ওষুধ ছাড়া ভালো থাকুন by ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ

প্রিয় পাঠক, এবার ওষুধ ব্যবহার ছাড়া লাইফস্টাইল পরিবর্তনের মাধ্যমে কিভাবে রক্তচাপ স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যসম্মত রাখা যায়, তা নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। এক. আপনি উচ্চ রক্তচাপের রোগী হলে আপনার খাবারের তালিকা থেকে মাত্রাতিরিক্ত খাদ্যশস্য ও চিনি-জাতীয় খাদ্যদ্রব্য পরিহার করুন, যত দিন না আপনার রক্তচাপ স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসে।


এই দুই ধরনের খাবার পরিহার করলে আপনার রক্তে ইনসুলিনের পরিমাণ কমে যাবে এবং আপনার ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্ট হওয়ার আশঙ্কাও তিরোহিত হবে। ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ইনসুলিন শরীরে ম্যাগনেশিয়াম মজুদ করে। কিন্তু উচ্চমাত্রার ইনসুলিন লেভেলের কারণে আপনার শরীরের কোষ ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্ট হয়ে গেলে ইনসুলিন আর ম্যাগনেশিয়াম মজুদ করতে পারে না। শরীরে ম্যাগনেশিয়ামের পরিমাণ কমে গেলে সম্প্রসারণের পরিবর্তে রক্তনালি সংকুচিত হয়ে পড়ে। এতে রক্তচাপ বেড়ে যায়। ইনসুলিন শরীরকে সোডিয়াম ধারণ করে রাখার সক্ষমতা প্রদান করে বলে এই সোডিয়ামের কারণে রক্তচাপ বেড়ে যায়। সোডিয়ামের পরিমাণ বেড়ে গেলে শরীরের ফ্লুইড বা তরল পদার্থের ধারণক্ষমতা বেড়ে যায়, যার কারণে রক্তচাপও বেড়ে যায়। আপনি যদি স্থূলকায় হন, টাইপ-২ ডায়াবেটিসে ভোগেন, আপনার কোলেস্টেরল লেভেল যদি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয় এবং আপনার যদি উচ্চ রক্তচাপ থাকে, তবে হতে পারে আপনি অধিক পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা এবং চিনি-জাতীয় খাবার খেয়ে ফেলছেন। ফলে শরীরে ইনসুলিনের মাত্রা বেড়ে গিয়ে অস্বাভাবিক পর্যায়ে পেঁৗছে গেছে। তাই শর্করা বা চিনি-জাতীয় খাবার নিয়ন্ত্রণ করা বাঞ্ছনীয়। ওমেগা-৩ এবং ওমেগা-৬ ফ্যাট শরীরের জন্য অতি প্রয়োজন। ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্ট রোগী পর্যাপ্ত পরিমাণে ওমেগা-৩ ফ্যাট খেলে ইনসুলিন রিসেপ্টরগুলো আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং ইনসুলিনের লেভেল কমে আসে। ওমেগা-৬ ফ্যাট কর্ন, সয়া, ক্যানোলা, সানফ্লাওয়ার এবং সানফ্লাওয়ার তেলে পাওয়া যায়। ওমেগা-৩ ফ্যাটের উৎস হলো_ফ্ল্যাঙ্সিভ অয়েল বা তিসি ও ওয়ালনাট তেল এবং মাছ। তবে মাছের চেয়ে ক্রিল জেলে ৪৮ গুণ বেশি ওমেগা-৩ ফ্যাট পাওয়া যায়। উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের কফি এবং ক্যাফেইনসমৃদ্ধ পানীয় ও খাদ্য বেশি খাওয়া ঠিক নয়। এ ছাড়া আপনার খাবারের তালিকায় ফলমূল, শাকসবজির পরিমাণ বাড়ান এবং তেল ও চর্বি-জাতীয় খাবারের পরিমাণ কমান। গরু ও খাসির গোশত কম খাওয়া ভালো। জাংকফুড খাওয়া ছেড়ে দিন। প্রচুর পানি পান করুন।
দুই. আপনার শরীরের ওজন যদি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয়, তবে ওজন কমিয়ে আনুন। আপনার উচ্চতার অনুপাতে শরীরের ওজন কত হওয়া উচিত, তা বিএমআই বা বডিমাস ইনডেঙ্ দ্বারা নির্ণয় করতে পারেন। স্থূলকায় ও অতিকায় স্থূলকায় লোকেরা ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন ও হৃদরোগে বেশি ভোগে, মারাও যায় বেশি। আপনি আপনার বিএমআই নিজেই নির্ণয় করতে পারেন। বিএমআইয়ের ফর্মুলা হলো_শরীরের ওজনকে (কেজি) আপনার উচ্চতার স্কয়ার (কোনো সংখ্যাকে সেই সংখ্যা দিয়ে গুণফল) দিয়ে ভাগ করলে বিএমআইয়ের ফলাফল পাওয়া যাবে। যদি কারো ওজন ৬৫ কিলোগ্রাম হয় এবং উচ্চতা হয় ১.৫ মিটার, তবে তার বিএমআই হবে ২৮.৮৮। কারো বিএমআই যদি ১৮.