছিল একতলা। তার সামনে পৌঁছে দেখলাম আমানুল্লাহরা কেউ বাসায় নেই।
স্বপনকে বললাম ধানমন্ডি ৩নং রোডে যেতে। সেখানে থাকতেন জামান সাহেব, মেজর কাজী নুরুজ্জামান। পার্টির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আগে সেখানে দু-একবার থেকেছি। জামান সাহেবের বাসার সামনে পৌঁছে আমি স্বপনকে বললাম, তুমি একটু দাঁড়াও। আমি দেখি ভেতরে ওরা আছেন কিনা। দরজা নক করতে কেউ একজন দরজা খুললেন। বুঝলাম তারা বাসায় আছেন। আমি ধন্যবাদ জানিয়ে স্বপনকে বললাম, তখনকার মতো আমি সেখানেই থাকব। স্বপন চলে গেল। ঘরে ঢুকে সেখানে দেখলাম আমাদের পার্টি সেক্রেটারি সুখেন্দু দস্তিদার (বশীর ভাই) ও মুহম্মদ তোয়াহাকে।

No comments

Powered by Blogger.