৫-এর নিচে হয়, তবে তার শরীরের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম। স্বাভাবিক বিএমআইয়ের রেঞ্জ হলো ১৮.৫-২৪.৯। বেশি ওজনের বিএমআই ধরা হয় ২৫ থেকে ২৯.৯, আর 'ওবিস' বা অতিশয় স্থূলকায় হলে বিএমআইয়ের রেঞ্জ হবে ৩০ এবং তার বেশি। কিভাবে আপনি আপনার শরীরের বাড়তি ওজন কমাবেন তা নির্ভর করে আপনার ইচ্ছাশক্তি ও জীবনযাপনের ধরনের ওপর। কম ক্যালরিযুক্ত কম সুষম খাবার এবং নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে ওজন কমানো সম্ভব। প্রচুর ক্যালরিযুক্ত খাবারের প্রতি লোভ থাকলে আর কঠোর ব্যায়াম না করলে ওজন কমানো সম্ভব হবে না। আজকাল ওজন কমানোর ওষুধ পাওয়া যায় বাজারে। সাবধান, ওসব ওষুধ খাবেন না। এসব ওষুধ ওজন কমানোর চেয়ে আপনার ক্ষতিই করবে বেশি। ওজন কমানোর ভালো উপায় হচ্ছে প্রাকৃতিক নিয়ম অবলম্বন করা।
তিন. আবেগ, মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা নিয়ন্ত্রণে রাখুন। পরীক্ষায় দেখা গেছে, মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত থাকতে পারলে মানুষের রক্তচাপ, স্ট্রোক ও হৃদরোগের হার ৭০ শতাংশ কমে যায়। ভয়ভীতি, অশুভ বা নেতিবাচক আবেগ, রাগ এবং দুঃখকষ্ট মানুষের মানসিক চাপের ওপর প্রচণ্ড প্রভাব ফেলে। মানসিক চাপের ঘটনাপ্রবাহ যত ক্ষতিকারক নয়, তার চেয়ে বেশি ক্ষতিকর হলো মানুষের চাপকে সহজভাবে মেনে নেওয়া ও তা থেকে অবমুক্তির অক্ষমতা। জীবনকে সহজভাবে গ্রহণ করুন। অনিন্দ্য উল্লাসের সঙ্গে কাজকর্ম করুন। জীবনকে উপভোগ করার পরিবেশ তৈরি করুন। যারা সব সময় আনন্দ-উল্লাস ও রিলাঙ্ মুডে থাকে, তাদের উচ্চ রক্তচাপ কম হয়।
চার. ব্যায়ামকে ওষুধ হিসেবে গ্রহণ করুন। নিয়মিত ব্যায়াম করা কম্পানি কর্তৃক উৎপাদিত যেকোনো ওষুধের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ওষুধ। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও বিষক্রিয়া আছে। ব্যায়ামের কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা বিরূপ প্রতিক্রিয়া নেই। আপনি যেকোনো বিশেষ কারণে ব্যায়াম শুরু করুন না কেন, এর শুভ ফলাফল অসংখ্যভাবে আপনার শরীরে প্রতিফলিত হবে। শরীরের অবস্থার ওপর নির্ভর করবে কী ধরনের ব্যায়াম আপনার জন্য উপযুক্ত। আপনার শরীরের ইনসুলিন লেভেল কমানোর জন্য কী ধরনের এবং কী পরিমাণ ব্যায়াম প্রয়োজন হতে পারে, তা আপনি অভিজ্ঞ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে জেনে নিতে পারেন। সাধারণত হাঁটা, জগিং এবং দৌড়ানো উৎকৃষ্ট ব্যায়ামের মধ্যে অন্যতম। পরীক্ষায় দেখা গেছে, এ ধরনের ব্যায়ামের কারণে উচ্চ রক্তচাপ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে আসে। সাইকেল চালানো বা সাঁতার উচ্চ রক্তচাপ কমাতে বেশি সময় নেয়। তবে আপনি যদি এসব ব্যায়াম পছন্দ ও উপভোগ করেন, তবে নিঃসন্দেহে তা আপনার গ্রহণ করতে আপত্তি থাকার কথা নয়। ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্ট হলে ব্যায়ামের মধ্যে আপনি ভারী প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন। ব্যায়াম করলে শরীরের রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায় বা ইনসুলিনের সংবেদনশীলতাকে উজ্জীবিত করে। আপনি যদি স্থূলকায় উচ্চ রক্তচাপের রোগী হন, তাহলে প্রতি সপ্তাহে ৬ থেকে ৯ ঘণ্টা প্রবলভাবে ব্যায়াম করতে হবে, যাতে করে আপনার ইনসুলিন রেসেপ্টরের সংবেদনশীলতা বাড়িয়ে আনা যায়। প্রবল ব্যায়াম বলতে বোঝায় এ ধরনের ব্যায়াম, যা করার সময় আপনি অন্যদের সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বলে যেতে পারেন।
পাঁচ. ঘুম সরাসরি রক্তচাপের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ২০০৮ সালের ১২ নভেম্বর প্রকাশিত টাইম ম্যাগাজিনে বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত ঘুম সুস্বাস্থ্যের জন্য অতি আবশ্যক। 'জার্নাল অব দ্য আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন'-এর এক সমীক্ষার বরাত দিয়ে টাইম ম্যাগাজিন উল্লেখ করে, দিনে সাড়ে সাত ঘণ্টার চেয়ে কম ঘুমালে স্ট্রোক, হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে থাকতে হয়। সাধারণত ঘুমানোর সময় রক্তচাপ কমে যায়_এ কথাটা আগেই বলা হয়েছে। অতীতের গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ পর্যাপ্ত না ঘুমালে তাদের রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়। এমনকি অপর্যাপ্ত ঘুমের কারণে মানুষের শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়াসহ হতাশা ও মেজাজের উগ্রতা বৃদ্ধি পায়। যারা উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন তাদের পর্যাপ্ত সময়ের জন্য নিরুপদ্রব ঘুমের প্রয়োজন। ঘুম হতে হবে অবিরাম ও নির্বিঘ্ন। ঘুমের পরিমাণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, গুণগত মানও তেমন গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনায় নিতে হবে। স্ট্রোক, হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের রাতের বেলায় ঘুম থেকে উঠে বারবার বাথরুমে যাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। এতে চরমভাবে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। স্বাভাবিকভাবে কারো ঘুম না হলে অনিদ্রা দূর করার জন্য প্রয়োজনে ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমাতে হবে। স্ট্রোক, হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রে অনিদ্রা ঘুমের ওষুধের আসক্তির ভয়ের চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক।
স্থূলতার মতো উচ্চ রক্তচাপ বিশ্বব্যাপী মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে এবং কোটি কোটি টাকার ওষুধ গ্রহণ করছে। বহু মানুষ একাধিক উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ গ্রহণ করেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছে না। আমি প্রায়ই একটা কথা বলে থাকি, রোগের উপসর্গ চিকিৎসা করে কোনো লাভ নেই। রোগের মূল কারণ উদ্ঘাটন করতে হবে এবং তা প্রতিরোধের ব্যবস্থা করতে হবে। কেউ কাউকে দূষিত পানি খাইয়ে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস সৃষ্টি করে তারপর ডাক্তারের কাছে যেতে এবং কম্পানি কর্তৃক উৎপাদিত প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় ওষুধ খেয়ে সুস্থ হতে বলবে_এটা গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা যদি বিশুদ্ধ পানি পান করি ও খাবার খাই, তবে উলি্লখিত রোগের উৎপত্তি হবে না, ডাক্তারের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। ওষুধেরও দরকার হবে না। প্রিয় পাঠক, আপনারাই বলুন, কোন অপশনটা শ্রেয় ও উৎকৃষ্ট। রোগ এমনি এমনি শরীরে বাসা বাঁধে না। অবজ্ঞা, অবহেলা, অসচেতনতা, অশিক্ষা, কুশিক্ষা এবং চিকিৎসক ও ওষুধ কম্পানিগুলোর কারণেই আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগাক্রান্ত হই, আর রোগাক্রান্ত হলেই ওষুধের প্রয়োজন হবে কেন, তারও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই। আমরা নিয়মতান্ত্রিক জীবন যাপন করলে এবং নিয়মিত ব্যায়াম করলে শুধু উচ্চ রক্তচাপ নয়, আরো বহু জটিল রোগ থেকে মুক্ত হয়ে সুস্থ জীবন যাপন করতে পারি। ওষুধই একমাত্র সমাধান নয়। ওষুধের বিকল্প থাকলে সেই বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করে সুস্থ জীবনযাপনের প্রচেষ্টাই হতে হবে আমাদের জীবনের একমাত্র ব্রত। সবাই সুস্থ থাকুন। ওষুধ যেন না হয় আপনার দৈনন্দিত জীবনের নিত্যসঙ্গী।

লেখক : অধ্যাপক ফার্মাসি অনুষদ, ঢাবি এবং
প্রোভিসি, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি
drmuniruddin@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.